ঢাকা ১২:৪০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৯৫, আহত ১১ হাজার: এইচআরএসএসের প্রতিবেদন ক্ষমতায় এলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে দেবে জামায়াত: মিন্টু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে মাঠ পর্যায় পরিদর্শনে নৌবাহিনী প্রধান জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের ঘটনায় বঙ্গভবনের কর্মকর্তা আটক আমরা বসন্তের কোকিল নই, জুলুম-নির্যাতনের পরও দেশ ছাড়িনি: শফিকুর রহমান ‘শুধু একদিন আমার হাঁসটাকে পাহারা দেন, নির্বাচিত হলে ৫ বছর আপনাদেরকে পাহারা দেব’:রুমিন ফারহানা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ রুখতে ছাত্র-জনতাকে রাজপথে থাকতে হবে: মামুনুল হক সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য জনমুখী নীতিমালার আহ্বান বাংলাদেশের অনলাইন গেমে আসক্তি, নবম তলা থেকে লাফিয়ে তিন বোনের আত্মহত্যা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ধানের শীষে ভোট চাইলেন যুবলীগ নেতা

তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক কি ঈশ্বর?

অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

একটি ছবি। ছবিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে। মেয়েটির নাম এমিনে শাহীন বয়স ২১ বছর। কালো বোরকায় ঢাকা পুরো শরীর শুধু চোখ দুটি দেখা যায়। একজন মহিলা পুরুষ তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

ছবিটি তুরস্কের পশ্চিম অঞ্চলীয় এদিরনে শহর থেকে তোলা। মেয়েটির অপরাধ সে তুরস্কের প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং আধুনিক তুর্কির জন্মদাতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে অপমান করেছে।

১০ নভেম্বর আতাতুর্কের মৃত্যু দিবস। আজ থেকে ৮০ বছর আগে ১৯৩৮ সালের ১০ নভেম্বর সকাল ৯টা ৫ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন তুর্কির এই রাষ্ট্রনায়ক। তার মৃত্যুর স্মরণে সারা দেশে ১০ নভেম্বর সকাল ৯টা বেজে ৫ মিনিটের সময় এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।

বাসায় অফিসে বাসে মেট্রোতে ট্রেনে নৌকায় জাহাজে যে খানে যে অবস্থায় যে কাজেই থাকুক না কেন সব কিছু বন্ধকরে দিয়ে দাঁড়িয়ে পরে তাদের জাতির পিতার সম্মানে।

তুর্কির প্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে আতাতুর্ক এবং ধর্মনিরপেক্ষতা পরিপন্থী দল ডেমোক্রাট পার্টি ক্ষমতায় আসে ১৯৫০ সালে। ১৯৫১ সালের ৩১ জুলাই ডেমোক্র্যাট পার্টি লিডার আদনান মেনদেরেস নির্দেশে প্রথম আতাতুর্ক সুরক্ষা আইন নাম একটি আইন সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

এই আইনের মাধ্যমে আতাতুর্কের স্মৃতির অপমান বা অসদাচরণকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়।

আইনে বলা হয়, কেউ আতাতুর্কের স্মৃতিগুলোকে প্রকাশ্যে অপমান বা অসদাচরণ করলে তাকে এক থেকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে।

আতাতুর্ককের মূর্তি, স্মৃতিসৌধ, অথবা কবরকে যদি কেউ ভেঙে ফেলে বা ধ্বংস করে ফেলে তাহলে তাকে এক থেকে পাঁচ বছরের জন্য কারাদণ্ড দেয়া হয়। কোনো ব্যক্তি উপরের অনুচ্ছেদের লিখিত অপরাধের জন্য অন্যদের উৎসাহিত করলে তাকে প্রধান অপরাধী হিসাবে শাস্তি দেয়া হবে।

পত্রপত্রিকার খবরে বলা হয়, এডিরনে প্রদেশের ওই মেয়েটি আতাতুর্কের সম্মানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে, ‘আতাতুর্ক ঈশ্বর নন। আল্লাহর আইন আছে। আতাতুর্ক এদেশে পশ্চিমা আইন পরবর্তন করেছেন।’

ঘটনার পরপরই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। হাসপাতালে মেডিকেল চেকআপ এর সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আসলে ওইভাবে বলিনি। আমি বলতে চেয়েছি আমরা শুধু আল্লাহর আইন মেনে কিয়াম করি (নামাজে দাঁড়াই)। অন্য কারো জন্য দাঁড়ানোর নিয়ম নাই ইসলামে নাই। এটা পশ্চিমা আইন।”

