ঢাকা ০৩:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান : জাতিসংঘে শামা ওবায়েদ তৎকালীন আওয়ামী সরকারের কারণে জনগণ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত: মির্জা ফখরুল সংবিধান সংশোধন: প্রতিশ্রুতি ছাড়া কমিটিতে থাকতে চায় না জামায়াত পশ্চিমবঙ্গে জোট নয়; ‘একলা লড়াই’র ডাক রাহুল গান্ধীর বিশেষায়িত ইউনিটে জনবল বৃদ্ধি চায় পুলিশ পাকিস্তানে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৮ সেনা নিহত হয় চুক্তি করবে, না হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে: ইরানকে হুমকি ট্রাম্পের উপদেষ্টার কর্মকাণ্ডে উদ্বিগ্ন হয়ে ২০২৪ সালেই প্রশ্ন তুলেছিলাম: তাসনিম জারা পরিমার্জন হচ্ছে ২০২৭ সালের পাঠ্যবই, ফিরছে প্রকৃত ইতিহাস: এনসিটিবি চেয়ারম্যান কৃষক কার্ডে ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন কৃষকরা: চিফ হুইপ

সংবিধান সংশোধন: প্রতিশ্রুতি ছাড়া কমিটিতে থাকতে চায় না জামায়াত

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

অষ্টাদশ সংশোধনীর জন্য বিএনপি যে সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছে, তাতে সমাধান দেখছে না জামায়াতে ইসলামী। গণভোট অনুযায়ী সংস্কার হবে– এ প্রতিশ্রুতি ছাড়া কমিটিতে অংশ নিতে চায় না জামায়াত। একই অবস্থান এনসিপিরও।

দল দুটির ১১ দলীয় ঐক্যের ভাষ্য, গণভোট বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা ছাড়া কমিটিতে অংশগ্রহণ হবে বিএনপির অবস্থানকে বৈধতা দেওয়া মাত্র। আবার সংখ্যালঘু ১১ দলের কোনো দাবি পূরণ হবে না, যা জোটের এতদিনের রাজনৈতিক অবস্থানকে নষ্ট করবে। এর চেয়ে গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়নের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে অব্যাহত রাখা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। তবে এখনই কমিটি বর্জনের ঘোষণা না দিয়ে, শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে।

গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে কাল শনিবার থেকে চতুর্থ দফার কর্মসূচি শুরু হবে। এদিন রাজশাহীতে শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে সমাবেশ করবে ১১ দল। ২৫ জুলাই পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সব বিভাগীয় শহরে সমাবেশ হবে। এরপর সমাবেশ হবে রাজধানীতে। এসব সমাবেশ থেকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, বিশেষ কমিটি নয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানানো হবে।

সংবিধান সংশোধনে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। গত ২৯ এপ্রিল সংসদের প্রথম অধিবেশনের বৈঠকে তিনি বলেন, ১৭ সদস্যের কমিটি গঠন করা হবে। এর মধ্যে সাতজন হবেন বিএনপির এমপি। গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন এবং স্বতন্ত্র এমপিদের মধ্যে পাঁচজন হবেন কমিটির সদস্য। বিরোধী দল থেকে আরও পাঁচজন সদস্য থাকবেন।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সেদিন সংসদে বলেন, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাদের ধারণাগত ভিন্নতা আছে। তারা এ প্রস্তাবটি নিজেরা আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন। বিরোধী দল চেয়েছে সংস্কার, কিন্তু সরকারি দল করতে চাচ্ছে সংবিধানের সংশোধন। এই মতপার্থক্য ছিল, এখনও রয়েছে।

সেদিন আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, বিরোধী দলের সিদ্ধান্তের জন্য পরবর্তী অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অসুবিধা হবে না।
আগামী ৫ জুন সংসদে বাজেট অধিবেশন শুরু হবে। এর আগে কমিটির জন্য নাম দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে নিশ্চিত করেছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য ২০১০ সালে গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটিতে যোগ দেয়নি তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি। আওয়ামী লীগের সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে কো-চেয়ারম্যান করে গঠিত ১৫ সদস্যের ওই কমিটিতে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদের একজন করে এমপি ছিলেন। বিএনপি থেকে তিনজন সদস্য নেওয়ার প্রস্তাব করেছিল তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ।

