আমলারা হেরে যাচ্ছেন জন প্রতিনিধিদের কাছে

139

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

করোনা সংকটের শুরু থেকেই রাজনৈতিক সমাধানের বদলে আমলাতান্ত্রিক সমাধানের পথে হেঁটেছে সরকার। মন্ত্রী, এমপি, জনপ্রতিনিধিদেরকে সাইডলাইনে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে আনা হয়েছিল আমলাদের। বিশেষ করে করোনা সংকটের কারণে দরিদ্র মানুষের খাদ্য সংকট, অভাব অনটন ইত্যাদি মিটানোর জন্য সরকার যে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করেছিল সেই ত্রাণ তৎপরতায় জন প্রতিনিধিদেরকে প্রথমেই গুরুত্বহীন করে দেয়া হয়েছিল। এর অবশ্য যৌক্তিক কারণও ছিল। মুষ্টিমেয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধির ত্রাণের সম্পদ লুণ্ঠন ও আত্মসাতের কারণে এ নিয়ে সরকার কোন বিতর্কে যেতে চায়নি।

বিতর্ক এড়াতেই আমলাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। জেলাগুলোতে জেলা প্রশাসকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রত্যেকটি জেলায় একজন করে সচিবকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সব সময় রাজনৈতিক সরকারের শিষ্টাচার ছিল যে প্রতিটি জেলায় একজন করে রাজনৈতিক মন্ত্রী সমস্ত বিষয়গুলো দেখভাল করবেন। কিন্তু সেই ব্যবস্থা পাল্টে জেলায় সচিবদের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। কিন্তু সময় যতই গড়াল দেখা গেলো যে আমলারা পর্যুদস্ত হয়ে যাচ্ছেন জনপ্রতিনিধিদের কাছে। কারণ, আমলাদের ফাইল ভিত্তিক দায়সারা এবং সরকার নির্ভর ত্রাণ তৎপরতা জনপ্রতিনিধিদের বিপুল উদ্যোগের কাছে একেবারেই পাত্তা পাচ্ছে না।

এখন যতই দিন গড়াচ্ছে ততই দেখা যাচ্ছে যে, সরকারি ত্রাণ সাহায্যের উপর মানুষ আর নির্ভর করছে না বরং জনপ্রতিনিধি রাজনৈতিক বৃন্দের ত্রাণ সাহায্য পেয়েই তারা সন্তুষ্ট হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনা করা যাবে কিনা এই নিয়ে যে সংশয় ছিল সেই সংশয়ের কালো মেঘও ক্রমশ কেটে যাচ্ছে। কেন আমলারা পারছেন না রাজনীতিবিদদের সঙ্গে? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে যে:-

প্রথমত; আমলারা শুধুমাত্র সরকারি ত্রাণ সাহায্যের উপর নির্ভর, কিন্তু সরকারি যে ত্রাণ সাহায্য তা সব মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

দ্বিতীয়ত; আমলারা স্থানীয় লোকজনকে চেনেন না স্থানীয় লোকজনের সাথে তাদের তেমন সম্পর্ক নেই যার ফলে তারা সত্যিকারে কারা ত্রাণ পাওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন বা কাদের ত্রাণ দরকার সেই সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই।

তৃতীয়ত; যে সচিবদের কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা একদিন বা দুইদিন এলাকায় যাচ্ছেন। কিন্তু ওই এলাকার মন্ত্রী বা ওই এলাকার হেভি ওয়েট নেতার সঙ্গে ওই এলাকার নাড়ির সম্পর্ক, ওই এলাকার প্রত্যেকটির মানুষের সম্পর্কে তাদের কাছে তথ্য আছে যে কারণেই এই এমপি, জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা অনেক বেশি তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছেন।

আমলারা শুধুমাত্র ফাইল অনুযায়ী কাজ করছেন। কিন্তু রাজনীতিবিদরা দেখছেন তারা কখন কোনটা দরকার হবে, কোনটা লাগবে। শুরুতে দেখা গিয়েছিল যে জেলা প্রশাসকরা যে ত্রাণ সাহায্য দিচ্ছেন তার উপরেই মানুষজন পুরোপুরি নির্ভর করে আসছেন এবং সরকারের ত্রাণ সাহায্যের উপর নির্ভর করে আসছেন। কিন্তু আস্তে আস্তে এমপিরা মাঠে নামতে শুরু করেন। বিশেষ করে কিছু কিছু এমপি সরকার কি করলো না করলো তার দিকে না তাকিয়ে নিজেরাই কাজ করা শুরু করেছেন। নিজেদের উদ্যোগে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করেন এবং যখন যেটা প্রয়োজন সেই ভিত্তিতে তারা ত্রাণ সহায়তা শুরু করেন।

শতাধিক এমপি তাদের নিজ এলাকায় মাটি কামড়ে পড়ে আছেন মানুষকে সহায়তা করার জন্য। এমপিরা, জনপ্রতিনিধিরা মনে করছেন এটাই সুযোগ, এই সময় যদি তারা জনগনের পাশে থাকতে পারেন তাহলে আগামী নির্বাচন হয়তো তাদের জন্য সহজ হবে। এই সুযোগটিকে তারা কাজে লাগিয়েছেন। আবার রাজনীতিবিদদের বৈশিষ্ট্যই হল তাদের যাই থাকুক না কেন তাদেরকে জনগণের সাথে সম্পর্কিত থাকতে হয়। আর জনগণের সঙ্গে তারা সম্পৃক্তই থাকেন জন্যই তারা রাজনীতিবিদ হতে পেরেছেন।

শেষ বিচারে রাজনীতিবিদরা বা জন প্রতিনিধিরা জানেন, জনগণ যদি তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেন তাদের কিছুই নাই। অন্যদিকে আমলারা জানেন যে জনগণ তাদেরকে গ্রহণ করলো না প্রত্যাখ্যান করলো তাদের কিছু যায় আসে না। তারা সরকারি চাকুরে, আজকে তারা এই এলাকায় আছেন কালকে অন্য এলাকায় চলে যাবেন। কাজেই জনপ্রতিনিধিদের জন্য এই সংকটে জনগনের পাশে দাঁড়ানো তাদের অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ আর আমলাদের জন্য এটা একটা চাকরি। এই বিবেচনায় ক্রমশ আমলারা পরাজিত হচ্ছেন জনপ্রতিনিধিদের কাছে।