এমিনে শাহীনের হয়তো জেল হতে পারে কিন্তু তাকে গ্রেফতারের ঘটনা আতাতুর্কের প্রতি মানুষের মাঝে সম্মান বাড়াবে না বটে।

১০ নভেম্বর সকলের সামনে দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোর নিয়ম থাকলেও প্রতি বছরই অনেক মানুষকে হাঁটতে বা গাড়ি চালিয়ে যেতে দেখা যায়। যুবসমাজ বিষয়টা নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত। অনেক এর বিরুদ্ধে মুখ খুলে তাদের বিরোক্ততার কথা প্ৰকাশ করে। গত বছর ও ইস্তাম্বুলে অনেকেই যখন দাঁড়িয়ে পড়ল একদল কলেজ পড়ুয়া স্টুডেন্টকে হাটতে দেখা গেছে। এরকম ঘটনা তুরস্কের সব এলাকায় ঘটতে দেখা যায়।

মজার বিষয় হলো আতাতুর্ককে সম্মান দেখানো বা না দেখানো নিয়ে যে বিতর্ক তুর্কিতে অনেক দিন ধরে চলছে তার মূলে ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী আর ধর্ম নিরপেক্ষদের বিবাদকেই আসল প্রভাবক হিসেবে মনে করা হয়। কিন্তু আইনটি যে প্রণয়ন করছে সেই আদনান মেনদেরেসকে তুর্কির ডানপন্থীরা নিজেদের বীর মনে করে।

আদনান মেনডেরেসকে ১৯৬০ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং ফাঁসি দেয়ার পিছনেও এই ধর্ম নিরপেক্ষ মতবাদীদের দায়ী করা হয়।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোগানও মনে করেন আদান মেনদেরেস তাদের যোগ্য পূর্বপরুষ যিনি তুরস্ককে আতাতুর্কের ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ থেকে কিছুটা হলেও ইসলামী মূল্যবোধে ফিরিয়ে এনেছেন। অথচ সেই আদনান মেনদেরেসই নাকি আতাতুর্ক সুরক্ষা আইন পাস করেন। অথচ তুরস্ক সময় দৃঢ় বিশেষ করে যে আইনটি মেনদেরেসের পূর্বের প্রেসিডেন্ট যিনি আতাতুর্কের পার্টির প্রধান তিনিই আইনটি পাস করেছেন।

আর তুরস্কের ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসীরাও মনে করেন আইনটি আতাতুর্কের পার্টির চাপিয়ে দেয়া একটা বিষয়। অথচ আসল ঘটনা পুরোই ভিন্ন।

আইনের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির সম্মান বাড়ানো সম্ভব না কিন্তু দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা ব্যক্তিত্ব এবং প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করতে আইনের দরকার হয়। কিন্তু মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে নয়।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৯৫, আহত ১১ হাজার: এইচআরএসএসের প্রতিবেদন

তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক কি ঈশ্বর?

আপডেট সময় ০৮:২৯:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮

অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

একটি ছবি। ছবিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে। মেয়েটির নাম এমিনে শাহীন বয়স ২১ বছর। কালো বোরকায় ঢাকা পুরো শরীর শুধু চোখ দুটি দেখা যায়। একজন মহিলা পুরুষ তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

ছবিটি তুরস্কের পশ্চিম অঞ্চলীয় এদিরনে শহর থেকে তোলা। মেয়েটির অপরাধ সে তুরস্কের প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং আধুনিক তুর্কির জন্মদাতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে অপমান করেছে।

১০ নভেম্বর আতাতুর্কের মৃত্যু দিবস। আজ থেকে ৮০ বছর আগে ১৯৩৮ সালের ১০ নভেম্বর সকাল ৯টা ৫ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন তুর্কির এই রাষ্ট্রনায়ক। তার মৃত্যুর স্মরণে সারা দেশে ১০ নভেম্বর সকাল ৯টা বেজে ৫ মিনিটের সময় এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।

বাসায় অফিসে বাসে মেট্রোতে ট্রেনে নৌকায় জাহাজে যে খানে যে অবস্থায় যে কাজেই থাকুক না কেন সব কিছু বন্ধকরে দিয়ে দাঁড়িয়ে পরে তাদের জাতির পিতার সম্মানে।

তুর্কির প্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে আতাতুর্ক এবং ধর্মনিরপেক্ষতা পরিপন্থী দল ডেমোক্রাট পার্টি ক্ষমতায় আসে ১৯৫০ সালে। ১৯৫১ সালের ৩১ জুলাই ডেমোক্র্যাট পার্টি লিডার আদনান মেনদেরেস নির্দেশে প্রথম আতাতুর্ক সুরক্ষা আইন নাম একটি আইন সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