এই কমিটি সংবিধানে ৫১টি সংশোধনের প্রস্তাব করেছিল। এতে সংবিধানে জাতির পিতা বিধান যোগ করা, গণভোট বাদ দেওয়া, সংবিধান সংশোধনকে কঠিন করা, সংবিধান লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানের মতো সুপারিশ ছিল। তবে ছিল না তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের সুপারিশ।

পরিবর্তী সময় আদালতের রায়ের নজির দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে অবস্থান নেন। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্যানুযায়ী, এতে কমিটির ১৫ সদস্য আগেই অবস্থান বদলে ফেলেন। সর্বসম্মতিক্রমে সুপারিশ করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপে।

অতীতের নজিরে ভরসা পাচ্ছে না বিরোধীরা:
অতীতের এই উদাহরণ দিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যা ইচ্ছা যে করতে পারে, তা তো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অধ্যাদেশগুলোকে আইনের রূপান্তরে ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। বিরোধী দলের কোনো নোট অব ডিসেন্টকে আমলে নেওয়া হয়নি। মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং সচিবালয় অধ্যাদেশগুলো একচেটিয়াভাবে বাতিল করে দিয়েছে। আবার সরকারের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার অধ্যাদেশগুলোকে আপত্তি উপেক্ষা করে পাস করিয়েছে।

পাল্টা প্রশ্ন রেখে হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, যেসব অধ্যাদেশ নিয়ে ‘জেন্টলম্যান্টস অ্যাগ্রিমেন্ট’ হয়েছিল, সেগুলোও করা হয়নি। তাহলে বিরোধী দল কোন ভরসায় সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নিয়ে সরকারি দলের মর্জি অনুযায়ী করা কাজগুলোকে বৈধতা দেবে?

সংবিধান সংস্কারের গঠিত এনসিপির কমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কার হবে। সংস্কারের যে কোনো উদ্যোগের সঙ্গে এনসিপি থাকবে। গণভোটবিরোধী কোনো কিছুর সঙ্গে এনসিপি থাকবে না।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীন বলেন, কমিটিতে অংশগ্রহণ করা বা না করার বিষয়ে জোটে এখনও আলোচনা সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ১১ দলের অন্য শরিকদের মতো বাংলাদেশের খেলাফতের অবস্থান হলো, গণভোটে জনগণ যেভাবে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে, সেভাবে সংবিধান সংস্কার করতে হবে।

গণভোটে জোর জামায়াত জোটের:
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি; ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন ও সংবিধান সংশোধনে অনুমোদন; সাংবিধানিক কমিটির মাধ্যমে সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, ন্যায়পাল এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগের প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমত অনুসারে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে।

অন্যদিকে জামায়াত, এনসিপিসহ জোটের শরিকরা জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে।
অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে। এ আদেশের ওপর গণভোট হয়। গণভোটে জনগণের কাছে আদেশ এবং সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের বিষয়ে সম্মতি নেওয়া হয়। এতে ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন।

জুলাই আদেশে বলা হয়েছিল, ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই পরিষদ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার করবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি; ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন ও সংবিধান সংশোধনে অনুমোদন; সাংবিধানিক কমিটির মাধ্যমে সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, ন্যায়পাল এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগের প্রস্তাব জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে বাস্তবায়ন করতে হবে। এই আটটি বিষয়ে কোনো দলের নোট অব ডিসেন্ট প্রযোজ্য হবে না। যে ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবে সব দলের ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলোও বাস্তবায়ন করতে হবে। বাকি যে ১০ সংস্কার প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল চাইলে বিবেচনা করতে পারবে।

কিন্তু বিএনপি ও তাদের জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা এ শপথ নিয়েছিলেন। বিএনপি জুলাই আদেশকে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অন্তহীন প্রতারণার’ দলিল বলে আখ্যা দিয়েছে। দলটির ভাষ্য, এই আদেশ জারির সময় থেকেই অবৈধ ছিল। তাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও এটি মানার বাধ্যবাধকা নেই। বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী সংস্কার করবে।

জামায়াতসহ ১১ দলের একাধিক নেতা বলেছেন, তারা গণভোটের দাবিতে অনড় ছিলেন। তাদের দাবিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল যদি মানা না হয়, তাহলে তা মেনে নিলে রাজনৈতিক ক্ষতি হবে। বিএনপি গণভোট মানবে না, তা তিন মাসের কর্মকাণ্ডে নিশ্চিত হয়ে গেছে। তারপরও বিরোধী জোট গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরবে না। তা আগামী নির্বাচন পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে টেনে নিয়ে যাবে।

আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, কমিটিতে অংশ গ্রহণ বা বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে জামায়াত ও ১১ দলের অবস্থান হচ্ছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সেখানে গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করতে হবে। এর জন্য যে কোনো কমিটি বা আলোচনায় জামায়াত রাজি। কিন্তু গণভোটের ফলাফল মানা হবে না, এমন কমিটির অংশ হওয়ার কারণ নেই।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘মৃত্যু নিয়ে এমন ব্যবসা ঠিক না’, কারিনার মৃত্যুর গুজবে কায়সার হামিদের ক্ষোভ

সংবিধান সংশোধন: প্রতিশ্রুতি ছাড়া কমিটিতে থাকতে চায় না জামায়াত

আপডেট সময় ০১:০৫:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

অষ্টাদশ সংশোধনীর জন্য বিএনপি যে সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছে, তাতে সমাধান দেখছে না জামায়াতে ইসলামী। গণভোট অনুযায়ী সংস্কার হবে– এ প্রতিশ্রুতি ছাড়া কমিটিতে অংশ নিতে চায় না জামায়াত। একই অবস্থান এনসিপিরও।

দল দুটির ১১ দলীয় ঐক্যের ভাষ্য, গণভোট বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা ছাড়া কমিটিতে অংশগ্রহণ হবে বিএনপির অবস্থানকে বৈধতা দেওয়া মাত্র। আবার সংখ্যালঘু ১১ দলের কোনো দাবি পূরণ হবে না, যা জোটের এতদিনের রাজনৈতিক অবস্থানকে নষ্ট করবে। এর চেয়ে গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়নের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে অব্যাহত রাখা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। তবে এখনই কমিটি বর্জনের ঘোষণা না দিয়ে, শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে।

গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে কাল শনিবার থেকে চতুর্থ দফার কর্মসূচি শুরু হবে। এদিন রাজশাহীতে শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে সমাবেশ করবে ১১ দল। ২৫ জুলাই পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সব বিভাগীয় শহরে সমাবেশ হবে। এরপর সমাবেশ হবে রাজধানীতে। এসব সমাবেশ থেকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, বিশেষ কমিটি নয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানানো হবে।

সংবিধান সংশোধনে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। গত ২৯ এপ্রিল সংসদের প্রথম অধিবেশনের বৈঠকে তিনি বলেন, ১৭ সদস্যের কমিটি গঠন করা হবে। এর মধ্যে সাতজন হবেন বিএনপির এমপি। গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন এবং স্বতন্ত্র এমপিদের মধ্যে পাঁচজন হবেন কমিটির সদস্য। বিরোধী দল থেকে আরও পাঁচজন সদস্য থাকবেন।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সেদিন সংসদে বলেন, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাদের ধারণাগত ভিন্নতা আছে। তারা এ প্রস্তাবটি নিজেরা আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন। বিরোধী দল চেয়েছে সংস্কার, কিন্তু সরকারি দল করতে চাচ্ছে সংবিধানের সংশোধন। এই মতপার্থক্য ছিল, এখনও রয়েছে।

সেদিন আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, বিরোধী দলের সিদ্ধান্তের জন্য পরবর্তী অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অসুবিধা হবে না।
আগামী ৫ জুন সংসদে বাজেট অধিবেশন শুরু হবে। এর আগে কমিটির জন্য নাম দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে নিশ্চিত করেছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য ২০১০ সালে গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটিতে যোগ দেয়নি তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি। আওয়ামী লীগের সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে কো-চেয়ারম্যান করে গঠিত ১৫ সদস্যের ওই কমিটিতে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদের একজন করে এমপি ছিলেন। বিএনপি থেকে তিনজন সদস্য নেওয়ার প্রস্তাব করেছিল তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ।

এই কমিটি সংবিধানে ৫১টি সংশোধনের প্রস্তাব করেছিল। এতে সংবিধানে জাতির পিতা বিধান যোগ করা, গণভোট বাদ দেওয়া, সংবিধান সংশোধনকে কঠিন করা, সংবিধান লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানের মতো সুপারিশ ছিল। তবে ছিল না তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের সুপারিশ।

পরিবর্তী সময় আদালতের রায়ের নজির দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে অবস্থান নেন। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্যানুযায়ী, এতে কমিটির ১৫ সদস্য আগেই অবস্থান বদলে ফেলেন। সর্বসম্মতিক্রমে সুপারিশ করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপে।

