আকাশ স্পোর্টস ডেস্ক:
ঘরের মাঠে টেস্ট ক্রিকেট হলে বাংলাদেশ দলের গলার স্বর এখন অনেক উঁচুতে থাকে। সর্বশেষ সিরিজের আগেই যেমন মুশফিক-সাকিবরা জানিয়ে দিয়েছিলেন, ২-০ ব্যবধানে জিততে চান। এ রকম ঘোষণা আগে কখনো শুনেছেন? তা-ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে! ফল ২-০ না হলেও বাংলাদেশ সে পথেই ছিল। দ্বিতীয় টেস্ট জিতে অস্ট্রেলিয়াকেই শেষ পর্যন্ত সিরিজ বাঁচাতে হয়েছে।
এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বাংলাদেশ খেলবে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে। পচেফস্ট্রুমে আজই শুরু সিরিজের প্রথম টেস্ট। প্রতিপক্ষ টেস্টের দ্বিতীয় সেরা দল স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা। এমন দলের বিপক্ষে জয়ের আগাম ঘোষণা দিয়ে নামা বাড়াবাড়ি। কাল সিরিজ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের বক্তব্যে ঘুরেফিরে যা এল, তাতে বরং এটাই মনে হলো, বাংলাদেশ দল এই সিরিজ খেলতে চায় ‘লো প্রোফাইলে’ থেকে। তবে ফলাফলে চমকে দিয়ে প্রোটিয়াদের বিপক্ষেও নতুন কিছু করার গোপন ইচ্ছা যে আছে, টেস্ট অধিনায়ক সেটা লুকাতে পারেননি।
প্রত্যাশার লাগাম টানতেই হয়তো মুশফিক মনে করিয়ে দিয়েছেন কিছু কথা। বাংলাদেশ টেস্টের সেরা তিন দলের মধ্যে নেই। মাঠে নেমে ধুমধাম ম্যাচ জিতে আসার দলও এখনো তারা হয়ে ওঠেনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা নিচু সারির একটি দল। আমাদের নিজেদের একটু অন্যভাবে তুলে ধরতে হয়। জয় বা ভালো খেলার জন্য আমাদের দুই শ ভাগ দিতে হয়।’ মুশফিক বিনয় দেখালেও ফাফ ডু প্লেসির কথায় বাংলাদেশের প্রতি কিছুটা হলেও সমীহ খুঁজে পাওয়া গেল, ‘বাংলাদেশ খুব ভালো খেলছে। তাদের দেশে গেছে এ রকম প্রায় সব দলকেই তারা হারিয়েছে।’
তবে দক্ষিণ আফ্রিকান অধিনায়কও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এবারের সিরিজটা বাংলাদেশ ঘরের মাঠে খেলবে না। তাদের লড়াই করতে হবে অচেনা কন্ডিশনের সঙ্গেও, ‘এখানকার কন্ডিশন ভিন্ন। এখানে এসে আমাদের হারানোটা তাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।’ সেরা খেলাটা খেলতে না পারলে যেকোনো দলের সঙ্গেই হারার শঙ্কা থাকে, ৪৩টি টেস্ট আর ১১৩টি ওয়ানডের অভিজ্ঞতার পর সেটি তাঁকে কারও বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ডু প্লেসি জানালেন, ‘অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে খেলার আগে আমরা যে রকম প্রস্তুতি নিয়ে থাকি, এবারও সে রকমই নিয়েছি। বাংলাদেশকে কোনোভাবেই হালকা করে নিচ্ছি না।’
দক্ষিণ আফ্রিকার এই সতর্কতা বাংলাদেশ দলের সাম্প্রতিক অঘটনঘটনপটীয়সিতার কারণে। তবে সাকিব আল হাসান না থাকায় দল তো একটু হালকা হয়ে আছেই। অলরাউন্ডার সাকিবের জায়গায় এখন দুজন খেলোয়াড়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। কাল সংবাদ সম্মেলনে সে চ্যালেঞ্জের কথাই বলছিলেন অধিনায়ক মুশফিক, ‘আমরা সব সময় সেরা কম্বিনেশন নিয়ে খেলার চেষ্টা করি। এখন দুজন খেলোয়াড় খেলাতে হবে। একজন ব্যাটসম্যান খেলাতে পারি। একজন পেসার বা একজন বাড়তি স্পিনারও নিতে পারি। সব দিক বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কাজটা অবশ্যই কঠিন।’
