ঢাকা ১১:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মদ না পান করেও ‘মাতাল’, গ্রেফতারের পর প্রকাশ্যে বিরল রোগ

আকাশ নিউজ ডেস্ক: 

ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটির নর্থ ক্যারোলিনার অধিবাসী চল্লিশোর্ধ এক ব্যক্তিকে ২০১১ সালে মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর (ডিডব্লিউআই) অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বরাবরই দাবি করে আসছিলেন, তিনি কোনও ধরনের মদ্যপান করেননি। তার পরিবারের সদস্য, বন্ধু এমনকি চিকিৎসকরাও প্রথমে সেই দাবি বিশ্বাস করতে পারেননি।

তবে কয়েক বছর পর প্রকাশ্যে আসে অবিশ্বাস্য এক সত্য। ২০১৫ সালে চিকিৎসকেরা তার শরীরে অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম বা গাট ফারমেন্টেশন সিনড্রোম নামে বিরল এক রোগ শনাক্ত করেন। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর নিজেই শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটকে অ্যালকোহলে রূপান্তরিত করে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের রোগীরা পিৎজা, পাস্তা, রুটি কিংবা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর অন্ত্রে বিশেষ ধরনের ছত্রাক বা ইস্টের মাধ্যমে সেই খাবার গাঁজন (ফারমেন্টেশন) হয়ে অ্যালকোহলে পরিণত হয়। ফলে তারা এক ফোঁটা মদ না পান করলেও রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা বেড়ে যায় এবং মাতাল ব্যক্তির মতো আচরণ করতে পারেন।

এই বিরল ঘটনাটি নিউইয়র্কের রিচমন্ড ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসকেরা নথিভুক্ত করেন। পরে এটি চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী বিএমজে ওপেন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি-তে প্রকাশিত হয়।

গবেষণাপত্রে চিকিৎসকেরা লিখেছেন, “এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং মদ্যপানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন চিকিৎসাগত ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হন। এমনকি মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।”

সমস্যার শুরু যেভাবে:
চিকিৎসকদের ধারণা, ২০১১ সালে আঙুলে আঘাত পাওয়ার পর ওই ব্যক্তি যে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছিলেন, সেটিই তার শরীরে এই বিরল অবস্থার সূচনা ঘটায়।

অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের কিছুদিন পর থেকেই তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়। তিনি বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করেন, মনোযোগ ধরে রাখতে পারতেন না, ‘ব্রেইন ফগ’-এর মতো সমস্যায় আক্রান্ত হন এবং আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করতে থাকেন।

প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকেরা তাকে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত রোগের ওষুধ দেন। কিন্তু তাতে সমস্যার প্রকৃত কারণ ধরা পড়েনি। পরে মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে গ্রেফতারের ঘটনাটি তার জীবনকে আরও জটিল করে তোলে।

যেভাবে ধরা পড়ে বিরল রোগ:
পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়, যখন তার এক আত্মীয় ওহাইও অঙ্গরাজ্যে একই ধরনের একটি ঘটনার কথা জানতে পারেন। তিনি একটি ব্রেথ অ্যানালাইজার কিনে ওই ব্যক্তির শরীরে অ্যালকোহলের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা শুরু করেন এবং পরে তাকে ওহাইওতে বিশেষায়িত পরীক্ষার জন্য নিয়ে যান।

বিভিন্ন ল্যাবরেটরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন যে, তিনি অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোমে আক্রান্ত।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ, প্রোবায়োটিক এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শেষে প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি কোনও উপসর্গ ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

অনেক ক্ষেত্রে শনাক্তই হয় না বিরল এই রোগ:
অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম নিয়ে ১৯৭০-এর দশক থেকেই বিভিন্ন চিকিৎসা-গবেষণায় তথ্য পাওয়া গেলেও, এখনও এ রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনও নির্দিষ্ট নির্দেশিকা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগটি অত্যন্ত বিরল হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি শনাক্তই হয় না। ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং ক্রোনস ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, কোনও ব্যক্তি যদি মদ্যপান না করেও বারবার রক্তে অ্যালকোহলের উপস্থিতি, অস্বাভাবিক আচরণ বা নেশাগ্রস্ত হওয়ার লক্ষণ দেখান, তাহলে অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোমের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মদ না পান করেও ‘মাতাল’, গ্রেফতারের পর প্রকাশ্যে বিরল রোগ