এই আইনের মাধ্যমে আতাতুর্কের স্মৃতির অপমান বা অসদাচরণকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়।

আইনে বলা হয়, কেউ আতাতুর্কের স্মৃতিগুলোকে প্রকাশ্যে অপমান বা অসদাচরণ করলে তাকে এক থেকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে।

আতাতুর্ককের মূর্তি, স্মৃতিসৌধ, অথবা কবরকে যদি কেউ ভেঙে ফেলে বা ধ্বংস করে ফেলে তাহলে তাকে এক থেকে পাঁচ বছরের জন্য কারাদণ্ড দেয়া হয়। কোনো ব্যক্তি উপরের অনুচ্ছেদের লিখিত অপরাধের জন্য অন্যদের উৎসাহিত করলে তাকে প্রধান অপরাধী হিসাবে শাস্তি দেয়া হবে।

পত্রপত্রিকার খবরে বলা হয়, এডিরনে প্রদেশের ওই মেয়েটি আতাতুর্কের সম্মানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে, ‘আতাতুর্ক ঈশ্বর নন। আল্লাহর আইন আছে। আতাতুর্ক এদেশে পশ্চিমা আইন পরবর্তন করেছেন।’

ঘটনার পরপরই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। হাসপাতালে মেডিকেল চেকআপ এর সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আসলে ওইভাবে বলিনি। আমি বলতে চেয়েছি আমরা শুধু আল্লাহর আইন মেনে কিয়াম করি (নামাজে দাঁড়াই)। অন্য কারো জন্য দাঁড়ানোর নিয়ম নাই ইসলামে নাই। এটা পশ্চিমা আইন।”

এমিনে শাহীনের হয়তো জেল হতে পারে কিন্তু তাকে গ্রেফতারের ঘটনা আতাতুর্কের প্রতি মানুষের মাঝে সম্মান বাড়াবে না বটে।

১০ নভেম্বর সকলের সামনে দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোর নিয়ম থাকলেও প্রতি বছরই অনেক মানুষকে হাঁটতে বা গাড়ি চালিয়ে যেতে দেখা যায়। যুবসমাজ বিষয়টা নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত। অনেক এর বিরুদ্ধে মুখ খুলে তাদের বিরোক্ততার কথা প্ৰকাশ করে। গত বছর ও ইস্তাম্বুলে অনেকেই যখন দাঁড়িয়ে পড়ল একদল কলেজ পড়ুয়া স্টুডেন্টকে হাটতে দেখা গেছে। এরকম ঘটনা তুরস্কের সব এলাকায় ঘটতে দেখা যায়।

মজার বিষয় হলো আতাতুর্ককে সম্মান দেখানো বা না দেখানো নিয়ে যে বিতর্ক তুর্কিতে অনেক দিন ধরে চলছে তার মূলে ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী আর ধর্ম নিরপেক্ষদের বিবাদকেই আসল প্রভাবক হিসেবে মনে করা হয়। কিন্তু আইনটি যে প্রণয়ন করছে সেই আদনান মেনদেরেসকে তুর্কির ডানপন্থীরা নিজেদের বীর মনে করে।

আদনান মেনডেরেসকে ১৯৬০ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং ফাঁসি দেয়ার পিছনেও এই ধর্ম নিরপেক্ষ মতবাদীদের দায়ী করা হয়।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোগানও মনে করেন আদান মেনদেরেস তাদের যোগ্য পূর্বপরুষ যিনি তুরস্ককে আতাতুর্কের ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ থেকে কিছুটা হলেও ইসলামী মূল্যবোধে ফিরিয়ে এনেছেন। অথচ সেই আদনান মেনদেরেসই নাকি আতাতুর্ক সুরক্ষা আইন পাস করেন। অথচ তুরস্ক সময় দৃঢ় বিশেষ করে যে আইনটি মেনদেরেসের পূর্বের প্রেসিডেন্ট যিনি আতাতুর্কের পার্টির প্রধান তিনিই আইনটি পাস করেছেন।

আর তুরস্কের ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসীরাও মনে করেন আইনটি আতাতুর্কের পার্টির চাপিয়ে দেয়া একটা বিষয়। অথচ আসল ঘটনা পুরোই ভিন্ন।

আইনের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির সম্মান বাড়ানো সম্ভব না কিন্তু দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা ব্যক্তিত্ব এবং প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করতে আইনের দরকার হয়। কিন্তু মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে নয়।