আকাশ নিউজ ডেস্ক:
হিমালয়ের পাদদেশে মেঘে ঢাকা এক রহস্যময় উপত্যকা, যেখানে বাইরের পৃথিবীর চেনা সব নিয়ম যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। চীনের ইউনান এবং সিচুয়ান প্রদেশের সীমান্তে অবস্থিত লুগু হ্রদের পাড়ে বাস করে এমন এক জনগোষ্ঠী, যাদের জীবনধারা শুনলে রূপকথা বলে মনে হতে পারে। এই উপত্যকাটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘নারীদের সাম্রাজ্য’ হিসেবে, যেখানে বংশপরম্পরা চলে মায়ের নামে। মোসুয়ো নামের এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হাজার বছর ধরে এক অনন্য মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে, যেখানে পুরুষের আধিপত্যের কোনো স্থান নেই।
এখানে পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন নানী বা মা, যাঁকে ঘিরে আবর্তিত হয় পুরো সংসার। মোসুয়ো নারীরাই এই সমাজের প্রকৃত চালিকাশক্তি, যাদের হাতে থাকে পরিবারের সমস্ত অর্থ এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। ঘর পরিচালনা থেকে শুরু করে মাঠের ফসল কাটা কিংবা ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেওয়া; সবই করেন মহিলারা। এই সমাজে একজন নারীর মর্যাদা আকাশচুম্বী, কারণ তাঁরাই জীবন দান করেন এবং পরিবারের শিকড়কে আগলে রাখেন।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, মোসুয়ো সমাজে আমাদের পরিচিত চিরাচরিত বিয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই বিশেষ প্রথাকে বলা হয় ‘ওয়াকিং ম্যারেজ’। এখানে নারী ও পুরুষ একত্রে বসবাস করার কোনো আইনি বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা মানে না। এক ছাদের নিচে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সারাজীবন কাটানোর ধারণাটি তাদের কাছে একেবারেই অপরিচিত। তারা মনে করে, ভালোবাসা হলো এক স্বাধীন অনুভূতি যা কোনো চুক্তির শিকলে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়।
নিজেদের এই স্বতন্ত্র প্রথা অনুযায়ী, একজন পুরুষ কেবল রাতের অন্ধকারেই তাঁর সঙ্গিনীর ঘরে যেতে পারেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই তাঁকে আবার নিজের মায়ের বাড়িতে ফিরে আসতে হয়। কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীর প্রতি আকৃষ্ট হন, তবে তাকে নৃত্যের মাধ্যমে বা ইঙ্গিতে নিজের মনের কথা জানাতে হয়। নারী যদি সায় দেন, তবেই কেবল সেই সম্পর্কের অনুমতি মেলে। এখানে বিচ্ছেদ মানে কোনো আইনি লড়াই নয়, বরং কেবল দরজা বন্ধ করে দেওয়া বা সম্পর্কের ইতি টানা।
মজার ব্যাপার হলো, এই ‘চলমান বিবাহের’ ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানদের লালন-পালনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে মায়ের পরিবারের ওপর। মোসুয়ো শিশুরা তাদের জন্মদাতা পিতাকে চিনলেও, তাদের জীবনে বাবার কোনো আর্থিক বা সামাজিক ভূমিকা থাকে না। বাবার পরিবর্তে শিশুরা তাদের মামাদের সান্নিধ্যে বড় হয়। মামারাই এখানে পিতৃতুল্য ভূমিকা পালন করেন এবং বোনদের সন্তানদের দেখাশোনা করেন। নিজের সন্তানের চেয়ে বোনের সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করাকেই এখানে পুরুষদের প্রধান কর্তব্য বলে মনে করা হয়।
এই সমাজে যৌন ঈর্ষা বা সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে কোনো কলহ নেই বললেই চলে। যেহেতু পুরুষরা কোনো স্থায়ী সম্পত্তিতে হাত দিতে পারে না, তাই পরিবারের ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্বও তৈরি হয় না। নারীরা তাদের পুরুষ সঙ্গীদের কেবল আকর্ষণ এবং ব্যক্তিত্বের নিরিখে নির্বাচন করেন, তাদের ব্যাংক ব্যালেন্স দেখে নয়। গবেষকদের মতে, এই কারণেই মোসুয়ো নারীরা অনেক বেশি সুখী এবং স্বনির্ভর। তাদের সমাজে পারিবারিক সহিংসতার হার পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের তুলনায় অনেক কম।
তবে আধুনিকতা আর বিশ্বায়নের ছোঁয়া থেকে এই রহস্যময় উপত্যকাও এখন আর পুরোপুরি মুক্ত নয়। লুগু হ্রদের সৌন্দর্য আর এই বিচিত্র জীবনধারা দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক সেখানে ভিড় জমাচ্ছেন। পর্যটনের প্রসারের ফলে নতুন প্রজন্মের অনেক মোসুয়ো তরুণ-তরুণী এখন আধুনিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে। বাইরের পৃথিবীর প্রভাবে তাদের প্রাচীন ঐতিহ্যে কিছুটা হলেও চির ধরছে, কেউ কেউ প্রথা ভেঙে একগামী বিয়ের দিকেও আগ্রহী হয়ে উঠছে।
তবুও মোসুয়ো উপত্যকার গভীরে গেলেই আজও দেখা মিলবে সেই আদিম ও অকৃত্রিম মাতৃতান্ত্রিক জীবনের স্পন্দন। বৃদ্ধা নানীদের শাসন আর মায়েদের নির্ভীক পথচলা আজও প্রমাণ করে যে পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবীর বাইরেও এক শান্তিময় জগত সম্ভব।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























