ঢাকা ১১:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

প্রতারক হয়েও তিনি নায়ক!

আকাশ নিউজ ডেস্ক: 

চিকিৎসকের টেবিলে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রীকে বাঁচাতে একজন মানুষ কতদূর যেতে পারেন? সেই প্রশ্নের উত্তর যেনো নতুন করে লিখেছেন চীনের লিয়াও ড্যান। তিনি প্রমাণ করেছেন, ভালোবাসার মানুষের জীবন বাঁচাতে আইন ভাঙাও তার কাছে তেমন কিছু নয়। আর এ কারণেই তাকে চীনের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ‘সবচেয়ে অনুগত প্রতারক’ হিসেবে।

সম্প্রতি দেশটির মূলধারার গণমাধ্যমগুলো লিয়াও ড্যানের এই পুরনো ও আবেগঘন গল্পটি নতুন করে সামনে নিয়ে আসায় দেশজুড়ে চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা এবং সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব নিয়ে আবারও তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত বেইজিংয়ের সাবেক কারখানা শ্রমিক লিয়াও ড্যানের পরিবারে। কর্মসংস্থান হারানোর পর এমনিতেই চরম আর্থিক অনটনে দিন কাটছিল তাদের। এরই মধ্যে ২০০৭ সালে লিয়াওয়ের স্ত্রী ডু জিনলিংয়ের শরীরে মারাত্মক ইউরেমিয়া ধরা পড়ে। জীবন বাঁচিয়ে রাখতে সপ্তাহে অন্তত তিনবার ডায়ালিসিস করা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য। কিন্তু এই চিকিৎসার পেছনে প্রতি মাসে খরচ হতো ৫ হাজার ইউয়ানেরও বেশি। যা এই দরিদ্র পরিবারের পক্ষে কোনোভাবেই বহন করা সম্ভব ছিল না।

চিকিৎসার পাহাড়সম বিলের সামনে দাঁড়িয়ে যখন কোনো উপায় ছিল না, তখন এক চরম ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন লিয়াও। তিনি একজন জাল সিল প্রস্তুতকারকের সাথে যোগাযোগ করে হাসপাতালের একটি ভুয়ো সিল তৈরি করেন। এরপর ডায়ালিসিসের ফি পরিশোধ করা হয়েছে বলে দেখানোর জন্য হাসপাতালের আসল রসিদগুলো জাল করতে শুরু করেন। মাসের পর মাস হাসপাতালের ক্যাশ কাউন্টারে কোনো টাকা জমা না দিয়েই, তিনি এই জাল রসিদ জমা দিয়ে স্ত্রীর নিয়মিত ডায়ালিসিস নিশ্চিত করে আসছিলেন।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চতুর কৌশলটি একসময় হাসপাতালের কর্মীদের নজরে আসে। রসিদ পরীক্ষা করতে গিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর পুরো বিষয়টি উন্মোচিত হয়। স্ত্রীর জীবন বাঁচানোর একটি মরিয়া চেষ্টা মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নেয় বড় অপরাধমূলক মামলায়, যা পরবর্তীতে পুরো চীনের মানুষের নজর কেড়েছিল। সরকারি আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লিয়াও কয়েক বছর ধরে এই জাল রসিদ ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ইউয়ানের চিকিৎসা ফি ফাঁকি দিয়েছিলেন।

দীর্ঘদিন ডায়ালিসিস সেবা পাওয়ার পরও শেষ রক্ষা অবশ্য হয়নি। ২০১৬ সালের মে মাসে একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে মারা যান ডু জিনলিং। তবে লিয়াওয়ের এই জালিয়াতি প্রকাশ পাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানবিক দিকটি। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে লিয়াওয়ের এই কাজকে জালিয়াতি বা প্রতারণা হিসেবে দেখলেও, চীনের লাখ লাখ নেটিজেন ও সাধারণ মানুষ তাকে অপরাধী হিসেবে মানতে নারাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বলছেন, সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়া চিকিৎসা খরচের কারণে একজন নিরুপায় স্বামীকে যেভাবে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে অপরাধের পথ বেছে নিতে হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতারক হয়েও তিনি নায়ক!

