ঢাকা ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

থাইরয়েডের সমস্যা শুরুতে শনাক্ত হলে সুস্থ জীবন সম্ভব

আকাশ জাতীয় ডেস্ক : 

থাইরয়েডের রোগ শুরুতেই শনাক্ত করতে হবে। তাহলে এর চিকিৎসা সহজ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ত্বরান্বিত হবে। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করার জন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি। কারণ, দেশের প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ থাইরয়েডে ভুগছে। এর অর্ধেক এখনও শনাক্তের বাইরে।

থাইরয়েড সচেতনতা মাস উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকালের সভাকক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এ পরামর্শ দেন। বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইনোলজি সোসাইটি ও সমকালের যৌথ উদ্যোগে এ আলোচনার আয়োজন করা হয়। এতে বৈজ্ঞানিক সহযোগী ছিল রেনাটা পিএলসি। আলোচনার বিষয় ছিল– আপনার থাইরয়েডকে জানুন, রোগের শুরুতে শনাক্ত করুন, সুস্থ থাকুন। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।

থাইরয়েড হলো প্রজাপতি আকৃতির একটি গ্রন্থি, যা গলার সামনের অংশে থাকে। এটি শরীরের হরমোন উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৈঠকে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, নবজাতকের জন্মের সাত দিনের মধ্যে থাইরয়েড স্ক্রিনিং, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার আগেই নারীদের থাইরয়েড পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য ও স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

থাইরয়েড রোগের বিস্তার:
আলোচনায় বারডেমের পরিচালক (একাডেমি) ও বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইনোলজি সোসাইটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ফারুক পাঠান বলেন, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ কোটি মানুষ থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে এই রোগে আক্রান্ত। নারীর মধ্যে এ রোগের হার পুরুষের চেয়ে পাঁচ থেকে আট গুণ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো– প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ জানেনই না, তারা এ রোগে আক্রান্ত।
ডা. ফারুক পাঠান বলেন, থাইরয়েড হরমোন মানবদেহের শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ ও মানসিক সক্ষমতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

কারা ঝুঁকিতে:
ইউনাইটেড হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের মেটাবলিজম, শক্তি উৎপাদন, ওজন, হৃৎস্পন্দন ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নারী, ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি, অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত রোগী, গলায় রেডিয়েশন বা অস্ত্রোপচার হওয়া ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসব-পরবর্তী নারীরা থাইরয়েড রোগে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা:
বারডেম এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান ডা. ফারিয়া আফসানা বলেন, হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ক্লান্তি, ওজন বেড়ে যাওয়া, শুষ্ক ত্বক, চুল পড়া, নারীর অনিয়মিত মাসিক ও বিষণ্নতা এর সাধারণ লক্ষণ।

বলেন, থাইরয়েড রোগ শনাক্তে টিএসএইচ ও এফটি-৪ পরীক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীকে আজীবন ওষুধ সেবন করতে হয়।

আয়োডিন ঘাটতিজনিত সমস্যা:
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সভাপতি (নির্বাচিত) ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, শরীরে থাইরয়েড হরমোন তৈরির কাঁচামাল হলো আয়োডিন। বাংলাদেশে আয়োডিন ঘাটতি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ইউনিভার্সাল সল্ট আয়োডাইজেশন কর্মসূচি চালু থাকলেও গ্রামাঞ্চল ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনও খোলা বা শিল্প লবণ ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। ফলে শিশুদের শেখার ক্ষমতা ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে এবং নারীর গর্ভকালীন জটিলতা বাড়ছে।

থাইরয়েডের আধিক্যজনিত সমস্যা ও করণীয়:
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম সাইফুদ্দিন বলেন, হাইপার থাইরয়েডিজম রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অকারণে ওজন বাড়া বা কমা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা, চুল পড়া, ত্বক শুষ্ক হওয়া, ঘুম কম হওয়া, মাসিক অনিয়ম, বন্ধ্যত্ব, মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা বিষণ্নতার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

গর্ভধারণের পরিকল্পনার আগেই থাইরয়েডের পরীক্ষা:
গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন বলেন, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের সঙ্গে থাইরয়েড হরমোনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। থাইরয়েড সমস্যার কারণে মাসিকে অনিয়ম, বন্ধ্যত্ব এবং গর্ভপাত বা অকাল প্রসবের ঝুঁকি বাড়ে। তাই গর্ভধারণের পরিকল্পনার আগেই থাইরয়েড পরীক্ষা করানো জরুরি।

শিশুর থাইরয়েড সমস্যা:
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এস এম মহিউদ্দিন বলেন, জন্মের পরপরই থাইরয়েড সমস্যা শনাক্ত না হলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ স্থায়ীভাবে ব্যাহত হতে পারে। তাই নবজাতক পর্যায়ে থাইরয়েড স্ক্রিনিং জরুরি। সাধারণ লক্ষণ, মেধা বাধাগ্রস্ত হয়। ছয় মাসে শিশুর বসার কথা; কিন্তু বসতে পারে না। এক বছরে হাঁটার কথা থাকলেও হাঁটতে পারে না। অতিরিক্ত ওজন। পেট ফুলে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।

