অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
সরকারি বাজেটে সাত বছরে হিজড়া জনগোষ্ঠী খাতে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ১৬ গুণ। টাকার অঙ্কে প্রায় ১১ কোটি টাকা। কিন্তু সেভাবে উন্নয়ন হয়নি তাদের জীবনমান।
নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত আছে এখনও এ গোষ্ঠী। সংশ্লিষ্টদের মতে, বরাদ্দের আওতা বেড়েছে, কিন্তু পরিমাণ বাড়েনি। পাশাপাশি একই সময়ে ৩৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে।
ফলে প্রাপ্য ভাতার অনেকটায় খেয়ে ফেলছে মূল্যস্ফীতি। যে কারণে তাদের জীবনমান উন্নয়নে বাজেটের অর্থও খুব বেশি কাজে আসছে না। যুগান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে এসব তথ্য।
জানতে চাইলে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান সরকারই প্রথম হিজড়াদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করে। তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য এ বছর ১১ কোটি ৪০ লাখ বরাদ্দ করেছে।
তবে ভাতার পরিমাণ কম হলেও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। কারণ ভাতার টাকা যত বেশিই দেয়া হোক না কেন, সেই টাকা থাকে না; খরচ হয়ে যায়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেটে হিজড়াগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল ৭২ লাখ ১৭ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে বেড়ে চলতি অর্থবছরে ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
একই সময়ে তাদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ বেড়েছে- ‘বিশেষ ভাতা’ ১০০, ‘প্রাথমিক স্তরের’ উপবৃত্তি ৪০০, ‘মাধ্যমিকে’ ৩৫০, ‘উচ্চমাধ্যমিকে’ ৪০০ এবং ‘উচ্চতর পর্যায়ে’ ২০০ টাকা। তবে ভাতার পরিমাণ আশানুরূপ বাড়েনি। যেটুকু বেড়েছে এর একটি বড় অংশ খেয়ে ফেলছে মূল্যস্ফীতি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১২-১৩ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর এ ছয় বছরে দেশে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৩৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। এতে ‘বিশেষ ভাতা’ ১০০ টাকা বাড়লেও মূল্যস্ফীতি গিলে খেয়েছে ৩৭ দশমিক ৪১ টাকা।
এক্ষেত্রে সুবিধাভোগীর প্রকৃত ভাতা বেড়েছে মাত্র ৬২ দশমিক ৫৯ টাকা। একইভাবে ‘প্রাথমিক স্তরে’ ৪০০ টাকা বাড়লেও মূল্যস্ফীতি খেয়েছে ১৫০ টাকা। প্রকৃত ভাতা বেড়েছে ২৫০ টাকা। ‘মাধ্যমিক স্তরে’ ৩৫০ টাকা বাড়লেও মূল্যস্ফীতির কারণে সুবিধাভোগীর কাছে গেছে ২১৯ টাকা এবং বাকি ১৩১ টাকা হারিয়েছে মূল্যস্ফীতিতে।
‘উচ্চমাধ্যমিক’ পর্যায়ে ৪০০ টাকা বাড়লে মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে হারিয়েছে ১৫০ টাকা এবং বাকি ২৫০ টাকা গেছে ভাতাভোগীর কাছে। ‘উচ্চতর’ পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির কারণে ৭৫ টাকা কম পেয়েছে।
ফলে প্রকৃত ভাতা পেয়েছে ১২৫ টাকা। এছাড়া জীবনমান উন্নয়নে ‘প্রশিক্ষণ-পরবর্তী’ ভাতা ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও মূল্যস্ফীতির কারণে ৩ হাজার ৭৪১ টাকা হারাতে হয়েছে।
ফলে প্রকৃত ভাতা পাওয়া গেছে ৬ হাজার ২৫৯ টাকা। ফলে একদিকে ৭টি জেলা থেকে ৬৪ জেলা পর্যন্ত হিজড়াদের জন্য কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হয়েছে, বেড়েছে বাজেটও। কিন্তু তাদের জীবনমান উন্নয়নে কোনো কাজে আসছে না।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. এমকে মুজেরি যুগান্তরকে বলেন, হিজড়াগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন না হওয়ার পেছনের কারণ হচ্ছে ভাতার পরিমাণ পর্যাপ্ত বৃদ্ধি না পাওয়া এবং মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী।
তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে পারলেই সমাজের মূলস্রোতে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। মিরপুর ১০ নম্বর জুটপট্টির বাসিন্দা হিজড়া আখতার হোসেন বিজয় সরণি থেকে উত্তরা পর্যন্ত ২০০ হিজড়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
জীবনমান উন্নয়ন নিয়ে কথা বললে তিনি যুগান্তরকে বলেন, এই ভাতা নিয়ে বিব্রত। ভাতার টাকা দিয়ে কিছুই হচ্ছে না- না খাওয়া, না বাসাভাড়া, না চিকিৎসা। কিন্তু সাধারণ মানুষ মনে করে, আমরা সরকারের কাছ থেকে অনেক টাকা পাই। তাই তারা এখন আর সাহায্য করতেও চায় না।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবন উন্নয়নে সমাজসেবা অধিদফতরে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সফল হচ্ছে না বলেও প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, প্রশিক্ষণের পর তাদের মূলধন দেয়া হয়, তা অপর্যাপ্ত। বেশির ভাগই প্রশিক্ষণ নিলেও তারা সেই অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে কাজ করছেন না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার উম্মে ফারহানা জাকিয়া কান্তা যুগান্তরকে বলেন, হিজড়াদের কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধির কারণে বাজেটও বেড়েছে।
কিন্তু ভাতার পরিমাণ বাড়েনি। জীবনযাত্রার মান তখনই পরিবর্তন হবে, যখন তার ভাতা বাড়বে। প্রশিক্ষণের পর তাদের ১০ হাজার টাকা দিচ্ছে, যা দিয়ে বর্তমানে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়।
আমাদের সুপারিশ হচ্ছে- একটি ব্যাচে ৫০ জন থাকলে প্রত্যেককে টাকা না দিয়ে সবার টাকা একত্র করে একটি যৌথভাবে প্রকল্প নিতে পারে সমাজকল্যাণ অধিদফতর। এতে প্রত্যেকেই উপকৃত হবেন।
সিলেট শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম মাহবুবুজ্জামানের মতে, মাসিক ভাতা প্রদানের পাশাপাশি হিজড়াদের বিভিন্ন কাজের সুযোগ দেয়া হলে তারা আর রাস্তায় ঘুরে মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করবে না। সমাজের বোঝা হবে না।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























