আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে চলমান অভিযানে তিন দিনে সারা দেশে বন্ধ হয়েছে প্রায় এক হাজার অবৈধ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। অভিযান চলবে আগামীকাল বৃহস্পতিবারও। এসব অভিযান পর্যালোচনা করে নতুন পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. বেলাল হোসেন এসব তথ্য জানান।
অবৈধ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফা অভিযানের আজ ছিল তৃতীয় দিন। গত সোমবার এই অভিযান শুরু হয়।
এর আগে চলতি বছরের ২৬ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তিন দিনের মধ্যে অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে নির্দেশনা জারি করে। পরে ২৮ থেকে ৩১ মে চার দিন অভিযান চালানো হয়। এতে রাজধানীসহ দেশের এক হাজার ১৪৯টি অনিবন্ধিত হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংক বন্ধ করা হয়।
ডা. বেলাল হোসেন বলেন, ‘অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। নিবন্ধনের কতটা অগ্রগতি হয়েছে, অবৈধ কতগুলো ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ হয়েছে, সেটি পর্যালোচনা করা হবে। এরপর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ও সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
সারা দেশে কতগুলো অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে, সেই তথ্য তাদের কাছে নেই বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক)।
কারণ হিসেবে ডা. বেলাল হোসেন বলেন, ‘যারা অবৈধভাবে ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার দিয়েছে, তারা আবেদনই করেনি, তাদের তথ্য আমরা জানব কী করে! তবে বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা জেলা সিভিল সার্জনদের কাছে আছে। সে অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে গত সোমবার (২৯ আগস্ট) থেকে সারাদেশে চলমান অভিযানে বন্ধ করা হয় ৫২৪টি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংক। অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে এসব প্রতিষ্ঠানকে ৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
সূত্র জানায়, সবচেয়ে বেশি খুলনা বিভাগে ১৪৯টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এরপর ঢাকা বিভাগে ১৪৫টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৬টি, ময়মনসিংহ বিভাগে ৫৪টি, রাজশাহী বিভাগে ৫৩টি, রংপুর বিভাগে ১৯টি, ঢাকা মহানগরে ১৫টি ও বরিশাল বিভাগে ১২টি। তবে সর্বনিম্ন একটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে সিলেট বিভাগে একটি।
এদিকে জরিমানা আদায়ে শীর্ষে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। এই বিভাগে সর্বোচ্চ ৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এরপর ঢাকা বিভাগে এক লাখ, খুলনা বিভাগে ৮০ হাজার ও বরিশাল বিভাগে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। তবে, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুর, সিলেট বিভাগসহ ঢাকা মহানগরীতে কোনো জরিমানা আদায় হয়নি।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও ডেটা ফর ইম্প্যাক্টের এক গবেষণা প্রতিবেদনে থেকে জানা যায়, দেশে বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। এর মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৬০টি হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধন আছে। বাকিগুলোর বড় অংশের নিবন্ধন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। আর কোনো ধরনের নিবন্ধনই নেই ১৪ শতাংশ হাসপাতালের। নিয়ন্ত্রণহীনভাবেই চলছে এসব হাসপাতাল।
২০১৯ সালের মে থেকে ২০২০ সালে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ১০টি জেলার ২৯ উপজেলায় মোট ১ হাজার ১১৭টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই গবেষণা চালানো হয়। ২০২০ সালে গবেষণা প্রতিবেদন সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮৬ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতালের মালিকেরা অন্তত একবার হলেও নিবন্ধন করেছিলেন। তবে বর্তমানে ৭৯ শতাংশ হাসপাতালেরই নিবন্ধনের মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। মাত্র ৬ শতাংশ হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধন আছে। ১৪ শতাংশের কোনো ধরনের নিবন্ধন নেই। যেসব হাসপাতালের নিবন্ধনের মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে, তাদের মধ্যে মাত্র ৪৮ শতাংশ নবায়নের জন্য আবেদন করেছে। আর ৩১ শতাংশ আবেদনই করেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের নিবন্ধনের মেয়াদ থাকে এক বছর। ফলে প্রতি বছর হাসপাতালের নিবন্ধন নবায়ন করতে হয়। কিন্তু সরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে নিবন্ধন করা ও নবায়ন নিয়ে বেশ জটিলতার মুখে পড়তে হয়।
গবেষণায় প্রতিবেদনে এই বিষয়টিও উঠে এসেছে। অনেক হাসপাতালের মালিক নিবন্ধনের আবেদন না করেই ব্যবসা চালাচ্ছেন। বারবার তাগাদা দিয়েও তাদের নিবন্ধন করানো যাচ্ছে না।
বেসরকারি হাসপাতালের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বেআইনিভাবে চলছে, তাদের কার্যক্রম বন্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে সরকার।
নিবন্ধন পেতে যে জটিলতা আছে, তা দূর করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, এ ছাড়া নতুন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আছে। এতে বেআইনিভাবে পরিচালিত কোনো হাসপাতালে নিবন্ধনধারী চিকিৎসক সেবা দিলে তাকেও শাস্তির আওতায় আনার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব এ ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, নিবন্ধনের ব্যবস্থা যত সহজ করা যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















