ঢাকা ১০:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেলে হাম আক্রান্ত ২১ শিশু ভর্তি আন্দোলন ছাড়া আমাদের করার আর কী আছে: ওয়াকআউটের পর বিরোধীদলীয় নেতা প্রাথমিকেও অনলাইন ক্লাস নিয়ে আলোচনা, অফলাইনে পাঠদানের পরামর্শ শিক্ষকদের সংসদে বিরল নজির, সরকারি দলের এমপির মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ দেশের ইতিহাসে রেকর্ড রেমিট্যান্স এলো মার্চে পাকিস্তানে ‘ভারত-সমর্থিত’ ১৩ জঙ্গি নিহত: আইএসপিআর গণভোট উপেক্ষা বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্ম দেবে: আবদুর রব নেপালকে হারিয়ে ফাইনালে বাংলাদেশ এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরীর দুই ছেলেসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা বিমা খাতে অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে: আবদুর রহমান

ইরান যুদ্ধ: ঝুঁকির মুখে ভারতের ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সংযোগ

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গভীর সংকটে পড়েছে ভারতের ইন্টারনেট ও ডিজিটাল অবকাঠামো। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন কেবলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে এখন চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ভারতের মোট ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় ৬০ শতাংশই মুম্বাই থেকে ইউরোপ অভিমুখে যাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই অঞ্চলে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে পুরো দেশের ইন্টারনেট গতি, ক্লাউড পরিষেবা এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

লোহিত সাগরের তলদেশ দিয়ে বর্তমানে ১৭টি সাবমেরিন কেবল এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার মধ্যে ডেটা বা তথ্য আদান-প্রদান করছে। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একসঙ্গে সব কেবল বিচ্ছিন্ন করা কঠিন হলেও কয়েকটি কেবলে আঘাত এলেই পুরো নেটওয়ার্কের গতি ধীর হয়ে যাবে। ভারতের মোট ট্রাফিকের বাকি ৪০ শতাংশ চেন্নাই থেকে সিঙ্গাপুর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হলেও পশ্চিম দিকের এই রুটটিই ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে।

চলমান ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের আবহে এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কেবল নেটওয়ার্ক নিয়ে কোনো হুমকি দেয়নি, তবুও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে সাবমেরিন কেবলের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। এমনকি স্বাভাবিক সময়েও সমুদ্রের তলদেশে কোনো ত্রুটি শনাক্ত করা এবং তা মেরামত করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল কাজ, যা যুদ্ধের পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রুটে বর্তমানে পাঁচটি প্রধান কেবল সিস্টেম সচল রয়েছে। এগুলো হলো এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপ ১, ফ্যালকন নেটওয়ার্ক, টাটা টিজিএন-গালফ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্য-পশ্চিম ইউরোপ ৪ এবং আইএমইডব্লিউই। ভারতের শীর্ষস্থানীয় টেলিকম প্রতিষ্ঠান যেমন রিলায়েন্স জিও, ভারতী এয়ারটেল, টাটা কমিউনিকেশনস এবং ভোডাফোন আইডিয়ার মতো সংস্থাগুলো সরাসরি এই রুটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের ব্যবসায়িক ঝুঁকির মাত্রা এখন তুঙ্গে।

বিগত বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অজ্ঞাত হামলার কারণে বিশ্বব্যাপী টেলিযোগাযোগের তিনটি প্রধান সাবমেরিন কেবল বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে ভারতের সাথে ইউরোপের ডেটা ট্রাফিকের ২৫ শতাংশ মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায়। সেই স্মৃতি এখনো তাজা থাকায় বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হলে ভারতের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব যে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই বিশেষজ্ঞদের।

টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান অনিল কুমার লাহোটি সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সতর্ক করে বলেছেন, ভারতের বর্তমান সাবমেরিন কেবল অবকাঠামো দেশটির ডিজিটাল উচ্চাকাঙ্ক্ষার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে বিশ্বের মোট সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশনের মাত্র এক শতাংশ ভারতে অবস্থিত। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের মতো ছোট একটি দেশে তিনটি জায়গায় ২৬টি কেবল ল্যান্ডিং সুবিধা রয়েছে, যা ভারতের তুলনায় অনেক বেশি সুসংগঠিত।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ভারত সরকার ইতিমধ্যেই সাবমেরিন কেবল অপারেটর এবং টেলিকম সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিস্তারিত বিশ্লেষণ জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধকবলিত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়া ডেটা পাইপলাইনগুলোর সুরক্ষায় বিকল্প কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। ভারতের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাবমেরিন কেবল অবকাঠামোকে ১০ গুণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের টেলিকম খাতের বিশেষজ্ঞরা ভারত সরকারকে ইরানের সাথে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের অবকাঠামো রক্ষার নিশ্চয়তা পাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যুদ্ধের দামামা যত বাড়ছে, ততই ঘনীভূত হচ্ছে ভারতের ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের আশঙ্কা।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