থাইরয়েড ও ক্যান্সারের ঝুঁকি:
মার্কস মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাজমা আক্তার বলেন, আট থেকে ১০ শতাংশ মানুষের থাইরয়েড গ্রন্থিতে চাকা দেখা যায়, যার মধ্যে ২ থেকে ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে। গলায় অস্বাভাবিক ফোলা বা চাকা দেখা গেলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে থাইরয়েডের সম্পর্ক:
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. মারুফা মোস্তারী বলেন, অনেকেই মনে করেন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে থাইরয়েডের সম্পর্ক আছে। আসলে এটা নিয়ে সমাজের একটি মিথ রয়েছে। তবে পরোক্ষভাবে খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক থাকতে পারে। সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রজনন স্বাস্থ্যে থাইরয়েডের প্রভাব:
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফেটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সানজিদা মাহমুদ বলেন, প্রজনন স্বাস্থ্যে থাইরয়েডের বড় প্রভাব রয়েছে। এই কারণে গর্ভধারণের আগে আমাদের থাইরয়েড পরীক্ষা করা জরুরি। তিনি বলেন, সন্তান পেটে তিন মাস মায়ের থাইরয়েডের ওপর নির্ভরশীল থাকে। তাই মায়ের থাইরয়েড সুস্থ থাকলে দুটি প্রজন্ম সুস্থ থাকে।

যা জানা জরুরি:
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. সৈয়দ আজমল মাহমুদ বলেন, হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত রোগীর থাইরয়েড হরমোনের ওষুধ নিয়মিত সেবন করতে হয়। চিকিৎসকরা সাধারণত শুরুতেই রোগীকে জানিয়ে দেন, বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে রোগটির কারণ অটোইমিউন থাইরয়েড ডিজিজ (যেমন হাশিমোটো থাইরয়েডাইটিস), সে ক্ষেত্রে ওষুধটি আজীবন খেতে হতে পারে। অর্থাৎ এটি সাময়িক চিকিৎসা নয়– দীর্ঘমেয়াদি বিষয়টি রোগীকে মানসিকভাবে মেনে নিতে হয়।

ওষুধের সহজলভ্যতা:
রেনাটা পিএলসির হেড অব মার্কেটিং মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, থাইরয়েড হরমোনজনিত রোগের চিকিৎসা দেশে সম্পূর্ণভাবে সহজলভ্য। এ রোগের চিকিৎসা নিতে বিদেশে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

থাইরয়েডের সমস্যা শুরুতে শনাক্ত হলে সুস্থ জীবন সম্ভব

আপডেট সময় ১০:৩৫:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক : 

থাইরয়েডের রোগ শুরুতেই শনাক্ত করতে হবে। তাহলে এর চিকিৎসা সহজ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ত্বরান্বিত হবে। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করার জন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি। কারণ, দেশের প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ থাইরয়েডে ভুগছে। এর অর্ধেক এখনও শনাক্তের বাইরে।

থাইরয়েড সচেতনতা মাস উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকালের সভাকক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এ পরামর্শ দেন। বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইনোলজি সোসাইটি ও সমকালের যৌথ উদ্যোগে এ আলোচনার আয়োজন করা হয়। এতে বৈজ্ঞানিক সহযোগী ছিল রেনাটা পিএলসি। আলোচনার বিষয় ছিল– আপনার থাইরয়েডকে জানুন, রোগের শুরুতে শনাক্ত করুন, সুস্থ থাকুন। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।

থাইরয়েড হলো প্রজাপতি আকৃতির একটি গ্রন্থি, যা গলার সামনের অংশে থাকে। এটি শরীরের হরমোন উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৈঠকে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, নবজাতকের জন্মের সাত দিনের মধ্যে থাইরয়েড স্ক্রিনিং, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার আগেই নারীদের থাইরয়েড পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য ও স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

থাইরয়েড রোগের বিস্তার:
আলোচনায় বারডেমের পরিচালক (একাডেমি) ও বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইনোলজি সোসাইটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ফারুক পাঠান বলেন, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ কোটি মানুষ থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে এই রোগে আক্রান্ত। নারীর মধ্যে এ রোগের হার পুরুষের চেয়ে পাঁচ থেকে আট গুণ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো– প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ জানেনই না, তারা এ রোগে আক্রান্ত।
ডা. ফারুক পাঠান বলেন, থাইরয়েড হরমোন মানবদেহের শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ ও মানসিক সক্ষমতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

কারা ঝুঁকিতে:
ইউনাইটেড হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের মেটাবলিজম, শক্তি উৎপাদন, ওজন, হৃৎস্পন্দন ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নারী, ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি, অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত রোগী, গলায় রেডিয়েশন বা অস্ত্রোপচার হওয়া ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসব-পরবর্তী নারীরা থাইরয়েড রোগে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা:
বারডেম এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান ডা. ফারিয়া আফসানা বলেন, হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ক্লান্তি, ওজন বেড়ে যাওয়া, শুষ্ক ত্বক, চুল পড়া, নারীর অনিয়মিত মাসিক ও বিষণ্নতা এর সাধারণ লক্ষণ।

