অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দেড় বছর আগেই লন্ডনে যুদ্ধ প্রস্তুতির এক অজানা ইতিহাস তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই প্রস্তুতি হয়েছিল যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে।
সেখানে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে আসেন দুই ভারতীয় কর্মকর্তা। আর সেখানেই কীভাবে যুদ্ধ হবে, প্রস্তুতির কী হবে, সে সব বিষয়ে নেতা-কর্মীদেরকে জানিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু।
স্বাধীনতার ৪৮ তম বার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীতে আওয়ামী লীগের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা জানান। বঙ্গবন্ধুর ওই বৈঠকের সময় শেখ হাসিনা নিজেও লন্ডনে ছিলেন।
গত ৯ মার্চ রাজধানীতে আওয়ামী লীগের আরেক আলোচনায় বঙ্গবন্ধুর এই লন্ডন সফর এবং ১৯৬২ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার চেষ্টা হিসেবে আগরতলায় যাওয়ার কথা জানান শেখ হাসিনা। তবে সে সময় ভারত সরকারের প্রতিনিধির সঙ্গে আর বৈঠক হয়নি।
সেদিন শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) কিন্তু ৬২ সালে (১৯৬২) আগরতলা গিয়েছিলেন। এটাও বাস্তবতা। তিনি গিয়েছিলেন; একটা প্রস্তুতি নেবার জন্য। কিন্তু যে কারণেই হোক নেহেরু সে সময় ক্ষমতায় ছিলেন… তার কাছ থেকে তেমন কোনো একটা সাড়া না পেয়ে তিনি ফেরত চলে আসেন।’
তবে সাড় বছর পর ভারত সরকার প্রতিনিধি পাঠিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠক করেছিল বলে জানান শেখ হাসিনা।
১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু যান লন্ডনে। আর শেখ হাসিনা তখন ছিলেন তার স্বামীর কর্মস্থল ইতালিতে। সেখান থেকে তিনি চলে যান লন্ডনে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ১৯৬৯ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু লন্ডনে ছিলেন। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনার অনেক কাজ করে আসেন তিনি।
প্রকাশ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করার সংগ্রামে অবদান রাখায় নেতা-কর্মীদের ধন্যবাদ জানাতে লন্ডনে এই বৈঠক ডাকা হয়। কিন্তু সেখানে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রতিটি পরিকল্পনার কথাও জানানো হয় নেতাদর।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘তখনই তিনি (বঙ্গবন্ধু) সেখানকার নেতা-কর্মীদেরকে বলে এসেছিলেন একটা যুদ্ধ হবে। আর যুদ্ধ করলে কী কী করতে হবে সে করণীয়ও তিনি বলে এসেছেন।’
‘আমার এখানে বলতে বাধা নেই, সেখানে দুই জন প্রতিনিধি এসেছিলেন ভারত থেকে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে মোটামুটি সব রকম ব্যবস্থাটা করে রাখেন।’
স্বাধীনতার ঘোষণা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণের আগেই স্বাধীনতা ঘোষণার প্রস্তুতি ছিল বলে জানান শেখ হাসিনা।
‘স্বাধীনতার ঘোষণার এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ তৈরিই করা ছিল। শওকত সাহেব, তার কাছে ওটা দেয়া ছিল।’
‘দায়িত্ব দেয়া ছিল যে সেই মুহূর্তে আক্রমণ হবে, তাকে সংকেত দেয়া হবে ফোনে, সাথে সাথে যেন সেটার প্রচার শুরু করে।’
‘তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চারজন মিলে ইপিআরের পিলখানা থেকে ওয়্যারলেসে এই ম্যাসেজটা পৌঁছান মগবাজার ওয়্যারলেস স্টেশন থেকে এটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সাথে সাথে টেলিগ্রাম, টেলিপ্রিন্টার দিয়ে এটা ছড়িয়ে দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের যে সংগ্রাম পরিষদ, তার সদস্যদের কাছে এই টেলিগ্রাম পৌঁছে দেয়া হয়।’
‘স্বাধীনতার ঘোষণা যখনই প্রচার হয়ে গেল, আমাদের বাসায় আক্রমণ হলো। তাকে নিয়ে যাওয়া হলো।’
বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে হবে, কীভাবে পরিচালনা হবে, সমস্ত কিছু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী হয়েছে।
যুদ্ধে যে জয় আসবে সে বিষয়ে বঙ্গবন্ধু নিশ্চিত ছিলেন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের পতাকার কী ডিজাইন হবে সেটাও তিনি ঠিক করে যান। …আমাদের জাতীয় সঙ্গীত কী হবে, সেটাও তিনি ঠিক করে দিয়ে যান।’
যুদ্ধ শেষে মিত্র বাহিনীর বিদায়
মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ এবং ভারতের মিত্র বাহিনীর কাছেই আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে কোনো দেশে যুদ্ধ হলে মিত্র বাহিনী থাকে। যে দেশে যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়, মিত্র শক্তি কিন্তু সে দেশেই থেকে যায়। বাংলাদেশ পৃথিবীতে একমাত্র ব্যতিক্রম দেশ।’
‘ভারতীয় মিত্র বাহিনী যারা আমাদের গেরিলা যোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে, হাজার হাজার ভারতীয় সৈন্য জীবন দিয়েছে, তারা অস্ত্র শস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেছে। তারপরেও জাতির পিতার অনুরোধে মিসেস গান্ধি (ভারতের সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী) তাদেরকে ফেরত নিয়ে যান।’
‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) স্বাধীনচেতা ছিলেন, বাংলাদেশকে তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে।’
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাতেই চাকরিতে কোটা
দীর্ঘ বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়টি নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ফেরার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, তার চেষ্টা শুরু থেকেই ছিল বাংলাদেশকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলার। আর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা দেয়ার চেষ্টা এবং উদ্দেশ্যেই যোদ্ধাদের ছেলে মেয়ে, নাতিপুতি যেন চাকরি পায়, সেজন্য তাদের জন্য কোটার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের কারণেই তো আমরা দেশকে স্বাধীন করতে পেরেছি, তাদের যে আত্মত্যাগ, সে আত্মত্যাগ আমরা ভুলে যাব কীভাবে।’
‘৭৫ এর পরে যে কয়জন হয়ত দালালি করতে পেরেছে, সেটা তো আলাদা কথা। আর যারা পারেনি, তাদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন। একজন মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষা করে খাবে বা রিকশা চালিয়ে খাবে, এটা আমাদের জন্য অপমানজনক।’
‘আর তাদের ছেলে মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারবে না, এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক।’
প্রায় ৫০ মিনিটের বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা বলতে না পারার কথা বলে আবেগে আপ্লুত হয়ে যান।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নিয়ে আসা, ইতিহাস বিকৃতি, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে অত্যাচার, নির্যাতন, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের কথাও তুলে ধরেন।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তাকে গ্রেপ্তার করার বিষয়েও কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, কারা এর পেছনে ছিল, সেটা তিনি জেনেছেন এবং তাদের হিসেব নিকেশ পরে করবেন তিনি।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