আপডেট সময় ১০:১৫:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

আকাশ নিউজ ডেস্ক: 

চিকিৎসকের টেবিলে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রীকে বাঁচাতে একজন মানুষ কতদূর যেতে পারেন? সেই প্রশ্নের উত্তর যেনো নতুন করে লিখেছেন চীনের লিয়াও ড্যান। তিনি প্রমাণ করেছেন, ভালোবাসার মানুষের জীবন বাঁচাতে আইন ভাঙাও তার কাছে তেমন কিছু নয়। আর এ কারণেই তাকে চীনের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ‘সবচেয়ে অনুগত প্রতারক’ হিসেবে।

সম্প্রতি দেশটির মূলধারার গণমাধ্যমগুলো লিয়াও ড্যানের এই পুরনো ও আবেগঘন গল্পটি নতুন করে সামনে নিয়ে আসায় দেশজুড়ে চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা এবং সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব নিয়ে আবারও তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত বেইজিংয়ের সাবেক কারখানা শ্রমিক লিয়াও ড্যানের পরিবারে। কর্মসংস্থান হারানোর পর এমনিতেই চরম আর্থিক অনটনে দিন কাটছিল তাদের। এরই মধ্যে ২০০৭ সালে লিয়াওয়ের স্ত্রী ডু জিনলিংয়ের শরীরে মারাত্মক ইউরেমিয়া ধরা পড়ে। জীবন বাঁচিয়ে রাখতে সপ্তাহে অন্তত তিনবার ডায়ালিসিস করা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য। কিন্তু এই চিকিৎসার পেছনে প্রতি মাসে খরচ হতো ৫ হাজার ইউয়ানেরও বেশি। যা এই দরিদ্র পরিবারের পক্ষে কোনোভাবেই বহন করা সম্ভব ছিল না।

চিকিৎসার পাহাড়সম বিলের সামনে দাঁড়িয়ে যখন কোনো উপায় ছিল না, তখন এক চরম ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন লিয়াও। তিনি একজন জাল সিল প্রস্তুতকারকের সাথে যোগাযোগ করে হাসপাতালের একটি ভুয়ো সিল তৈরি করেন। এরপর ডায়ালিসিসের ফি পরিশোধ করা হয়েছে বলে দেখানোর জন্য হাসপাতালের আসল রসিদগুলো জাল করতে শুরু করেন। মাসের পর মাস হাসপাতালের ক্যাশ কাউন্টারে কোনো টাকা জমা না দিয়েই, তিনি এই জাল রসিদ জমা দিয়ে স্ত্রীর নিয়মিত ডায়ালিসিস নিশ্চিত করে আসছিলেন।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চতুর কৌশলটি একসময় হাসপাতালের কর্মীদের নজরে আসে। রসিদ পরীক্ষা করতে গিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর পুরো বিষয়টি উন্মোচিত হয়। স্ত্রীর জীবন বাঁচানোর একটি মরিয়া চেষ্টা মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নেয় বড় অপরাধমূলক মামলায়, যা পরবর্তীতে পুরো চীনের মানুষের নজর কেড়েছিল। সরকারি আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লিয়াও কয়েক বছর ধরে এই জাল রসিদ ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ইউয়ানের চিকিৎসা ফি ফাঁকি দিয়েছিলেন।

দীর্ঘদিন ডায়ালিসিস সেবা পাওয়ার পরও শেষ রক্ষা অবশ্য হয়নি। ২০১৬ সালের মে মাসে একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে মারা যান ডু জিনলিং। তবে লিয়াওয়ের এই জালিয়াতি প্রকাশ পাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানবিক দিকটি। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে লিয়াওয়ের এই কাজকে জালিয়াতি বা প্রতারণা হিসেবে দেখলেও, চীনের লাখ লাখ নেটিজেন ও সাধারণ মানুষ তাকে অপরাধী হিসেবে মানতে নারাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বলছেন, সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়া চিকিৎসা খরচের কারণে একজন নিরুপায় স্বামীকে যেভাবে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে অপরাধের পথ বেছে নিতে হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।