বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সম্পর্ককে কেবল ঋণ নেওয়া বা না নেওয়ার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে বর্তমান পরিস্থিতির প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই সম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, সরকারি ব্যয়, বৈদেশিক অর্থায়ন, বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে বাংলাদেশের স্বকীয় স্বাধীনতা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সম্প্রতি সমঝোতা না হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যেমন একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনই এটি নিজস্ব সক্ষমতায় দাঁড়ানোর একটি সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচন করেছে। এর উত্তর কেবল বৈদেশিক মুদ্রার সাময়িক ঘাটতির মধ্যে খুঁজলে চলবে না। বাংলাদেশের কর-রাজস্বের পরিমাণ দেশের সার্বিক অর্থনীতির তুলনায় এখনো অত্যন্ত কম। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া দুর্বল রয়ে গেছে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে এবং আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বিভিন্ন সময়ে অর্থনীতিকে অস্থির করেছে। কৃষি উৎপাদন বেড়েছে, শিল্প ও রপ্তানি সম্প্রসারিত হয়েছে, দারিদ্র্য কমেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতাও বেড়েছে। সরকারি ব্যয়ের একটি অংশ উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবর্তে অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যায়। তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা মানেই অন্য সব বৈদেশিক অর্থায়নের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, কিন্তু এর ফলে আন্তর্জাতিক আস্থার পরিবেশে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রাজস্ব বাড়ানো, করব্যবস্থায় পরিবর্তন, ভর্তুকি কমানো, মুদ্রা বিনিময় হার সংস্কার, সুদের হার ও মুদ্রানীতি পরিবর্তন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ—এসব পদক্ষেপ অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও স্বল্পমেয়াদে সাধারণ মানুষের। মূল্যস্ফীতির সময়ে কর বা জ্বালানি ব্যয় বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। জনগণের কাছে এর ব্যাখ্যা দেওয়া এবং এর বোঝা ন্যায্যভাবে বণ্টন করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত সংখ্যক সংস্কারের পরিবর্তে অগ্রাধিকারভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারের ওপর জোর দেওয়ার কথাও সেখানে বলা হয়েছে। এই জায়গাটিতেই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। কিন্তু কোন সংস্কার কখন এবং কী গতিতে করা হবে, তার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা, সামাজিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শনের আলোতেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম ঋণ গ্রহণ নিষিদ্ধ করেনি; বরং ঋণ লেনদেনে স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ও জনগণের সম্পদ একটি আমানত। সুতরাং সরকারি ব্যয়ে অপচয়, দুর্নীতি, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কিংবা অদক্ষ ব্যবস্থাপনা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি কেবল ঘাটতি পূরণের জন্য ক্রমাগত বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতাও টেকসই হতে পারে না। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ নিজে সফলতা বা ব্যর্থতার নিশ্চয়তা নয়; আসল বিষয় হলো একটি দেশ সেই অর্থ ও সংস্কারকে কীভাবে ব্যবহার করছে। এতে সরকার সংস্কারের গতি ও ক্রম নির্ধারণে কিছুটা বেশি স্বাধীনতা পেতে পারে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আইএমএফ-বাংলাদেশ সম্পর্ক
বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্যপদ লাভ করে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রয়োজনেই এই সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে অর্থনীতি যখনই বড় ধরনের বৈদেশিক খাত বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের সংকটে পড়েছে, তখনই বাংলাদেশ আইএমএফের সহযোগিতা নিয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্কের ধরণে রূপান্তর এসেছে। এখন এটি আর শুধু জরুরি মুহূর্তে অর্থ সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির নীতিগত কাঠামোর রূপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট ও ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা, ভূ-রাজনৈতিক সংকট, জ্বালানি ও পণ্যের উর্ধ্বমুখী দাম এবং দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান সংস্কারহীনতার কারণে বাংলাদেশ গভীর অর্থনৈতিক চাপে পড়ে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত হ্রাস পাওয়া এবং চলতি হিসাবের ঘাটতি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার আইএমএফের দ্বারস্থ হয়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি অর্থায়ন ও সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করে। এই প্যাকেজের মধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছিল বর্ধিত ঋণ সুবিধা (ইসিএফ) ও বর্ধিত তহবিল সুবিধাকালের (ইএফএফ) আওতায়, এবং প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ছিল রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাস্টেইনেবিলিটি ফাসিলিটি (আরএসএফ)-এর আওতায়, যা মূলত জলবায়ু ও স্থিতিশীলতা-সম্পর্কিত অর্থায়নের অংশ। এখানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আস্থার সংকেত। এসব সংস্কার একটি দেশের নিজস্ব সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করে। আর্জেন্টিনা বহুবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচিতে গিয়েও স্থায়ী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি; সেখানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব এবং বহিরাগত আঘাত বড় ভূমিকা রেখেছে।
ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থার গভীর সংকট
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে আছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং অবলোপনকৃত ঋণের কারণে পুরো আর্থিক খাত চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ অর্থনীতিতে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। এই অস্থিতিশীলতা সামাল দিতে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অটোমেশন, কর ছাড় হ্রাস এবং একটি আধুনিক কর কাঠামো গড়ে তোলার তাগিদ বারবার উঠে এসেছে। ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যকর স্বাধীন তদারকি সংস্থার ভূমিকায় অবতীর্ণ করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈদেশিক বিনিয়োগে প্রভাব
একটি দেশ যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সংস্কার কর্মসূচিতে যায়, তখন অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরাও দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে নতুন করে নজর দেয়। আইএমএফের সবুজ সংকেতকে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বহুপাক্ষিক দাতা সংস্থাগুলো অর্থনীতির সুশাসনের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। তাই আইএমএফের কর্মসূচির অগ্রগতি বা স্থবিরতা সরাসরি বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। ২০২৬ সালে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মূল কারণও ছিল বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার তাগিদ।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আইএমএফের সংস্কার শর্ত বাস্তবায়নের প্রভাব সবসময় একরকম হয় না। যেমন ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটে দক্ষিণ কোরিয়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তা গ্রহণের পাশাপাশি ব্যাপক সংস্কার করে দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল। আবার অনেক দেশের ক্ষেত্রে আইএমএফের কঠোর শর্ত অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষায় বিরূপ প্রভাবও ফেলেছে। ২০২৬ সালের কর্মসূচির নকশা ও শর্তসংক্রান্ত মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে যে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবসম্মত, দেশভিত্তিক, সংশ্লিষ্ট দেশের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সামাজিক প্রভাব বিবেচনাসম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশকে এখন নিজস্ব কৌশলে রাজস সামাজিক সুরক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ত্বরান্বিত করে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। পরবর্তী পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়েছে। তবে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কোনো দেশের উন্নয়নের বিকল্প নয়। গ্রিস, আর্জেন্টিনা কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখলেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ন্যায়ভিত্তিক রাজস্বব্যবস্থার সঙ্গে এ পথটিই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























