সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীরা এক প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় ১৩ জন নিহত এবং অন্তত ৩০০ জন আহত হয়েছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা সংঘাতকে এক নতুন ও ভয়াবহ মোড় দিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে সংঘাত শুরুর পর এটিই কোনো উপসাগরীয় দেশে সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। বিপুল প্রাণহানি ও আহত হওয়ার এই ভয়াবহতা সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত জানা গেছে, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত হয়েছেন। হতবিহ্বলজনক এই বিপুল মৃত্যু সেখানে এক রক্তাক্ত প্রতিশোধের আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
গত এক বছর ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল সাময়িক নয়। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে নিরাপত্তা ও শান্তি পরিস্থিতির যে অবক্ষয় ঘটেছে, তা সেখানকার নীতিনির্ধারকদের জন্য সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রথম বড় সংঘাতটি দেখা দিয়েছিল এক বছর আগে, যখন পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। সেই ঘটনার রেশ না কাটতেই ২০২৫ সালে দোহায় কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই ইসরায়েল হামলা চালায়। হামাস সদস্যদের লক্ষ্য করে চালানো সেই হামলায় পাঁচ ফিলিস্তিনি ও একজন কাতারি নাগরিক নিহত হন, যা দেশগুলোর মধ্যকার পুরোনো সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দেয়। গত এক বছরে উপসাগরীয় অঞ্চল নতুন এক অস্থিরতার যুগে ঢুকে পড়েছে, যা সাময়িক নয় এবং কোনোভাবেই পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। প্রথম অভাবনীয় ও দুঃসাহসিক ঘটনাটি ঘটেছিল ঠিক এক বছর আগে। দোহারের আকাশ আর চারদিকে ছড়ানো স্প্লিন্টারের সেই দৃশ্য ছিল কাতারিদের জন্য এক তীব্র হতাশার মুহূর্ত।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইরান যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি এই সংঘাতের দাবানলে টেনে এনেছে। তেহরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে রাজনৈতিক ও লজিস্টিকস সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে ইরান সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমানে প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়। এসব হামলায় সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি কেন্দ্র এবং পানি শোধন প্লান্টগুলো লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক বড় ধরনের ক্ষতি হয়। বিমানবন্দর ও আকাশসীমা অবরুদ্ধ হয়ে পড়া এবং স্কুল-কলেজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় স্বাভাবিক জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। এ ধরনের মর্মান্তিক হতাহতের ঘটনায় সৌদি আরব অভ্যস্ত নয়। গাজা ও ইরানের তুলনায় এখানে হতাহতের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম।
উপসাগরীয় শাসকদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পর্যটন, খেলাধুলা ও বিনোদনের বিশ্বকেন্দ্র হয়ে ওঠার ওপরও এই সংঘাত বড় আঘাত হেনেছে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ফর্মুলা ওয়ান, গলফ ও বক্সিংয়ের মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজন করে নিজেদের ভাবমূর্তি গড়ার যে চেষ্টা তারা করেছিল, সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় তা এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে। এই অস্থিতিশীলতা মূলত পুরোনো শত্রুতাগুলোকে পুনরায় উসকে দিয়েছে। এর পেছনে রয়েছে ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ইয়েমেন সংকট, যখন ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সানা দখল করে নিলে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৫ সালে সৌদি জোট হুতিদের দমনে বড় সামরিক অভিযান শুরু করলেও ২০২২ সালে যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা স্তিমিত হয়। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর সৌদি-ইরান কূটনৈতিক সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি ঘটলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আবার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গাজার উত্তপ্ত পরিস্থিতির পাশাপাশি লেবাননে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব এবং হুতিদের এই পুনরুত্থান পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক নতুন সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। প্রথম দর্শনে এটি কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















