অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে দেশটি টালবাহানা করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জানান, প্রতিবেশী দেশটি নানা অযুহাত দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।
সোমবার গণভবনে করা সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
রোহিঙ্গারা নানা সময় প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে ছুটে এসেছে। তবে গত ২৫ আগস্ট দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা এসেছে। এখন অবধি ১১ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা করা হয়েছে।
এদেরকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের সঙ্গে গত ১৬ জানুয়ারি ফিজিক্যাল অ্যারাঞ্জমেন্ট চুক্তি করে বাংলাদেশ। এই চুক্তি অনুযায়ী ২৩ জানুয়ারি থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা হয়নি।
১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সফররত মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খ শোয়ের হাতে আট হাজার ৩২ জনের একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। এরাই সবার আগে মিয়ানমার ফিরে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী বর্ষার আগেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে হবে বলে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালককে জানিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমার নানা রকম টালবাহনা করছে, সন্দেহ নাই। এটা তাদের চরিত্র, তারা করে যাচ্ছে। তার পরেও যেহেতু তারা রাজি হয়েছে, তারা নেবে।’
‘তারা নানা রকম অযুহাত খাঁড়া করার চেষ্টা করছে, সেটা হচ্ছে চিন্তা। তবে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে খুব একটা অসুবিধা হবে না।’
আট হাজার জনের তালিকা হস্তান্তরের বিষয়ে এক প্রশ্নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা আট হাজার বলছে, আট হাজারই আগে নিক। নিলে দেখব তারা তাদের সাথে কী ধরনের ব্যবহার করেন।’
‘আর একবার যদি যাওয়া শুরু করে তখন, এরা স্রোতের মতো এমনিতেই চলে যাবে, আপনাদের আর চিন্তা করা লাগবে না। কারণ সবাই নিজের ঘর বাড়িতে ফিরে আসতে চায়।’
মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনারা নিজেদের কথা চিন্তা করেন ১৯৭১ সালে। এক কোটি শরণার্থী চলে গিয়েছিল না? যেদিন পাকিস্তান বাহিনী সারেন্ডার করল, কাউকে সেধে নিয়ে আসতে হয় নাই। সবাই কিন্তু আপন মনেই চলে এসেছে।’
রাখাইনের নিরাপত্তার দিকে নজর রাখছে বাংলাদেশ
রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে গিয়ে জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা যেন পায়, সে দিকটিও বাংলাদেশের বিবেচনায় আছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এ জন্যই সরকার তাড়াহুড়ো করছে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তো তাদের ঠেলে ফেলে দিতে পারি না। ঠেলে যদি আমরা ফেলে দেই, তাহলে এরা কী অবস্থায় পড়বে সেটা আপনারাও বুঝেন, আমিও বুঝি ‘
‘তারা তো মানুষ। এই মানুষগুলোতে আমরা তোপের মুখে ফেলে দেব কীভাবে। তাদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে আমরা চাচ্ছি কীভাবে তাদের ফেরত দেয়া যায়’।
রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে জাতিসংঘের গঠন করা কমিশনের প্রধান কফি আনানের সঙ্গে দেখা হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বলেছি, এরা যখন ফেরত যাবে, সেখানেও তাদের নিরাপত্তার দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেন। ওখানে যেন রিলিফ পায়, ওখানে যেন খাবার পায়, ওখানে যেন সব ব্যবস্থা পায়, সেটার ব্যবস্থা আমরা করছি।’
রোহিঙ্গাদের তালিকা আছে
আপাতত মিয়ানমারকে আট হাজার ৩২ জনের তালিকা দেয়া হলেও যত রোহিঙ্গা এসেছে, তাদের সবার নাম লিপিবদ্ধ করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
‘কারণ একটা কাজ করেছিলাম। এ জন্য আমাকে ধন্যবাদ জানানো উচিত। কারণ যে মুহূর্তে তারা দেশে ঢুকা শুরু করেছে, সেই মুহূর্তে আমি প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে টাকা পাঠিয়ে লোক নিয়োগ দিয়ে প্রত্যেকের তালিকা করা, বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ করা, তাদের সমস্ত কিছু করে আইডি কার্ড করে দিয়েছি। …প্রতিদিন কত শিশু জন্ম নিচ্ছে, সেটারও হিসাব করা হচ্ছে।’
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের আমলে আসা তিন থেকে চার লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র ২৬ হাজারের নাম নিবন্ধন করা হয়েছিল বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
বলেন, ‘আমরা কিন্তু তা করিনি, তারা যে ঢুকছে সে ছবি, প্রত্যেকের আলাদা ছবি এবং তাদের আইডি কার্ড। এখন মিয়ানমার কিন্তু অস্বীকার করতে পারবে না, এরা তাদের নাগরিক না।’
আপাতত আশ্রয় হবে ভাসানচরে
কক্সবাজারের কুতুপালং ও বালুখালি থেকে রোহিঙ্গাদেরকে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
বলেন, ‘আমরা নতুন একটা দ্বীপ, সেটাকে উন্নতি করছি। সেখানে আমরা ঘরবাড়ি তৈরি করছি, একটা প্রজেক্টও পাস করেছি। ঘরের ডিজাইন সব করা হয়ে গেছে। সেখানে আমরা সাইক্লোন সেল্টার করছি। সেখানে আমরা সাগরের দিকে বাধ করে দিচ্ছি যেনে সেখানে জলোচ্ছ্বাস না আসে যা জোয়ারের পানি যেন না আসে।’
‘কুতুপালং ক্যাম্প, বালুখালি ক্যাম্প সব কিন্তু উখিয়াতে এবং সেখানে কিন্তু গাছপালা সব শেষ প্রায়। মাটির পাহাড়। যেহেতু গাছ কাটা হয়ে গেছে, সামনে বর্ষা। যে কোনো সময় মাটির ধস নামতে পারে। কাজেই আমরা যাচ্ছি একটি অস্থায়ী ক্যাম্প করে সেখানে রাখা আর যত দিন পর্যন্ত তারা না নেয়।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এরা যেন মানুষের মতো বসবাস করতে পারে, সে জন্য আমরা ভাসানচরে ঘরবাড়ি করে দিচ্ছি। অন্তত ভালোভাবে থাকবে। ছোট ছোট অনেক শিশু, অনেক বাচ্চা হয়ে গেছে, তদের ভবিষ্যৎটা কী?’
‘আমরা চাইছি তারা মানুষের মতো অন্তত বসবাস করুক। প্রথমে আমরা এক লক্ষ লোকের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ঘরবাড়ি করে দিচ্ছি, পর্ায়ক্রমে এটা আমরা করব। ভাসানচরে যথেষ্ট জায়গা, সেখানে ১০ লাখের জন্য জায়গা আমরা করতে পারব। সেটা তাদের বাসা নয়, অস্থায়ী বাসস্থান।’
রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে গেলে ভাসানচর বাংলাদেশের মানুষের আবাসনের জন্য ব্যবহার করা হবে বলেও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। বলেন, ‘১৬ কোটি মানুষ এই দেশে। তাদেরও তো থাকার জায়গা দিতে হয় আমাকে। এই জায়গাটা তাদের জন্যও ব্যবহার করতে পারব।’
‘অথবা যদি আপনারা পরে যদি চান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যটা এত বেশি ওখানকার, যদি আপনারা সেখানে যান তাহলে সেখানে বেড়ানোর ব্যবস্থাও করা যাবে। আপাতত তাদের জন্য ব্যবস্থা করছি।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