ইরান যুদ্ধ: ঝুঁকির মুখে ভারতের ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সংযোগ

আপডেট সময় ০৫:১৩:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গভীর সংকটে পড়েছে ভারতের ইন্টারনেট ও ডিজিটাল অবকাঠামো। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন কেবলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে এখন চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ভারতের মোট ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় ৬০ শতাংশই মুম্বাই থেকে ইউরোপ অভিমুখে যাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই অঞ্চলে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে পুরো দেশের ইন্টারনেট গতি, ক্লাউড পরিষেবা এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

লোহিত সাগরের তলদেশ দিয়ে বর্তমানে ১৭টি সাবমেরিন কেবল এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার মধ্যে ডেটা বা তথ্য আদান-প্রদান করছে। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একসঙ্গে সব কেবল বিচ্ছিন্ন করা কঠিন হলেও কয়েকটি কেবলে আঘাত এলেই পুরো নেটওয়ার্কের গতি ধীর হয়ে যাবে। ভারতের মোট ট্রাফিকের বাকি ৪০ শতাংশ চেন্নাই থেকে সিঙ্গাপুর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হলেও পশ্চিম দিকের এই রুটটিই ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে।

চলমান ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের আবহে এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কেবল নেটওয়ার্ক নিয়ে কোনো হুমকি দেয়নি, তবুও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে সাবমেরিন কেবলের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। এমনকি স্বাভাবিক সময়েও সমুদ্রের তলদেশে কোনো ত্রুটি শনাক্ত করা এবং তা মেরামত করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল কাজ, যা যুদ্ধের পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রুটে বর্তমানে পাঁচটি প্রধান কেবল সিস্টেম সচল রয়েছে। এগুলো হলো এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপ ১, ফ্যালকন নেটওয়ার্ক, টাটা টিজিএন-গালফ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্য-পশ্চিম ইউরোপ ৪ এবং আইএমইডব্লিউই। ভারতের শীর্ষস্থানীয় টেলিকম প্রতিষ্ঠান যেমন রিলায়েন্স জিও, ভারতী এয়ারটেল, টাটা কমিউনিকেশনস এবং ভোডাফোন আইডিয়ার মতো সংস্থাগুলো সরাসরি এই রুটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের ব্যবসায়িক ঝুঁকির মাত্রা এখন তুঙ্গে।

বিগত বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অজ্ঞাত হামলার কারণে বিশ্বব্যাপী টেলিযোগাযোগের তিনটি প্রধান সাবমেরিন কেবল বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে ভারতের সাথে ইউরোপের ডেটা ট্রাফিকের ২৫ শতাংশ মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায়। সেই স্মৃতি এখনো তাজা থাকায় বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হলে ভারতের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব যে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই বিশেষজ্ঞদের।

টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান অনিল কুমার লাহোটি সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সতর্ক করে বলেছেন, ভারতের বর্তমান সাবমেরিন কেবল অবকাঠামো দেশটির ডিজিটাল উচ্চাকাঙ্ক্ষার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে বিশ্বের মোট সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশনের মাত্র এক শতাংশ ভারতে অবস্থিত। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের মতো ছোট একটি দেশে তিনটি জায়গায় ২৬টি কেবল ল্যান্ডিং সুবিধা রয়েছে, যা ভারতের তুলনায় অনেক বেশি সুসংগঠিত।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ভারত সরকার ইতিমধ্যেই সাবমেরিন কেবল অপারেটর এবং টেলিকম সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিস্তারিত বিশ্লেষণ জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধকবলিত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়া ডেটা পাইপলাইনগুলোর সুরক্ষায় বিকল্প কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। ভারতের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাবমেরিন কেবল অবকাঠামোকে ১০ গুণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের টেলিকম খাতের বিশেষজ্ঞরা ভারত সরকারকে ইরানের সাথে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের অবকাঠামো রক্ষার নিশ্চয়তা পাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যুদ্ধের দামামা যত বাড়ছে, ততই ঘনীভূত হচ্ছে ভারতের ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের আশঙ্কা।