অতীতের নজিরে ভরসা পাচ্ছে না বিরোধীরা:
অতীতের এই উদাহরণ দিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যা ইচ্ছা যে করতে পারে, তা তো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অধ্যাদেশগুলোকে আইনের রূপান্তরে ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। বিরোধী দলের কোনো নোট অব ডিসেন্টকে আমলে নেওয়া হয়নি। মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং সচিবালয় অধ্যাদেশগুলো একচেটিয়াভাবে বাতিল করে দিয়েছে। আবার সরকারের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার অধ্যাদেশগুলোকে আপত্তি উপেক্ষা করে পাস করিয়েছে।

পাল্টা প্রশ্ন রেখে হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, যেসব অধ্যাদেশ নিয়ে ‘জেন্টলম্যান্টস অ্যাগ্রিমেন্ট’ হয়েছিল, সেগুলোও করা হয়নি। তাহলে বিরোধী দল কোন ভরসায় সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নিয়ে সরকারি দলের মর্জি অনুযায়ী করা কাজগুলোকে বৈধতা দেবে?

সংবিধান সংস্কারের গঠিত এনসিপির কমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কার হবে। সংস্কারের যে কোনো উদ্যোগের সঙ্গে এনসিপি থাকবে। গণভোটবিরোধী কোনো কিছুর সঙ্গে এনসিপি থাকবে না।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীন বলেন, কমিটিতে অংশগ্রহণ করা বা না করার বিষয়ে জোটে এখনও আলোচনা সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ১১ দলের অন্য শরিকদের মতো বাংলাদেশের খেলাফতের অবস্থান হলো, গণভোটে জনগণ যেভাবে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে, সেভাবে সংবিধান সংস্কার করতে হবে।

গণভোটে জোর জামায়াত জোটের:
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি; ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন ও সংবিধান সংশোধনে অনুমোদন; সাংবিধানিক কমিটির মাধ্যমে সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, ন্যায়পাল এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগের প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমত অনুসারে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে।

অন্যদিকে জামায়াত, এনসিপিসহ জোটের শরিকরা জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে।
অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে। এ আদেশের ওপর গণভোট হয়। গণভোটে জনগণের কাছে আদেশ এবং সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের বিষয়ে সম্মতি নেওয়া হয়। এতে ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন।

জুলাই আদেশে বলা হয়েছিল, ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই পরিষদ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার করবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি; ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন ও সংবিধান সংশোধনে অনুমোদন; সাংবিধানিক কমিটির মাধ্যমে সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, ন্যায়পাল এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগের প্রস্তাব জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে বাস্তবায়ন করতে হবে। এই আটটি বিষয়ে কোনো দলের নোট অব ডিসেন্ট প্রযোজ্য হবে না। যে ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবে সব দলের ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলোও বাস্তবায়ন করতে হবে। বাকি যে ১০ সংস্কার প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল চাইলে বিবেচনা করতে পারবে।

কিন্তু বিএনপি ও তাদের জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা এ শপথ নিয়েছিলেন। বিএনপি জুলাই আদেশকে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অন্তহীন প্রতারণার’ দলিল বলে আখ্যা দিয়েছে। দলটির ভাষ্য, এই আদেশ জারির সময় থেকেই অবৈধ ছিল। তাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও এটি মানার বাধ্যবাধকা নেই। বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী সংস্কার করবে।

জামায়াতসহ ১১ দলের একাধিক নেতা বলেছেন, তারা গণভোটের দাবিতে অনড় ছিলেন। তাদের দাবিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল যদি মানা না হয়, তাহলে তা মেনে নিলে রাজনৈতিক ক্ষতি হবে। বিএনপি গণভোট মানবে না, তা তিন মাসের কর্মকাণ্ডে নিশ্চিত হয়ে গেছে। তারপরও বিরোধী জোট গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরবে না। তা আগামী নির্বাচন পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে টেনে নিয়ে যাবে।

আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, কমিটিতে অংশ গ্রহণ বা বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে জামায়াত ও ১১ দলের অবস্থান হচ্ছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সেখানে গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করতে হবে। এর জন্য যে কোনো কমিটি বা আলোচনায় জামায়াত রাজি। কিন্তু গণভোটের ফলাফল মানা হবে না, এমন কমিটির অংশ হওয়ার কারণ নেই।