অাকাশ বিনোদন ডেস্ক:
এখনো ধিক ধিক করে জ্বলছে আগুন। একটু একটু ধোঁয়াও উঠছে ধ্বংসস্তূপ থেকে। গত শনিবার দুপুরে আগুনের তাণ্ডবে ধ্বংস হয়ে যায় ভারতের মুম্বাইয়ের ঐতিহ্যবাহী আরকে স্টুডিওর কিছু অংশ। গতকাল রোববার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দমকলকর্মীরা চাপা আগুন নেভাতে ব্যস্ত। আরকে স্টুডিওর বাইরে পুলিশের কড়া নিরাপত্তা। দুর্ঘটনাস্থলে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ কর্মকর্তারা এই অগ্নিকাণ্ডের তদন্তের কাজ করছেন। কাপুর পরিবারের তিন ভাই রণধীর কাপুর, ঋষি কাপুর ও রাজীব কাপুর দাঁড়িয়ে থেকে পুরো বিষয় তদারকি করছেন।
মনে পড়ে, ঋষি কাপুরের ‘কর্জ’ সিনেমার সেই জনপ্রিয় গান ‘ওম শান্তি ওম’। গত শনিবারের আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে নিয়েছে ‘ওম শান্তি ওম’ গানের সেই মঞ্চ। ‘আর কে স্টুডিও’র এই ঘূর্ণমান মঞ্চে গানের দৃশ্যটির শুট হয়েছিল। তবে এখন এই মঞ্চে সনি চ্যানেলের রিয়েলিটি শো ‘সুপার ড্যান্সার’-এর শুটিং হয়। গত শুক্রবার এই ঝাঁ চকচকে মঞ্চে শেষ শুটিং হয় সনির এই নাচের রিয়েলিটি শো। শনিবার কোনো শুট ছিল না। তা না হলে বড় কোনো অঘটন ঘটতে পারত।
আর কে স্টুডিওর এক প্রত্যক্ষদর্শী অগ্নিকাণ্ড প্রসঙ্গে বলেন, ‘হঠাৎ একটা বিকট আওয়াজ হয়। ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। তারপর দেখি দাউ দাউ করে জ্বলছে মঞ্চটি। কিছু বুঝে ওঠার আগে হুড়মুডিয়ে ভেঙে পড়ে।’
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়, ‘এই মঞ্চে নিয়মিত সনির “সুপার ড্যান্সার” অনুষ্ঠানের শুটিং হয়। ভাগ্যিস, এদিন কোনো শুটিং ছিল না। শুটিংয়ের জন্য বড় বড় আলো ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ওখানে প্রচুর কাঠের জিনিসও ছিল। কী থেকে আগুন লাগলে, তা দমকল বিভাগের আধিকারিক এবং তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিকরাই বলতে পারবেন।’
সূত্রের খবর অনুযায়ী, ‘আর কে ফিল্ম প্রযোজিত ছবিগুলোতে ব্যবহৃত অনেক পোশাক এই স্থানে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। তা সব আগুনে পুড়ে গেছে। আর কে স্টুডিওর এই অগ্নিকাণ্ডের তদন্তকারী উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা চন্দ্রকান্ত বনকর প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো দমকলকর্মীরা আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। ধিক ধিক করে আগুন জ্বলছে। আমরা তদন্তকারী অফিসাররা আগুন লাগার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। এখনই এ ব্যাপারে সঠিক কিছু জানাতে পারব না। তদন্তের কাজ এখনো চলছে। তবে দুর্ঘটনাস্থলে দাহ্য পদার্থ ছিল।’
গোবান্দি থানার এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কেউ এতটুকু আঘাত পাননি। অগ্নিকাণ্ডের সময় আমরা স্টুডিও-সংলগ্ন বাড়িগুলো খালি করতে বলেছিলাম। তবে আজ (রোববার) আর কোনো ভয়ের কারণ নেই।’
অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা ছিল কি না, সে প্রসঙ্গে চন্দ্রকান্ত বনকর বলেন, ‘অবশ্যই ছিল। তবে দুর্ঘটনাস্থলে কেউ না থাকায় তা ব্যবহার করা যায়নি।’
প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ কাপুর ১৯৪৮ সালে মুম্বাইয়ের চেম্বুরে আর কে স্টুডিও গড়ে তোলেন। একই বছর এই স্টুডিওতে রাজ কাপুর অভিনীত ‘আগ’ ছবির শুটিং হয়। কিন্তু ছবিটি বক্স অফিসে সেভাবে সাড়া জাগাতে পারেনি। এরপর ১৯৪৯ সালে আর কে স্টুডিওতে জন্ম হয় কালজয়ী ছবি ‘বরসাত’। এই ছবিতে রাজ কাপুরের বিপরীতে ছিলেন অভিনেত্রী নার্গিস। তখন সেন্সর বোর্ড ‘বরসাত’কে ‘এ’ সার্টিফিকেট দেয়, কারণ ছবিতে নার্গিসের গায়ে দোপাট্টা ছিল না। তবু রাজ কাপুরের এই ছবিটি বক্স অফিসে দারুণ সাড়া ফেলে। এই চূড়ান্ত সাফল্যের পর রাজ কাপুর ‘বরসাত’-এর অন্তরঙ্গ পোস্টারকে আর কে স্টুডিওর লোগো হিসাবে ব্যবহার করেন। এরপর ‘আওয়ারা’, ‘শ্রী ৪২০’, ‘জাগতে রহো’, ‘জিস দেশ মে গঙ্গা বহতে হ্যায়’, ‘সঙ্গম’, ‘ববি’, ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’, ‘রাম তেরি গঙ্গা মাইলি’, ‘প্রেমগ্রন্থ’সহ একাধিক সাড়া জাগানো সুপার হিট ছবি আর কে স্টুডিওতে শুটিং হয়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী স্টুডিওতে শেষ সিনেমা শুট হয় ঋষি কাপুর পরিচালিত ‘আ আব লৌট চলে’। রাজ কাপুরের ৬০তম জন্মদিন উদ্যাপন করা হয় আর কে স্টুডিওর সেই মঞ্চে, যা অগ্নিকাণ্ডের পর একেবারেই ধ্বংস হয়ে গেছে।
সম্প্রতি এক সাংবাদ সম্মেলনে রাজ কাপুরের ছেলে অভিনেতা ঋষি কাপুর বলেন, ‘হিন্দি চলচ্চিত্রে কাপুর পরিবারের অবদান অপরিসীম। ১৯২৭ সালে আমার দাদা পৃথ্বীরাজ কাপুর চলচ্চিত্র দুনিয়ায় আসেন। আজ হিন্দি চলচ্চিত্রের বয়স ১০৭ বছর। তার মধ্যে কাপুর পরিবার ৯০ বছর ধরে কাজ করছে। চার প্রজন্ম ধরে আমরা এই দুনিয়ার সঙ্গে জড়িত। এই বিষয়ে আমরা বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী। চলচ্চিত্র দুনিয়ায় নানা অবদানের মধ্যে আর কে স্টুডিও অন্যতম। এই স্টুডিও একাধিক হিট ছবি হিন্দি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের উপহার দিয়েছে।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























