ঢাকা ০৪:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজধানীতে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও আধুনিক ওসমানী উদ্যান উদ্বোধন করলেন শেরেবাংলা নগরে সরছে সচিবালয়, অনুমোদন দিল মন্ত্রিসভা দেশ গড়ার কাজে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর মক্কা-মদিনায় হুমকি এলে বাংলাদেশ চুপ থাকবে না: শামা ওবায়েদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন চলতি অক্টোবরের শেষ দিকে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করলেন চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উদ্বোধনের আগেই কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরু সাইবার সুরক্ষা আইন যেন নিপীড়নমূলক না হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অক্টোবর-নভেম্বরে তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছেন সামিয়া, পাশে থেকে চুল কাটলেন পরিবার

ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি নেওয়ার সময় চুল পড়ে যাওয়ার বিষয়টি অনেক রোগীর জন্যই এক কঠিন মানসিক অভিজ্ঞতার নাম। তবে উপস্থাপক সামিয়া আফরিন এই কঠিন সময়ে একা নন। তাঁর এই লড়াইয়ে সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্বামী ও সন্তান। নিজের চুল পড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সামিয়া নিজেই তা ছোট করে কাটেন এবং ছেলে আহানাফ আরাবির সাহায্যে মাথা ন্যাড়া করেন। মায়ের এই কষ্টের মুহূর্তকে সহজ করতে ছেলে নিজেও তাৎক্ষণিকভাবে মাথা ন্যাড়া করে ফেলেন। শুধু তাই নয়, স্বামী এস এম রেজাউল ইমরানও নিজের মাথার চুল ফেলে দিয়ে স্ত্রীর পাশে থাকার দৃঢ় সংকল্প দেখিয়েছেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর নিজের এই সাহসিকতার ভিডিও ফেসবুকের মাধ্যমে সবার সঙ্গে শেয়ার করেছেন সামিয়া। চুল পড়ে যাবে, চিকিৎসক আগেই জানিয়েছিলেন। তাই নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করছিলেন। লিখেছিলেন, কেমোথেরাপির কারণে চুল পড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে মন খারাপ না করে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সবকিছু নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নেই; সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারাটাই আসল। চুল থাকুক বা না থাকুক, আত্মবিশ্বাসটাই মূল। সামিয়া বলেন, ‘চিকিৎসক দেবর যখন প্রথম খবরটা দিল, ভেবেছিলাম, যখন হয়েই গেছে, তখন আর কী করা যাবে। ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনে স্বামী রেজাউল ইমরানকে প্রতিটি কঠিন সময়ে পাশে পেয়েছেন। মায়ের অসুস্থতা তাঁর নিজের জীবনেও কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা বোঝাতে গিয়ে আহানাফ বলেন, ‘যা-ই করি, মাথায় থাকে মায়ের তো ক্যানসার।’। জীবন সব সময় আমাদের ইচ্ছেমতো গল্প লেখে না: সামিয়া আফরিন। ক্যাম্পাসে গেলে বন্ধুরা চুল ফেলে দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছে।

ক্যানসারের সঙ্গে সামিয়ার লড়াইয়ের ইতিহাস নতুন নয়। ২০২২ সালে প্রথমবার তাঁর কোলন ক্যানসার শনাক্ত হয়। তখন সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের পরামর্শে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই খবর শোনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও ধীরে ধীরে তিনি চিকিৎসার পথে হাঁটেন। তবে এবার জিনের পরীক্ষায় শরীরে নতুন এক ত্রুটি ধরা পড়ায় নতুন করে ওভারিয়ান ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। গত ১১ অক্টোবর রাজধানীর বনানীতে নিজের বাসায় আলাপচারিতায় তিনি জানান, বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে আত্মবিশ্বাসই তাঁর কাছে এখন বড় শক্তি। আল্লাহ তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং এখনো নিজে চলাফেরা করতে পারছেন—এটাই বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন তিনি। বললেন, ‘চুল তো মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য। ২১ দিন পরপর দেওয়া এই চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। সন্ধ্যায় সেজেগুজে দাওয়াত খেতেও গিয়েছি। মনে হয়েছিল, চিকিৎসা নিলে আমার পুরো জীবনযাপন বদলে যাবে।’। পরে সিঙ্গাপুরের এক চিকিৎসক সামিয়াকে ইমিউনোথেরাপির পরামর্শ দেন। একসময় পাতলা পায়খানার সমস্যায় ডায়াপার পরে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাঁকে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন তিনি।

সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার শুরুর দিনগুলোর ভয়াবহ স্মৃতির কথা মনে করে সামিয়া জানান, চতুর্থ পর্যায়ের খবর শুনে তিনি প্রথমদিকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে ওই বছরের এপ্রিলে সিঙ্গাপুরে যান তিনি। এর আগে কাছের মানুষ ছাড়া অনেকেই তাঁর অসুস্থতার কথা জানতেন না।

অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপির কষ্ট আর দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার ধকল তাঁকে একসময় হুইলচেয়ারে বসিয়ে দিয়েছিল।

চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ঢোক গিলতে না পারা কিংবা ত্বকের অসহ্য চুলকানির মতো যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। প্রথম থেরাপির পর ঢোক গিলতে পারতেন না, ত্বকে হতো চুলকানি। যিনি এর মধ্য দিয়ে যাবেন, তিনিই বুঝবেন।’।

একবার স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের যন্ত্রণার সঙ্গে নিজের শারীরিক কষ্টের তুলনা করে তিনি বলেন, এই যন্ত্রণা কেবল ভুক্তভোগীই বুঝতে পারেন। গত ২২ জুলাই সিঙ্গাপুরে অস্ত্রোপচারের পর এখন তিনি দেশে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন। আগামী ডিসেম্বর মাসে তাঁর ছয়টি কেমোথেরাপির কোর্স সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৩ সালে দেশে ফেরার পরও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন।

সামিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, গত ১৩ অক্টোবর তিনি থাইল্যান্ডে গিয়েছেন এবং আগামী ২৩ অক্টোবর দেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ২৫ অক্টোবর থেকে তাঁর পরবর্তী পর্যায়ের কেমোথেরাপি শুরু হবে। এই দীর্ঘ চিকিৎসার ধকল সামলানোর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বড় ছেলে আহানাফ আরাবি কানাডায় পড়াশোনা ছেড়ে মায়ের পাশে থাকতে দেশে ফিরে আসেন। মায়ের সাপোর্ট সিস্টেম হিসেবে কাজ করার বিষয়টিই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার বলে জানান এই শিক্ষার্থী।

পরিবারের সদস্যদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সমর্থন সামিয়াকে প্রতিনিয়ত শক্তি যোগাচ্ছে। নিজের ভাইয়ের ছেলে আয়মান আওসাফকে আইনিভাবে দত্তক নিয়ে পরিবারের সদস্য হিসেবে বড় করছেন তিনি। ক্যানসারের মতো রোগের ক্ষেত্রে পরিবারের ধৈর্য ও মানসিক সমর্থন যে কতটা জরুরি, তা সামিয়ার এই লড়াই থেকেই স্পষ্ট। তিনি নিজে ‘পারপাস বাই সামিয়া’ নামের একটি পডকাস্টের মাধ্যমে ক্যানসার আক্রান্তদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন এবং উজ্জ্বলা ফাউন্ডেশনের পরিচালক হিসেবে রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সামিয়ার বাবা আবদুর রহিম মেয়ের চিকিৎসার ব্যয়ভার ও শারীরিক কষ্ট নিয়ে দারুণ উদ্বিগ্ন। অবসরপ্রাপ্ত এই প্রকৌশলী জানান, মেয়ের জন্য তাঁদের যে কষ্ট, তা তাঁরা প্রকাশ করতে চান না, কেবল মেয়ের সুস্থতার জন্য দোয়া প্রার্থনা করেন। বাবার কাছ থেকেই মানসিকভাবে শক্ত থাকার শিক্ষা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন সামিয়া। যদিও তিনি অসুস্থতাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে চান না, বরং পরিবারের সদস্যদের সামনে সবসময় হাসিখুশি ও অটল থাকার চেষ্টা করেন। ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মনোবল বৃদ্ধি করতে ফেসবুকের মাধ্যমে নিয়মিত বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি, যাতে অন্য কোনো রোগী বা পরিবার সামিয়ার পোস্ট থেকে একটু হলেও সাহস পান। কষ্টের কথা নয়, শক্ত থাকার বার্তা গত বছরের ২০ মার্চ ঢাকার বনানীতে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের সহায়তায় আয়োজিত ‘রিভোগ ওয়্যার টু কেয়ার’ নামের পোশাক প্রদর্শনীতে নিজের ক্যানসারের কথা প্রকাশ্যে জানান সামিয়া।