বলেন, থাইরয়েড রোগ শনাক্তে টিএসএইচ ও এফটি-৪ পরীক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীকে আজীবন ওষুধ সেবন করতে হয়।

আয়োডিন ঘাটতিজনিত সমস্যা:
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সভাপতি (নির্বাচিত) ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, শরীরে থাইরয়েড হরমোন তৈরির কাঁচামাল হলো আয়োডিন। বাংলাদেশে আয়োডিন ঘাটতি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ইউনিভার্সাল সল্ট আয়োডাইজেশন কর্মসূচি চালু থাকলেও গ্রামাঞ্চল ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনও খোলা বা শিল্প লবণ ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। ফলে শিশুদের শেখার ক্ষমতা ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে এবং নারীর গর্ভকালীন জটিলতা বাড়ছে।

থাইরয়েডের আধিক্যজনিত সমস্যা ও করণীয়:
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম সাইফুদ্দিন বলেন, হাইপার থাইরয়েডিজম রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অকারণে ওজন বাড়া বা কমা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা, চুল পড়া, ত্বক শুষ্ক হওয়া, ঘুম কম হওয়া, মাসিক অনিয়ম, বন্ধ্যত্ব, মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা বিষণ্নতার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

গর্ভধারণের পরিকল্পনার আগেই থাইরয়েডের পরীক্ষা:
গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন বলেন, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের সঙ্গে থাইরয়েড হরমোনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। থাইরয়েড সমস্যার কারণে মাসিকে অনিয়ম, বন্ধ্যত্ব এবং গর্ভপাত বা অকাল প্রসবের ঝুঁকি বাড়ে। তাই গর্ভধারণের পরিকল্পনার আগেই থাইরয়েড পরীক্ষা করানো জরুরি।

শিশুর থাইরয়েড সমস্যা:
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এস এম মহিউদ্দিন বলেন, জন্মের পরপরই থাইরয়েড সমস্যা শনাক্ত না হলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ স্থায়ীভাবে ব্যাহত হতে পারে। তাই নবজাতক পর্যায়ে থাইরয়েড স্ক্রিনিং জরুরি। সাধারণ লক্ষণ, মেধা বাধাগ্রস্ত হয়। ছয় মাসে শিশুর বসার কথা; কিন্তু বসতে পারে না। এক বছরে হাঁটার কথা থাকলেও হাঁটতে পারে না। অতিরিক্ত ওজন। পেট ফুলে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।

থাইরয়েড ও ক্যান্সারের ঝুঁকি:
মার্কস মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাজমা আক্তার বলেন, আট থেকে ১০ শতাংশ মানুষের থাইরয়েড গ্রন্থিতে চাকা দেখা যায়, যার মধ্যে ২ থেকে ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে। গলায় অস্বাভাবিক ফোলা বা চাকা দেখা গেলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে থাইরয়েডের সম্পর্ক:
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. মারুফা মোস্তারী বলেন, অনেকেই মনে করেন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে থাইরয়েডের সম্পর্ক আছে। আসলে এটা নিয়ে সমাজের একটি মিথ রয়েছে। তবে পরোক্ষভাবে খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক থাকতে পারে। সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রজনন স্বাস্থ্যে থাইরয়েডের প্রভাব:
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফেটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সানজিদা মাহমুদ বলেন, প্রজনন স্বাস্থ্যে থাইরয়েডের বড় প্রভাব রয়েছে। এই কারণে গর্ভধারণের আগে আমাদের থাইরয়েড পরীক্ষা করা জরুরি। তিনি বলেন, সন্তান পেটে তিন মাস মায়ের থাইরয়েডের ওপর নির্ভরশীল থাকে। তাই মায়ের থাইরয়েড সুস্থ থাকলে দুটি প্রজন্ম সুস্থ থাকে।

যা জানা জরুরি:
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. সৈয়দ আজমল মাহমুদ বলেন, হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত রোগীর থাইরয়েড হরমোনের ওষুধ নিয়মিত সেবন করতে হয়। চিকিৎসকরা সাধারণত শুরুতেই রোগীকে জানিয়ে দেন, বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে রোগটির কারণ অটোইমিউন থাইরয়েড ডিজিজ (যেমন হাশিমোটো থাইরয়েডাইটিস), সে ক্ষেত্রে ওষুধটি আজীবন খেতে হতে পারে। অর্থাৎ এটি সাময়িক চিকিৎসা নয়– দীর্ঘমেয়াদি বিষয়টি রোগীকে মানসিকভাবে মেনে নিতে হয়।

ওষুধের সহজলভ্যতা:
রেনাটা পিএলসির হেড অব মার্কেটিং মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, থাইরয়েড হরমোনজনিত রোগের চিকিৎসা দেশে সম্পূর্ণভাবে সহজলভ্য। এ রোগের চিকিৎসা নিতে বিদেশে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।