ঢাকা ০৬:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

করোনা পরীক্ষা: আগুন নিয়ে আত্মঘাতী খেলা চলছে

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। একাদশ সপ্তাহে এসে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সত্যিই মহামারীর পর্যায়ে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়েও কেউ কোনো বিশ্লেষণ করতে পারছেন না। কারণ বাংলাদেশে সামাজিক সংক্রমণ এখন ব্যাপক বিস্তৃত হচ্ছে এবং প্রতিদিনই সামাজিক সংক্রমণ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যে পথগুলো ছিল, সেগুলোও আমরা আস্তে আস্তে বন্ধ করে দিচ্ছি। সবচেয়ে বড় কথা করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা নিয়ে যা হচ্ছে তাকে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন আগুন নিয়ে আত্মঘাতী খেলা। এর পরিণাম খুব খারাপ হতে পারে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা নিয়ে বিভিন্ন রকমের সংকট তৈরি হচ্ছে।

প্রথমত; আত্মতুষ্টির আশায় কম পরীক্ষা

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই তিনদিন আগে বললেন যে, তারা দিনে ১০ হাজার পরীক্ষা করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন এবং এ পরীক্ষা করার জন্য তারা ল্যাব প্রস্তুত করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ১০ হাজার পরীক্ষা করা হয়নি। বরং গতকাল সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৭৮৮ জনের পরীক্ষা করা হলেও আজ আবার তা কমিয়ে ৮ হাজার ৪৪৯ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, যখনই করোনা শনাক্তের সংখ্যা বাড়ে, তখনই পরীক্ষার হার কমিয়ে দেওয়া হয়। অবশ্যই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কিন্তু তথ্য বলছে, গতকাল ১ হাজার ৬০২ জনের করোনা শনাক্ত হওয়ার পর আজ ১ হাজার ২৫১ জন শনাক্ত হয়েছে। কম পরীক্ষার কারণেই এমনটা হয়েছে, অন্য কোনও কারণে নয়। এটি একটি ভয়ঙ্কর প্রবণতা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন যে, এর ফলে প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে না। আর প্রকৃত অবস্থা বোঝা না গেলে করোনা পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

দ্বিতীয়ত; পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা

বাংলাদেশে যারা উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় করোনা পরীক্ষা করাতে যাচ্ছেন, তারা এক ধরনের হয়রানির স্বীকার হচ্ছেন। দীর্ঘ লাইনে তাদের দাঁড়াতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, যারা নমুনা দিচ্ছেন তাদের রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে, অপেক্ষমান নমুনার সংখ্যা অনেক। যে নমুনাগুলো দিয়ে এখন পর্যন্ত পরীক্ষা হয়নি এবং রিপোর্ট পাওয়া যায় নি। এটিও একটি আগুন নিয়ে খেলার মতোই ব্যাপার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ যতক্ষণ একজন মানুষ কোন রিপোর্ট পাচ্ছেন না ততক্ষন পর্যন্ত তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারছেন না যে হাসপাতালে যাবেন নাকি বাসায় থেকে চিকিৎসা করবেন। মেলামেশার ক্ষেত্রেও তার যে বিধি নিষেধগুলো সে ব্যপারে তার একটা আড়ষ্টতা তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয়ত; পরীক্ষায় শিথিলতা

সরকার বারবার বলছে যে তারা ৪২টি ল্যাবে পরীক্ষা করছে এবং দশ হাজার পরীক্ষা তারা করতে পারে। কিন্তু দেখা গেছে যে, আইপিসিআর ল্যাবগুলো বসানো হয়েছে। কিন্তু সেই ল্যাবগুলো মানসম্মত নয় এবং পুরনো মডেলের। বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণ শুরু হবার পর তড়িঘড়ি করে থারমোপিসিআর -৭৫০০ মডেলের যে আরটিপিসিআর ক্রয় করা হয়েছে তা সবই ২০০৯ সালের। একটি পিসিআর এ মাত্র ৯০-টির বেশি পরীক্ষা করা যায় না। অথচ এখন নতুন ব্র্যান্ডগুলো যদি কেনা যেত তাহলে ২৭০টি করে পরীক্ষা করা যেত। পিসিআরগুলো অনেক জায়গায়ই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। যেমন- মুগদা হাসপাতালের পিসিআর মেশিন এখন কাজ করছে না। একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে রাজশাহীসহ আরও কয়েকটি জায়গায়। কাজেই যখন এই মেশিনগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং সঠিকভাবে কাজ করছে না বা রিপোর্ট দিতে বিলম্ব হবে সেটিও একটি ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

