অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
বঙ্গবন্ধুকে জানা এবং তার সম্পর্কে জানানো বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব বলে জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও শেখ রেহানা পুত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি। শনিবার বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে অনুষ্ঠিত `বঙ্গবন্ধু মার্ডার কেস: জার্নি, অ্যাকমপ্লিসমেন্ট অ্যান্ড রিমেইনিং চ্যালেঞ্জ` শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ কথা বলেন।
সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) ট্রাস্টি রাদওয়ান মুজিব বলেন, সিআরআই টিমকে ধন্যবাদ। তাদের সঙ্গে এই অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনার সময় আবারো সামনে চলে আসে ইনডেমনিটি বিল প্রসঙ্গ। সময় হঠাৎ মনে আসে, এই বিল সম্পর্কে আসলে আমি কিভাবে জেনেছিলাম। আমার মা এবং খালা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিদেশে ছিলেন। এ কারণে আমার লন্ডনে জন্ম ১৯৮০ সালে। এরপর ১৯৮২-৮৩ সালে কিছুদিনের জন্য ঢাকায় আসলাম। তখন বেশ ছোট ছিলাম। বাবার পিএচডি শেষ হওয়ার পর ১৯৮৬ আমরা বাংলাদেশে ফেরত আসলাম। আমি এখানে এসে একটি স্কুলে ভর্তি হলাম। বনানীতে কেজি ওয়ান, কেজি টু। খুব ভালো লাগতো স্কুল। অনেক বন্ধুরা ছিলো। আমার বেস্ট ফ্রেন্ডরা ছিলো এই স্কুলে। হঠাৎ করে মা একদিন বললেন, আমার স্কুল বদলাতে হবে। আমি তখন খুব মন খারাপ করলাম। মার সঙ্গে রাগ করলাম। কেনো স্কুল বদলাতে হবে। আমার বেস্ট ফ্রেন্ডরা এখানে পড়তেছে। তখন মা বলল, এখানে খুনিদের বাচ্চারা পড়ালেখা করছে।
আমি তখন ছোট ছিলাম, অতকিছু বুঝতাম না। আসলে সে সময় এই হত্যাকারীদের কিছু শিশুও আমার স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। স্কুল থেকে বেশ কয়েকবার আমাদের অনুসরণ করে বাসা পর্যন্ত মানুষজন আসল। এ ছাড়াও প্রতিদিন স্কুল গেটে তাদের মুখোমুখি হওয়া। আর পূর্বের বক্তারাই বলেছেন, সে সময় ফ্রিডম পার্টির মানুষজন কিভাবে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করতো। সে কারণেই মা আর আমাকে ঐ স্কুলে পড়াতে রাজি হয়নি।
তখন মার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এরা কোন খুনি? আর যদি খুনি হয়, সবাই জানে, তাহলে তারা এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিভাবে? শিশু হিসেবে আসলে তখন ভাল-মন্দের বাহিরে কিছু ভাবতে পারছিলাম না। মা তখন আমাকে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের কথা বলেন। ঐ ছোট বয়সেই আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এটা আবার আইন হতে পারে নাকি? একজনকে খুন করে তার বিচার না করার জন্য আইন আবার কিভাবে হয়?
আমার খালা বা মার ছোটবেলা থেকেই ১৫ আগস্ট সম্পর্কে আমাদের বলে দিতেন। কোন কিছু লুকিয়ে রাখতেন না। ফলে ছোট বেলা থেকেই বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা জানতাম। তারা আমাদের বলতেন, এটা তোমাদের পরিবারের ইতিহাস। জানতে হবে। আর সে কারণেই এ সময় থেকে আমার মাথায় এই অর্ডিন্যান্সের কথা ছিল।
এরপর এমন অবস্থা সৃষ্টি হল, যে আমার মা-খালারা দেখলেন এখানে থাকাই তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেল। যারা আমার মা ও খালাকে চেনেন, তারা জানেন। এই দুজন নিজেদের নিয়ে কখনও ভয় পেতেন না। কিন্তু আমরা তখন ছোট ছিলাম। আমাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা আবারো দেশের বাহিরে চলে গেলেন। এরপর ১৯৯৩ সালে আমরা বাংলাদেশে ফেরত আসলাম। তখন আমাদের বয়স ১২-১৩। বন্ধুদের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলাপ হত। বন্ধুরা তখন অনেকে জেনারেল জিয়ার কথা বলতেন। উনি এই, উনি সেই। যেই ব্যক্তি ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স পাশ করে, সে কিভাবে ভাল হতে পারে। এটা আবার কোন ধরণের ন্যাশনাল হিরো?
এ সময় অনেকেই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স সম্পর্কে জানত না। `৭৫ সাল নিয়ে সঠিক তথ্য জানত না। অনেক বিষয়েই তারা জানত না। এ সময় আমি আর আমার কিছু বন্ধু এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতাম। অন্যদের বোঝাতাম। এটা আমাদের জন্য সংগ্রাম ছিল।
আমার এখন ভাল লাগছে, কারণ আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার সবাইকে জানাতে হত, এটা জান নাকি, ওটা জান নাকি। কিন্তু বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম আমাকে গবেষণা করে আমার নানা সম্পর্কে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য দিচ্ছে। আমি তাদের কাছ থেকে নতুন নতুন বিষয় জানতে পারছি। এটা ভাল লাগছে।
আজকে মঞ্চে যারা উপস্থিত ছিল তারা অনেকেই হয়ত বঙ্গবন্ধুর দেখা পেয়েছেন। কিন্তু আমি তার দেখা পাইনি। আর আমরা যারা দেখা পাইনি, তাদের দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানা। তার সম্পর্কে জানা এবং অন্যদের জানানো আমাদের দায়িত্ব।
অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্নের উত্তরে অনুষ্ঠানের প্রধানবক্তা আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, হত্যা মামলা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। আর জিয়াউর রহমানের মৃত্যু হয়েছে ১৯৮১ সালে। মৃত মানুষের ওপর মরণোত্তর কোন মামলা করার নিয়ম নেই বলে তাকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় যোগ করা হয়নি। সে যদি তখন বেঁচে থাকতো তবে তার বিরুদ্ধেও মামলা হতো।
তিনি বলেন, মরণোত্তর মামলা করার আইন বাংলাদেশে নেই। নবাব সিরাজুদ্দৌলার সঙ্গে থেকে বিশ্বাসঘাতকতা করা মীরজাফরের নাম যেমন ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, তেমনি খন্দকার মোশতাক নামটিও যদি এভাবে বিশ্বাসঘাতকের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার শুরু হয় তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এ ব্যাপারে আরও পরিষ্কার হবে এবং ইতিহাসে তার বিশ্বাসঘাতকতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানবক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল হক। আরো উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, এমপি ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আআমস আরেফিন সিদ্দিক, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের কিউরেটর নজরুল ইসলাম খান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন এবং দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















