ঢাকা ০৭:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সচিবালয়, গ্যাস-বিদ্যুত অফিসে অবস্থান ৬ আগস্ট, আগামী মাসে লংমার্চ নতুন দলের আত্মপ্রকাশ, নেতৃত্বে যারা ইরানের সামনে এখন কেবল দুই পথ—চুক্তি অথবা আত্মসমর্পণ: ট্রাম্প পাঁচ দফা দাবিতে সরকারি কর্মচারীদের অবস্থান কর্মসূচি সরকার দমনে ব্যস্ত, দ্রব্যমূল্য-গ্যাস নিয়ে মাথাব্যথা নেই: গোলাম পরওয়ার দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে আশা বাণিজ্যমন্ত্রীর সম্পত্তি দানের পরও আজীবন ভোগদখলের সুযোগ, মন্ত্রিসভায় খসড়া পাশ শেখ হাসিনা যেন রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন, ভারতীয় হাইকমিশনারকে হুমায়ুন কবির রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘নতুন মাত্রা’ যোগ করেছেন তারেক রহমান: চীনা রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে কারিগরি ও ক্রীড়া শিক্ষায় সহযোগিতার আগ্রহ অস্ট্রেলিয়ার

বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে আহমদ ছফার ঠাঁই হয়নি রাজনৈতিক কারণে: সলিমুল্লাহ খান

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

আহমদ ছফার সাহিত্যিক উচ্চতা ও বৌদ্ধিক অবদানকে বাংলা সাহিত্যে অনন্য বলে উল্লেখ করেছেন লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক কারণেই আহমদ ছফাকে রাজধানীর বনানী বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁকে দাফন করতে গিয়ে ঘুষ দিতে হয়েছিল।

শনিবার বাংলা একাডেমিতে ‘আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা ২০২৬’-এর সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন সলিমুল্লাহ খান। আহমদ ছফার ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা ও এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এবারের স্মৃতিবক্তৃতার বিষয় ছিল ‘আহমদ ছফার স্মৃতি না বিকৃতি?’। মূল বক্তা ছিলেন আহমদ ছফা রচনাবলির সম্পাদক ও তাঁর ভাতিজা নূরুল আনোয়ার।

অনুষ্ঠানে এছাড়া বক্তব্য দেন দৈনিক যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান এবং আহমদ ছফার বন্ধু ও ব্যবসায়ী নেতা আবদুল হক।

আহমদ ছফার দাফনের স্মৃতি তুলে ধরে সলিমুল্লাহ খান বলেন, ২০০১ সালের ২৮ জুলাই তার মৃত্যুর সময় দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলেও কবরস্থানের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের ব্যক্তিরা। তাঁদের কারণে বনানীর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে দাফনের অনুমতি মেলেনি। শেষ পর্যন্ত মিরপুরের তুরাগ তীরে একটি কবরের জায়গা পেতেও নানা অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যে মানুষটি সারাজীবন ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়েছেন, তাঁকেই দাফন করতে গিয়ে ঘুষ দিতে হয়েছিল।

স্মৃতিচারণায় সলিমুল্লাহ খান বলেন, আহমদ ছফা প্রায়ই একটি উপন্যাস লেখার পরিকল্পনার কথা বলতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে হাঁটার সময় ইংরেজিতে উপন্যাসটির সম্ভাব্য নাম বলতেন ‘দ্য ওয়ার দ্যাট ওয়াজ বিট্রেইড’। তখন তিনি আহমদ ছফাকে প্রশ্ন করতেন, যুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কে করেছে? এমন প্রশ্নে আহমদ ছফা গভীর চিন্তায় ডুবে যেতেন।

ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করে সলিমুল্লাহ খান বলেন, দেশের উচ্চবিত্ত শ্রেণি ধীরে ধীরে শিক্ষা, প্রশাসন ও সামাজিক জীবনের নানা ক্ষেত্র থেকে বাংলা ভাষাকে সরিয়ে দিচ্ছে। ঢাকার অভিজাত এলাকার বাড়িঘরের নামফলক থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারে ইংরেজির একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হচ্ছে। এই প্রবণতার বিরুদ্ধে আহমদ ছফা আজীবন সতর্ক করেছিলেন।

স্মৃতিবক্তৃতায় নূরুল আনোয়ার সম্প্রতি প্রকাশিত মহিউদ্দিন আহমদের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘আমার কথা কইবে পাখি’-এর তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বইটিতে আহমদ ছফাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও বিকৃত তথ্য সংযোজন করা হয়েছে। তিনি জানান, ওই বইয়ের জবাব হিসেবে তিনিও উপন্যাসের ঢঙে একটি গ্রন্থ লিখেছেন।

মাহবুব কামাল বলেন, সাহিত্যে কল্পনার অবকাশ থাকলেও গবেষণা, ইতিহাস কিংবা স্মৃতিকথায় তথ্য বিকৃতির সুযোগ নেই। তাঁর মতে, রাজনৈতিক সংকীর্ণতা মানুষের কল্পনাশক্তিকে সীমিত করে, কিন্তু আহমদ ছফা মানুষের চিন্তার দুয়ার উন্মুক্ত করেছিলেন।

মোহন রায়হান বলেন, কোনো লেখককে সমালোচনার ঊর্ধ্বে ভাবা উচিত নয়। তবে আহমদ ছফা তাঁর সময়ের অন্যতম আপসহীন ও শক্তিশালী লেখক ছিলেন এবং তিনি বহু মানুষের পথপ্রদর্শক হয়ে আছেন।