চতুর্থত; পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন

পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির আরেকটি জটিল এবং আত্মঘাতী দিক। এর ফলে করোনা সংক্রমণের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে চিকিৎসক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। কারণ উপসর্গযুক্ত সব মানুষ যে করোনা আক্রান্ত এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। কাজেই অনেকেই যাচ্ছেন যিনি করোনায় আক্রান্ত নন, আরেকজন যাচ্ছেন যিনি করোনায় সংক্রমিত। তারা দুইজন একসাথে গাদাগাদি করে এক জায়গায় থাকছেন। স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে তাদের যেভাবে রাখা হচ্ছে এবং যেভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে তার ফলে করোনা সংক্রমণের আরেক ঝুঁকি বাড়ছে।

কাজেই করোনা পরীক্ষা নিয়ে আমরা যেমন স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। আমরা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইনগুলো মানছি না। আমরা দ্রুত পরীক্ষা করে প্রকৃত পরিস্থিতির বোঝার জন্য চেষ্টাও করছি না। বরং আমরা কম পরীক্ষা দেখিয়ে কম রোগী নিয়ে আত্মতুষ্টির একটি আত্মঘাতী খেলায় আমরা মেতেছি। এর পরিণাম কারও জন্যই ভালো কিছু নিয়ে আসবে না। কারণ করোনার সংক্রমণের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে কম পরীক্ষা দিয়ে আত্মতুষ্টি লাভের কোনও সুযোগ হবে না।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

করোনা পরীক্ষা: আগুন নিয়ে আত্মঘাতী খেলা চলছে

আপডেট সময় ০৫:৫৯:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২০

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। একাদশ সপ্তাহে এসে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সত্যিই মহামারীর পর্যায়ে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়েও কেউ কোনো বিশ্লেষণ করতে পারছেন না। কারণ বাংলাদেশে সামাজিক সংক্রমণ এখন ব্যাপক বিস্তৃত হচ্ছে এবং প্রতিদিনই সামাজিক সংক্রমণ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যে পথগুলো ছিল, সেগুলোও আমরা আস্তে আস্তে বন্ধ করে দিচ্ছি। সবচেয়ে বড় কথা করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা নিয়ে যা হচ্ছে তাকে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন আগুন নিয়ে আত্মঘাতী খেলা। এর পরিণাম খুব খারাপ হতে পারে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা নিয়ে বিভিন্ন রকমের সংকট তৈরি হচ্ছে।

প্রথমত; আত্মতুষ্টির আশায় কম পরীক্ষা

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই তিনদিন আগে বললেন যে, তারা দিনে ১০ হাজার পরীক্ষা করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন এবং এ পরীক্ষা করার জন্য তারা ল্যাব প্রস্তুত করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ১০ হাজার পরীক্ষা করা হয়নি। বরং গতকাল সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৭৮৮ জনের পরীক্ষা করা হলেও আজ আবার তা কমিয়ে ৮ হাজার ৪৪৯ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, যখনই করোনা শনাক্তের সংখ্যা বাড়ে, তখনই পরীক্ষার হার কমিয়ে দেওয়া হয়। অবশ্যই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কিন্তু তথ্য বলছে, গতকাল ১ হাজার ৬০২ জনের করোনা শনাক্ত হওয়ার পর আজ ১ হাজার ২৫১ জন শনাক্ত হয়েছে। কম পরীক্ষার কারণেই এমনটা হয়েছে, অন্য কোনও কারণে নয়। এটি একটি ভয়ঙ্কর প্রবণতা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন যে, এর ফলে প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে না। আর প্রকৃত অবস্থা বোঝা না গেলে করোনা পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

