অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
চলতি বাজেটে সরকার নিুমানের এক প্যাকেট (১০ শলাকা) সিগারেটের দাম ৩৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। অথচ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১০ টাকায় সিগারেটের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে।
মূলত স্বল্প আয়ের ধূমপায়ীদের টার্গেট করে ৩০টি আঞ্চলিক কোম্পানি এসব সিগারেট উৎপাদন করছে। পরে নকল ব্যান্ডরোল লাগিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর বিপণন কৌশল হিসেবে ফেসবুককে বেছে নেয়া হয়েছে।
নকল ব্যান্ডরোল লাগিয়ে সিগারেট বিক্রি করায় হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন খোদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর)। অবস্থা এমনই বেগতিক যে, নকল সিগারেট বিক্রি বন্ধে এনবিআরকে পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দিতে হয়েছে।
এক প্যাকেট নিুমানের (৩৫ টাকা দরের) সিগারেট থেকে সরকার ৭১ শতাংশ শুল্ক-কর (১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর, ৫৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ) আদায় করে। এ হিসাবে এক প্যাকেট সিগারেটে সরকার ২৪ টাকা ৮৫ পয়সা রাজস্ব পায়।
রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে এনবিআর সিগারেট কোম্পানিগুলোর কাছে সিকিউরিটি ফিচারসমৃদ্ধ ব্যান্ডরোল বিক্রি করে। কিন্তু নিুস্তরের সিগারেটের মূল্য বাড়ায় নকল ব্যান্ডরোল লাগিয়ে আঞ্চলিক কোম্পানিগুলো সিগারেট উৎপাদন করে বাজারে সরবরাহ করছে।
প্রায়ই এনবিআরের মাঠপর্যায়ের অভিযানে নকল ব্যান্ডরোলের ছাপাখানা ও নকল ব্যান্ডরোল লাগানো সিগারেট ধরা পড়ছে। কিন্তু তারপরও থেমে নেই উৎপাদন। মূলত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা এজন্য দায়ী। এ কারণে নিুস্তরের সিগারেট থেকে রাজস্ব আদায় আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
এনবিআরের তথ্যমতে, একক খাত হিসেবে সিগারেট রাজস্ব আয়ের প্রধান খাত। মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) প্রায় ২১ শতাংশ আসে সিগারেট খাত থেকে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট ৭৮ হাজার ১৪২ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় হয়েছে, এর মধ্যে ১৬ হাজার ১১৪ কোটি টাকাই আদায় হয়েছে সিগারেট থেকে।
নকল ও চোরাই সিগারেটের বিক্রি বাড়ায় রাজস্ব আদায় কমেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় ৩ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। মূলত নিুস্তরের সিগারেট থেকে রাজস্ব আদায় কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।
সম্পূরক শুল্ক বাবদ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে নিুস্তরের সিগারেটে ৭ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা আদায় হয়েছে, সেখানে ২০১৭-১৮তে আদায় হয়েছে ৫ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। একইভাবে ভ্যাট বাবদ ৬৫১ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে।
যথাযথ মূল্যে সিগারেট বিক্রি এবং ব্যান্ডরোল জালিয়াতি রোধে ১২ সেপ্টেম্বর এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় রাজস্ব ফাঁকি দেয়াকে গুরুতর অপরাধ উল্লেখ করে এনবিআর চেয়ারম্যান ভ্যাট কমিশনারদের আরও সক্রিয় এবং কঠোরভাবে অনিয়ম দূর করতে নির্দেশ দেন।
ওই সভায় মোট ১৫টি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- নকল ব্যান্ডরোলের সিগারেট জব্দ হলে এবং বেআইনিভাবে সিগারেট উৎপাদন করলে ওই প্রতিষ্ঠানে তালা দেয়া হবে। একই সঙ্গে সরেজমিন কারখানা পরিদর্শন করে নিবন্ধিত সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, বন্ধ ও পুনর্নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের তালিকা এনবিআরে পাঠাতে কমিশনারদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, নকল ব্যান্ডরোলের ব্যবহার রোধে এনবিআর তৎপর। এরই মধ্যে নকল ব্যান্ডরোল লাগিয়ে সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাতেনাতে ধরতে পারলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নকল সিগারেট বিপণনে কৌশল : একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে নকল সিগারেট উৎপাদন ও বিপণনে কৌশল অবলম্বন করে থাকে কোম্পানিগুলো। উৎপাদিত সিগারেট কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় পাঠানো হয়। সেখানে স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করা হয়। আবার অনেকে ব্যক্তি উদ্যোগে অতিরিক্ত মুনাফার আশায় ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে সিগারেট বিক্রি করছে। এ ধরনের একাধিক পেজের খোঁজ পাওয়া গেছে।
সস্তায় এসব সিগারেট বিক্রি হওয়ায় এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কদাচিৎ অভিযান চালিয়ে সিগারেট জব্দ করা হলেও উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। চলতি বছরের ১৭ জুলাই সুনামগঞ্জ শহরে অভিযান চালিয়ে ১১ হাজার ৭১৮ টাকা মূল্যের ৫ হাজার ৮৫৯ শলাকা নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট জব্দ করা হয়।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করা ছাড়া এ ধরনের সিগারেট উৎপাদন সম্ভব নয়। কারণ একাধিক অভিযানে এ জাতীয় সিগারেট ধরা পড়লেও কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি গ্রহণ করা হয়নি। অল্প টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা দিয়ে পুনরায় নকল ব্যান্ডরোল লাগিয়ে সিগারেট বাজারে ছাড়া হচ্ছে।
নকল যত ব্র্যান্ড: প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠান নকল সিগারেট উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। নকল সিগারেটের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে স্যানরগোল্ড। একাধিক কোম্পানি এই নামে সিগারেট বানাচ্ছে। রংপুরের ন্যাশনাল টোব্যাকো, এসভি টোব্যাকো, এসআর টোব্যাকো, স্প্যানিশ টোব্যাকো, রাজশাহীর এবি টোব্যাকো, কিশোরগঞ্জের তারা ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো, হেরিটেজ টোব্যাকো, যশোরের জামান টোব্যাকো স্যানরগোল্ড সিগারেট বানায়।
এছাড়া ভরসা, ডারলি, টিপটপ, টাইগার, সিনেট, ব্লাক, সুপার গোল্ড, জিরা, ব্ল্যাক, গোল্ড, টার্গেট, সাহারা, ব্লাক অ্যান্ড হোয়াইট, উইলসন, বিউটি কিং, সিটি, সুলতান, টপটেন নামে নকল সিগারেট দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্রি হচ্ছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