আবদুল হক বলেন, নতুন প্রজন্ম যদি আহমদ ছফার চিন্তা ও আদর্শ ধারণ করে, তবে রাষ্ট্র ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। অনুষ্ঠানে বক্তারা আহমদ ছফার সাহিত্য, দর্শন ও বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও গভীরভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান এবং তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে তথ্যভিত্তিক গবেষণা ও নির্ভুল মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সচিবালয়, গ্যাস-বিদ্যুত অফিসে অবস্থান ৬ আগস্ট, আগামী মাসে লংমার্চ

বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে আহমদ ছফার ঠাঁই হয়নি রাজনৈতিক কারণে: সলিমুল্লাহ খান

আপডেট সময় ১০:৫০:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

আহমদ ছফার সাহিত্যিক উচ্চতা ও বৌদ্ধিক অবদানকে বাংলা সাহিত্যে অনন্য বলে উল্লেখ করেছেন লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক কারণেই আহমদ ছফাকে রাজধানীর বনানী বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁকে দাফন করতে গিয়ে ঘুষ দিতে হয়েছিল।

শনিবার বাংলা একাডেমিতে ‘আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা ২০২৬’-এর সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন সলিমুল্লাহ খান। আহমদ ছফার ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা ও এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এবারের স্মৃতিবক্তৃতার বিষয় ছিল ‘আহমদ ছফার স্মৃতি না বিকৃতি?’। মূল বক্তা ছিলেন আহমদ ছফা রচনাবলির সম্পাদক ও তাঁর ভাতিজা নূরুল আনোয়ার।

অনুষ্ঠানে এছাড়া বক্তব্য দেন দৈনিক যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান এবং আহমদ ছফার বন্ধু ও ব্যবসায়ী নেতা আবদুল হক।

আহমদ ছফার দাফনের স্মৃতি তুলে ধরে সলিমুল্লাহ খান বলেন, ২০০১ সালের ২৮ জুলাই তার মৃত্যুর সময় দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলেও কবরস্থানের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের ব্যক্তিরা। তাঁদের কারণে বনানীর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে দাফনের অনুমতি মেলেনি। শেষ পর্যন্ত মিরপুরের তুরাগ তীরে একটি কবরের জায়গা পেতেও নানা অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যে মানুষটি সারাজীবন ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়েছেন, তাঁকেই দাফন করতে গিয়ে ঘুষ দিতে হয়েছিল।

স্মৃতিচারণায় সলিমুল্লাহ খান বলেন, আহমদ ছফা প্রায়ই একটি উপন্যাস লেখার পরিকল্পনার কথা বলতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে হাঁটার সময় ইংরেজিতে উপন্যাসটির সম্ভাব্য নাম বলতেন ‘দ্য ওয়ার দ্যাট ওয়াজ বিট্রেইড’। তখন তিনি আহমদ ছফাকে প্রশ্ন করতেন, যুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কে করেছে? এমন প্রশ্নে আহমদ ছফা গভীর চিন্তায় ডুবে যেতেন।

ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করে সলিমুল্লাহ খান বলেন, দেশের উচ্চবিত্ত শ্রেণি ধীরে ধীরে শিক্ষা, প্রশাসন ও সামাজিক জীবনের নানা ক্ষেত্র থেকে বাংলা ভাষাকে সরিয়ে দিচ্ছে। ঢাকার অভিজাত এলাকার বাড়িঘরের নামফলক থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারে ইংরেজির একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হচ্ছে। এই প্রবণতার বিরুদ্ধে আহমদ ছফা আজীবন সতর্ক করেছিলেন।

স্মৃতিবক্তৃতায় নূরুল আনোয়ার সম্প্রতি প্রকাশিত মহিউদ্দিন আহমদের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘আমার কথা কইবে পাখি’-এর তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বইটিতে আহমদ ছফাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও বিকৃত তথ্য সংযোজন করা হয়েছে। তিনি জানান, ওই বইয়ের জবাব হিসেবে তিনিও উপন্যাসের ঢঙে একটি গ্রন্থ লিখেছেন।

মাহবুব কামাল বলেন, সাহিত্যে কল্পনার অবকাশ থাকলেও গবেষণা, ইতিহাস কিংবা স্মৃতিকথায় তথ্য বিকৃতির সুযোগ নেই। তাঁর মতে, রাজনৈতিক সংকীর্ণতা মানুষের কল্পনাশক্তিকে সীমিত করে, কিন্তু আহমদ ছফা মানুষের চিন্তার দুয়ার উন্মুক্ত করেছিলেন।

মোহন রায়হান বলেন, কোনো লেখককে সমালোচনার ঊর্ধ্বে ভাবা উচিত নয়। তবে আহমদ ছফা তাঁর সময়ের অন্যতম আপসহীন ও শক্তিশালী লেখক ছিলেন এবং তিনি বহু মানুষের পথপ্রদর্শক হয়ে আছেন।

আবদুল হক বলেন, নতুন প্রজন্ম যদি আহমদ ছফার চিন্তা ও আদর্শ ধারণ করে, তবে রাষ্ট্র ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। অনুষ্ঠানে বক্তারা আহমদ ছফার সাহিত্য, দর্শন ও বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও গভীরভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান এবং তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে তথ্যভিত্তিক গবেষণা ও নির্ভুল মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।