দ্বিতীয়ত; পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা

বাংলাদেশে যারা উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় করোনা পরীক্ষা করাতে যাচ্ছেন, তারা এক ধরনের হয়রানির স্বীকার হচ্ছেন। দীর্ঘ লাইনে তাদের দাঁড়াতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, যারা নমুনা দিচ্ছেন তাদের রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে, অপেক্ষমান নমুনার সংখ্যা অনেক। যে নমুনাগুলো দিয়ে এখন পর্যন্ত পরীক্ষা হয়নি এবং রিপোর্ট পাওয়া যায় নি। এটিও একটি আগুন নিয়ে খেলার মতোই ব্যাপার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ যতক্ষণ একজন মানুষ কোন রিপোর্ট পাচ্ছেন না ততক্ষন পর্যন্ত তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারছেন না যে হাসপাতালে যাবেন নাকি বাসায় থেকে চিকিৎসা করবেন। মেলামেশার ক্ষেত্রেও তার যে বিধি নিষেধগুলো সে ব্যপারে তার একটা আড়ষ্টতা তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয়ত; পরীক্ষায় শিথিলতা

সরকার বারবার বলছে যে তারা ৪২টি ল্যাবে পরীক্ষা করছে এবং দশ হাজার পরীক্ষা তারা করতে পারে। কিন্তু দেখা গেছে যে, আইপিসিআর ল্যাবগুলো বসানো হয়েছে। কিন্তু সেই ল্যাবগুলো মানসম্মত নয় এবং পুরনো মডেলের। বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণ শুরু হবার পর তড়িঘড়ি করে থারমোপিসিআর -৭৫০০ মডেলের যে আরটিপিসিআর ক্রয় করা হয়েছে তা সবই ২০০৯ সালের। একটি পিসিআর এ মাত্র ৯০-টির বেশি পরীক্ষা করা যায় না। অথচ এখন নতুন ব্র্যান্ডগুলো যদি কেনা যেত তাহলে ২৭০টি করে পরীক্ষা করা যেত। পিসিআরগুলো অনেক জায়গায়ই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। যেমন- মুগদা হাসপাতালের পিসিআর মেশিন এখন কাজ করছে না। একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে রাজশাহীসহ আরও কয়েকটি জায়গায়। কাজেই যখন এই মেশিনগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং সঠিকভাবে কাজ করছে না বা রিপোর্ট দিতে বিলম্ব হবে সেটিও একটি ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

চতুর্থত; পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন

পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির আরেকটি জটিল এবং আত্মঘাতী দিক। এর ফলে করোনা সংক্রমণের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে চিকিৎসক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। কারণ উপসর্গযুক্ত সব মানুষ যে করোনা আক্রান্ত এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। কাজেই অনেকেই যাচ্ছেন যিনি করোনায় আক্রান্ত নন, আরেকজন যাচ্ছেন যিনি করোনায় সংক্রমিত। তারা দুইজন একসাথে গাদাগাদি করে এক জায়গায় থাকছেন। স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে তাদের যেভাবে রাখা হচ্ছে এবং যেভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে তার ফলে করোনা সংক্রমণের আরেক ঝুঁকি বাড়ছে।

কাজেই করোনা পরীক্ষা নিয়ে আমরা যেমন স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। আমরা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইনগুলো মানছি না। আমরা দ্রুত পরীক্ষা করে প্রকৃত পরিস্থিতির বোঝার জন্য চেষ্টাও করছি না। বরং আমরা কম পরীক্ষা দেখিয়ে কম রোগী নিয়ে আত্মতুষ্টির একটি আত্মঘাতী খেলায় আমরা মেতেছি। এর পরিণাম কারও জন্যই ভালো কিছু নিয়ে আসবে না। কারণ করোনার সংক্রমণের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে কম পরীক্ষা দিয়ে আত্মতুষ্টি লাভের কোনও সুযোগ হবে না।