চিকিৎসা প্রক্রিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় খাবারের স্বাদ-গন্ধ হারিয়ে ফেলা এবং প্রচণ্ড শারীরিক অবসাদ সত্ত্বেও তিনি হাল ছাড়তে নারাজ। আগামী দিনগুলোতে ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয় কমানো ও জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। বর্তমানে কেমোথেরাপি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি উপস্থাপনা বা বাইরের কোনো কাজ হাতে নিতে চাচ্ছেন না। অবসরের বড় একটি অংশ বারান্দার গাছপালা ও পোষা বিড়ালদের সঙ্গেই কাটে তাঁর। ক্যানসারে আপনজন হারানোর বেদনা তাঁর পরিবারে থাকলেও সামিয়া তাঁর নিজের এই লড়াইয়ে হার মানতে রাজি নন। শরীরের অন্য কোথাও নতুন করে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও তিনি ইতিবাচক থাকার চেষ্টাতেই জীবনের প্রতিটি দিন পার করছেন। এমনকি কোনো চিকিৎসা না করেই দেশে ফিরে আসার কথাও ভেবেছিলেন।

আপলোডকারীর তথ্য

ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছেন সামিয়া, পাশে থেকে চুল কাটলেন পরিবার

আপডেট সময় ০৩:২৩:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি নেওয়ার সময় চুল পড়ে যাওয়ার বিষয়টি অনেক রোগীর জন্যই এক কঠিন মানসিক অভিজ্ঞতার নাম। তবে উপস্থাপক সামিয়া আফরিন এই কঠিন সময়ে একা নন। তাঁর এই লড়াইয়ে সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্বামী ও সন্তান। নিজের চুল পড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সামিয়া নিজেই তা ছোট করে কাটেন এবং ছেলে আহানাফ আরাবির সাহায্যে মাথা ন্যাড়া করেন। মায়ের এই কষ্টের মুহূর্তকে সহজ করতে ছেলে নিজেও তাৎক্ষণিকভাবে মাথা ন্যাড়া করে ফেলেন। শুধু তাই নয়, স্বামী এস এম রেজাউল ইমরানও নিজের মাথার চুল ফেলে দিয়ে স্ত্রীর পাশে থাকার দৃঢ় সংকল্প দেখিয়েছেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর নিজের এই সাহসিকতার ভিডিও ফেসবুকের মাধ্যমে সবার সঙ্গে শেয়ার করেছেন সামিয়া। চুল পড়ে যাবে, চিকিৎসক আগেই জানিয়েছিলেন। তাই নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করছিলেন। লিখেছিলেন, কেমোথেরাপির কারণে চুল পড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে মন খারাপ না করে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সবকিছু নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নেই; সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারাটাই আসল। চুল থাকুক বা না থাকুক, আত্মবিশ্বাসটাই মূল। সামিয়া বলেন, ‘চিকিৎসক দেবর যখন প্রথম খবরটা দিল, ভেবেছিলাম, যখন হয়েই গেছে, তখন আর কী করা যাবে। ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনে স্বামী রেজাউল ইমরানকে প্রতিটি কঠিন সময়ে পাশে পেয়েছেন। মায়ের অসুস্থতা তাঁর নিজের জীবনেও কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা বোঝাতে গিয়ে আহানাফ বলেন, ‘যা-ই করি, মাথায় থাকে মায়ের তো ক্যানসার।’। জীবন সব সময় আমাদের ইচ্ছেমতো গল্প লেখে না: সামিয়া আফরিন। ক্যাম্পাসে গেলে বন্ধুরা চুল ফেলে দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছে।

