আকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:
বিশ্বজুড়ে চলমান করোনা মহামারীর মধ্যেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ঘুরেফিরে আসছেন উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন। তবে তার কোনো হুমকিধামকি নয় বরং তিনি এখন কোথায় রয়েছেন বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন সেসব জল্পনাই চলছে এখনকার খবরে। করোনার সংকটের মধ্যেও তাকে নিয়ে অজস্র প্রতিবেদন-বিশ্লেষণে ভরে উঠছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পাতা। এবার কিম উনের পাশাপাশি বোন কিম ইয়ো জংও খবরের শিরোনামে।
ভাই কিম উন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা হোক কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো- এতদিন যা করেছেন সবই ছিল তটস্থ হওয়ার মতো খবর। কিমের শারীরিক অবস্থার খবর জায়গা করে নেয়ায় এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বের চোখ তার বোন কিম ইয়োর দিকে। ভাইয়ের উত্তরসূরি হিসাবে এরইমধ্যে ইয়োর উঠে আসার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তর জল্পনা শুরু হয়েছে কূটনৈতিক মহলে।
করোনা সংকট শুরু হওয়ার পর চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না কিম জং উনকে। পিতামহ কিম ইল সাংয়ের জন্মবার্ষিকীর উৎসবেও দেখা মেলেনি তার। তার অনুপস্থিতির কারণ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। পরে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সংবাদমাধ্যমে খবর আসে হৃদযন্ত্রে অস্ত্রোপচারের পর সঙ্কটজনক অবস্থায় রয়েছেন কিম। আবার হংকংয়ের একটি টিভি তার মৃত্যুর খবর প্রচার করে। যদিও ২৫ এপ্রিল দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বার্তা সংস্থা কিম সুস্থ এবং ভালো রয়েছেন বলে খবর দেয়।
তবে এতসব খবর খারিজ করা বা স্বীকার- কোনোটাই করেনি উত্তর কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ। ফলে জল্পনার ডালপালা কেবল ছড়িয়েই পড়ছে। আর তার মধ্যেই কিমের উত্তরসূরি হিসাবে তার বোন কিম ইয়ো জংকে বাজি রাখতে শুরু করেছেন অনেকে।
উত্তর কোরিয়ার ‘ফার্স্ট ফ্যামিলি’র সদস্য ৩২ বছর বয়সী কিম ইয়ো সম্প্রতি সক্রিয় রাজনীতিতে পা রেখেছেন। গত দুই বছরে মাত্র কয়েকবারই তাকে ক্যামেরার সামনে দেখা গেছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে ভাইয়ের ‘চিফ অব স্টাফ’ হিসাবে যোগ দেওয়া। ২০১৮ সালে সিউলে আয়োজিত শীতকালীন অলিম্পিক্সে পিয়ংইয়ংয়ের প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দিতে যান তিনি।
আর চলতি এপ্রিলে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি পলিটব্যুরোতে অতিরিক্ত সদস্য হিসাবে যোগদান করেন কিম ইয়ো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ইয়োর।
তবে দেরিতে সক্রিয় রাজনীতিতে পা রাখলেও, দলের অন্দরে কিম ইয়োর যথেষ্ট কর্তৃত্ব রয়েছে বলে দাবি কূটনীতিকদের। ভাইয়ের বার্তা দলের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হোক বা দলের কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত- উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে কিম ইয়োর।
মার্কিন কূটনীতিবিদ মাইকেল ম্যাডেনের দাবি, ছেলের চেয়েও মেয়ের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন উত্তর কোরিয়ার প্রয়াত শাসক কিম জং ইল। তাই কৈশোরেই রাজনীতি শিক্ষার জন্য সে দেশের ‘চাণক্য’ বলে পরিচিত কিম কি নমের কাছে মেয়েকে সঁপে দেন তিনি।
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোরীয় উপদ্বীপ যখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন থেকেই বংশ পরম্পরায় উত্তর কোরিয়া শাসনভার কিম পরিবারে হাতে। কিম ইল সাংয়ের পর ক্ষমতায় আসেন ছেলে কিম জং ইল।
২০১১ সালে তার মৃত্যুর পর দেশের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেন কিম জং উন। অর্থাৎ তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবারের পুরুষ সদস্যরাই উত্তর কোরিয়া শাসন করে এসেছেন।
দেশের সংবিধানে মহিলাদের সমানাধিকারের কথা বলা হলেও, সে দেশের সমাজব্যবস্থা এখনও পুরুষ নিয়ন্ত্রিত। সেক্ষেত্রে একজন মহিলা সদস্যের নেতৃত্ব মেনে নেবে কি না, সেই নিয়ে সংশয়ও রয়েছে কূটনীতিবিদদের মধ্যে।
কিম জং উনের দাদা কিম জং চোল বরাবরই রাজনীতি থেকে দূরে। সঙ্গীতচর্চায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন তিনি। ভবিষ্যতেও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে তিনি ইচ্ছুক নন বলে দাবি ইংল্যান্ডে উত্তর কোরিয়ার প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত তে ইয়াং হোর।
আরেক বোন কিম সোল সং সরকারের নীতি প্রচারে গুরুত্বপূর্ম ভূমিকা পালন করলেও শাসনভার সামলানোর জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ নেই তার। কিম জংয়ের ফুফু কিম কিয়ং হুই একসময় দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শাসনব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ২০১৩ সালে স্বামী জেং সং তেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর থেকেই নিভৃতবাসে হুই। এবছরের গোড়ার দিকে একবার মাত্র জনসমক্ষে আসেন তিনি।
২০০৯ সালে রি সোল জুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কিম জং উন। দক্ষিণ কোরিয়ার গুপ্তচর সংস্থা ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্স সার্ভিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিম জং উনের তিন সন্তান রয়েছে। বড় ছেলের বয়স ১০ বছর। ২০১৭ সালে কিমের সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের জন্ম হয়। এই মুহূর্তে তাদের কেউই ক্ষমতায় বসার উপযুক্ত নয়। সেক্ষেত্রে যতদিন পর্যন্ত তারা প্রাপ্তবয়স্ক না হচ্ছে, ততদিন তাদের রাজনৈতিক অভিভাবক হিসাবে কাউকে নিয়োগ করা যেতে পারে। তাদের হয়ে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গঠিত ‘কেয়ারটেকার সরকার’ শাসনকার্য চালাতে পারে।
কিম জংয়ের পর এই মুহূর্তে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত কারও যদি কিম ইল সাংয়ের সঙ্গে সরাসরি রক্তের সম্পর্ক থেকে থাকে তিনি হলেন কিম ইয়ো জং। পরিবারতন্ত্রে বিশ্বাসী উত্তর কোরিয়ার সিংহভাগ মানুষ এমন কারও নেতৃত্বই চান। তাই ভাই কিম উনের কিছু হয়ে গেলে কিম ইয়োর হাতেই দেশের শাসনভার যেতে পারে। আর তেমনকিছু হলে প্রথমবারের মতো এক জন নারীর হাল ধরেব উত্তর কোরিয়ার মতো রহস্যময় দেশের।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