সাকিবের অনুপস্থিতিকে নিজেদের জন্য বিরাট সুবিধা মনে করছেন ফাফ ডু প্লেসি। সাকিব অসাধারণ ক্রিকেটার, অপরিচিত কন্ডিশনে পারফর্ম করতে পারে, তার না খেলা বাংলাদেশের জন্য বিরাট ক্ষতি ইত্যাদি বলে দক্ষিণ আফ্রিকান অধিনায়ক শেষ পর্যন্ত স্বীকারই করে ফেললেন, ‘আমি খুব খুশি যে সাকিব খেলবে না।’ প্রথম টেস্টের আগে একটা দুঃসংবাদও অবশ্য শুনতে হয়েছে স্বাগতিক দলকে। পিঠের সমস্যায় পেসার ভারনন ফিল্যান্ডার ছিটকে গেছেন পুরো সিরিজ থেকেই।
সাকিব বিশ্রামে, পচেফস্ট্রুমে সৌম্য সরকারের খেলার সম্ভাবনাও কম বলেই জানা গেছে। তাঁর কাঁধের আড়ষ্টতা এখনো আছে। তবে তামিম ইকবাল পুরোপুরি সুস্থ। সৌম্য না খেললে পচেফস্ট্রুমে তামিমের সঙ্গে ওপেনিং জুটিতে ফিরবেন ইমরুল কায়েস। বাংলাদেশ দলের ঘাটতি নেই কেবল এক জায়গায়—প্রস্তুতি। একটি প্রস্তুতি ম্যাচসহ গত ১০ দিনে দক্ষিণ আফ্রিকায় যা-ই অনুশীলন হয়েছে, তাতে সন্তুষ্ট অধিনায়ক।
টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর গত প্রায় ১৭ বছরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে এটি বাংলাদেশের পঞ্চম টেস্ট। এখানকার কন্ডিশন, এখানকার উইকেট সম্পর্কে কতটা ধারণা থাকতে পারে মুশফিকুর রহিমের দলের, সে তো বোঝাই যাচ্ছে। সর্বশেষ ২০০৮ সালের সফরে ছিলেন, এ রকম ক্রিকেটারও দলে আছেন মাত্র তিনজন।
সাকিবের অনুপস্থিতি, কন্ডিশনের সঙ্গে অনভ্যস্ততা আর টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান যোগ করলে টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশ দলের কাছে প্রত্যাশা থাকে সামান্যই। আত্মবিশ্বাসের সলতে যেটুকু জ্বলছে, সেটায় জ্বালানি দিচ্ছে সাম্প্রতিক সাফল্য। বিদেশের মাটিতে ভালো খেলার লক্ষ্য নিয়ে বছর শুরু করে কলম্বোয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শততম টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার জল-হাওয়া তার চেয়ে ভিন্ন হলেও ভালো খেলার কাছে তো সবই হেরে যায়!
সীমাবদ্ধতাগুলো মাথায় রাখার পাশাপাশি মুশফিক তাই ভালো কিছু পাওয়ার সমীকরণও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলছেন না, ‘গত দুই বছরে আমরা টেস্টে অনেক বড় বড় উদাহরণ তৈরি করেছি। এটাও অনেকে বলতে পারে, দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে ওদের হারানো অসম্ভব কল্পনা। আমার এটা মনে হয় না। আমরা যদি নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলতে পারি তাহলে বিশ্বের যেকোনো দল আমাদের কাছে হারতে পারে।’
বাংলাদেশ আগে কখনো দেশের মাটিতেও অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডকে হারাতে পারেনি। এখন সেটাও বাস্তব। দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অসম্ভব কিছু করার আশা তাহলে থাকবে না কেন? সবকিছুরই তো একটা শুরু থাকে!
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