ক্যানসারের সঙ্গে সামিয়ার লড়াইয়ের ইতিহাস নতুন নয়। ২০২২ সালে প্রথমবার তাঁর কোলন ক্যানসার শনাক্ত হয়। তখন সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের পরামর্শে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই খবর শোনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও ধীরে ধীরে তিনি চিকিৎসার পথে হাঁটেন। তবে এবার জিনের পরীক্ষায় শরীরে নতুন এক ত্রুটি ধরা পড়ায় নতুন করে ওভারিয়ান ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। গত ১১ অক্টোবর রাজধানীর বনানীতে নিজের বাসায় আলাপচারিতায় তিনি জানান, বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে আত্মবিশ্বাসই তাঁর কাছে এখন বড় শক্তি। আল্লাহ তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং এখনো নিজে চলাফেরা করতে পারছেন—এটাই বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন তিনি। বললেন, ‘চুল তো মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য। ২১ দিন পরপর দেওয়া এই চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। সন্ধ্যায় সেজেগুজে দাওয়াত খেতেও গিয়েছি। মনে হয়েছিল, চিকিৎসা নিলে আমার পুরো জীবনযাপন বদলে যাবে।’। পরে সিঙ্গাপুরের এক চিকিৎসক সামিয়াকে ইমিউনোথেরাপির পরামর্শ দেন। একসময় পাতলা পায়খানার সমস্যায় ডায়াপার পরে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাঁকে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন তিনি।

সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার শুরুর দিনগুলোর ভয়াবহ স্মৃতির কথা মনে করে সামিয়া জানান, চতুর্থ পর্যায়ের খবর শুনে তিনি প্রথমদিকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে ওই বছরের এপ্রিলে সিঙ্গাপুরে যান তিনি। এর আগে কাছের মানুষ ছাড়া অনেকেই তাঁর অসুস্থতার কথা জানতেন না।

অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপির কষ্ট আর দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার ধকল তাঁকে একসময় হুইলচেয়ারে বসিয়ে দিয়েছিল।

চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ঢোক গিলতে না পারা কিংবা ত্বকের অসহ্য চুলকানির মতো যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। প্রথম থেরাপির পর ঢোক গিলতে পারতেন না, ত্বকে হতো চুলকানি। যিনি এর মধ্য দিয়ে যাবেন, তিনিই বুঝবেন।’।

একবার স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের যন্ত্রণার সঙ্গে নিজের শারীরিক কষ্টের তুলনা করে তিনি বলেন, এই যন্ত্রণা কেবল ভুক্তভোগীই বুঝতে পারেন। গত ২২ জুলাই সিঙ্গাপুরে অস্ত্রোপচারের পর এখন তিনি দেশে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন। আগামী ডিসেম্বর মাসে তাঁর ছয়টি কেমোথেরাপির কোর্স সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৩ সালে দেশে ফেরার পরও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন।

সামিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, গত ১৩ অক্টোবর তিনি থাইল্যান্ডে গিয়েছেন এবং আগামী ২৩ অক্টোবর দেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ২৫ অক্টোবর থেকে তাঁর পরবর্তী পর্যায়ের কেমোথেরাপি শুরু হবে। এই দীর্ঘ চিকিৎসার ধকল সামলানোর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বড় ছেলে আহানাফ আরাবি কানাডায় পড়াশোনা ছেড়ে মায়ের পাশে থাকতে দেশে ফিরে আসেন। মায়ের সাপোর্ট সিস্টেম হিসেবে কাজ করার বিষয়টিই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার বলে জানান এই শিক্ষার্থী।

পরিবারের সদস্যদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সমর্থন সামিয়াকে প্রতিনিয়ত শক্তি যোগাচ্ছে। নিজের ভাইয়ের ছেলে আয়মান আওসাফকে আইনিভাবে দত্তক নিয়ে পরিবারের সদস্য হিসেবে বড় করছেন তিনি। ক্যানসারের মতো রোগের ক্ষেত্রে পরিবারের ধৈর্য ও মানসিক সমর্থন যে কতটা জরুরি, তা সামিয়ার এই লড়াই থেকেই স্পষ্ট। তিনি নিজে ‘পারপাস বাই সামিয়া’ নামের একটি পডকাস্টের মাধ্যমে ক্যানসার আক্রান্তদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন এবং উজ্জ্বলা ফাউন্ডেশনের পরিচালক হিসেবে রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সামিয়ার বাবা আবদুর রহিম মেয়ের চিকিৎসার ব্যয়ভার ও শারীরিক কষ্ট নিয়ে দারুণ উদ্বিগ্ন। অবসরপ্রাপ্ত এই প্রকৌশলী জানান, মেয়ের জন্য তাঁদের যে কষ্ট, তা তাঁরা প্রকাশ করতে চান না, কেবল মেয়ের সুস্থতার জন্য দোয়া প্রার্থনা করেন। বাবার কাছ থেকেই মানসিকভাবে শক্ত থাকার শিক্ষা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন সামিয়া। যদিও তিনি অসুস্থতাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে চান না, বরং পরিবারের সদস্যদের সামনে সবসময় হাসিখুশি ও অটল থাকার চেষ্টা করেন। ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মনোবল বৃদ্ধি করতে ফেসবুকের মাধ্যমে নিয়মিত বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি, যাতে অন্য কোনো রোগী বা পরিবার সামিয়ার পোস্ট থেকে একটু হলেও সাহস পান। কষ্টের কথা নয়, শক্ত থাকার বার্তা গত বছরের ২০ মার্চ ঢাকার বনানীতে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের সহায়তায় আয়োজিত ‘রিভোগ ওয়্যার টু কেয়ার’ নামের পোশাক প্রদর্শনীতে নিজের ক্যানসারের কথা প্রকাশ্যে জানান সামিয়া।

চিকিৎসা প্রক্রিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় খাবারের স্বাদ-গন্ধ হারিয়ে ফেলা এবং প্রচণ্ড শারীরিক অবসাদ সত্ত্বেও তিনি হাল ছাড়তে নারাজ। আগামী দিনগুলোতে ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয় কমানো ও জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। বর্তমানে কেমোথেরাপি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি উপস্থাপনা বা বাইরের কোনো কাজ হাতে নিতে চাচ্ছেন না। অবসরের বড় একটি অংশ বারান্দার গাছপালা ও পোষা বিড়ালদের সঙ্গেই কাটে তাঁর। ক্যানসারে আপনজন হারানোর বেদনা তাঁর পরিবারে থাকলেও সামিয়া তাঁর নিজের এই লড়াইয়ে হার মানতে রাজি নন। শরীরের অন্য কোথাও নতুন করে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও তিনি ইতিবাচক থাকার চেষ্টাতেই জীবনের প্রতিটি দিন পার করছেন। এমনকি কোনো চিকিৎসা না করেই দেশে ফিরে আসার কথাও ভেবেছিলেন।