আপডেট সময় ০৮:৫০:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

আকাশ নিউজ ডেস্ক: 

ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটির নর্থ ক্যারোলিনার অধিবাসী চল্লিশোর্ধ এক ব্যক্তিকে ২০১১ সালে মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর (ডিডব্লিউআই) অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বরাবরই দাবি করে আসছিলেন, তিনি কোনও ধরনের মদ্যপান করেননি। তার পরিবারের সদস্য, বন্ধু এমনকি চিকিৎসকরাও প্রথমে সেই দাবি বিশ্বাস করতে পারেননি।

তবে কয়েক বছর পর প্রকাশ্যে আসে অবিশ্বাস্য এক সত্য। ২০১৫ সালে চিকিৎসকেরা তার শরীরে অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম বা গাট ফারমেন্টেশন সিনড্রোম নামে বিরল এক রোগ শনাক্ত করেন। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর নিজেই শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটকে অ্যালকোহলে রূপান্তরিত করে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের রোগীরা পিৎজা, পাস্তা, রুটি কিংবা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর অন্ত্রে বিশেষ ধরনের ছত্রাক বা ইস্টের মাধ্যমে সেই খাবার গাঁজন (ফারমেন্টেশন) হয়ে অ্যালকোহলে পরিণত হয়। ফলে তারা এক ফোঁটা মদ না পান করলেও রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা বেড়ে যায় এবং মাতাল ব্যক্তির মতো আচরণ করতে পারেন।

এই বিরল ঘটনাটি নিউইয়র্কের রিচমন্ড ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসকেরা নথিভুক্ত করেন। পরে এটি চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী বিএমজে ওপেন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি-তে প্রকাশিত হয়।

গবেষণাপত্রে চিকিৎসকেরা লিখেছেন, “এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং মদ্যপানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন চিকিৎসাগত ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হন। এমনকি মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।”

সমস্যার শুরু যেভাবে:
চিকিৎসকদের ধারণা, ২০১১ সালে আঙুলে আঘাত পাওয়ার পর ওই ব্যক্তি যে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছিলেন, সেটিই তার শরীরে এই বিরল অবস্থার সূচনা ঘটায়।

অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের কিছুদিন পর থেকেই তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়। তিনি বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করেন, মনোযোগ ধরে রাখতে পারতেন না, ‘ব্রেইন ফগ’-এর মতো সমস্যায় আক্রান্ত হন এবং আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করতে থাকেন।

প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকেরা তাকে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত রোগের ওষুধ দেন। কিন্তু তাতে সমস্যার প্রকৃত কারণ ধরা পড়েনি। পরে মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে গ্রেফতারের ঘটনাটি তার জীবনকে আরও জটিল করে তোলে।

যেভাবে ধরা পড়ে বিরল রোগ:
পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়, যখন তার এক আত্মীয় ওহাইও অঙ্গরাজ্যে একই ধরনের একটি ঘটনার কথা জানতে পারেন। তিনি একটি ব্রেথ অ্যানালাইজার কিনে ওই ব্যক্তির শরীরে অ্যালকোহলের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা শুরু করেন এবং পরে তাকে ওহাইওতে বিশেষায়িত পরীক্ষার জন্য নিয়ে যান।

বিভিন্ন ল্যাবরেটরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন যে, তিনি অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোমে আক্রান্ত।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ, প্রোবায়োটিক এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শেষে প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি কোনও উপসর্গ ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

অনেক ক্ষেত্রে শনাক্তই হয় না বিরল এই রোগ:
অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম নিয়ে ১৯৭০-এর দশক থেকেই বিভিন্ন চিকিৎসা-গবেষণায় তথ্য পাওয়া গেলেও, এখনও এ রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনও নির্দিষ্ট নির্দেশিকা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগটি অত্যন্ত বিরল হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি শনাক্তই হয় না। ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং ক্রোনস ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, কোনও ব্যক্তি যদি মদ্যপান না করেও বারবার রক্তে অ্যালকোহলের উপস্থিতি, অস্বাভাবিক আচরণ বা নেশাগ্রস্ত হওয়ার লক্ষণ দেখান, তাহলে অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোমের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।