ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত শিয়া মুসলিম ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। এই দ্বন্দ্বের পেছনে কাজ করছে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলবিরোধী তৎপরতা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের কার্যক্রম এবং সৌদি আরবের পাল্টা বিমান হামলায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের উত্থান ঘটেছিল ১৯৯০-এর দশকে। তেহরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ এই সংগঠনটি ইসরাইল ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিরোধিতা করে আসছে। বর্তমানে সংগঠনটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন আবদুল মালিক আল-হুতি। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে হটিয়ে দেশটিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল লক্ষ্য। ইয়েমেনের মোট ভূখণ্ডের এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ তাদের দখলে থাকলেও, দেশটির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতেই বসবাস করেন। তবে জনসংখ্যার হিসাবে দেশটির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষের বসবাস এমন এলাকায়, যেগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এই জোটে ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীও রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে সৌদি আরব ও ইরানের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। হুতিরা ইয়েমেনের ক্ষমতা পুরোপুরি দখল করলে দেশটি ইরানের মিত্র রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে—এই আশঙ্কায় ২০১৫ সালে সৌদির নেতৃত্বে কয়েকটি আরব দেশ সামরিক অভিযান শুরু করে। এতে যুক্তরাষ্ট্রও সমর্থন দেয়। পরবর্তীতে হুতিদের বিভিন্ন অবস্থানে সৌদি জোট বিমান হামলা চালালেও এবং জবাবে হুতিরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও জোটটি বিদ্রোহীদের প্রধান এলাকাগুলো থেকে সরাতে পারেনি। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে ইয়েমেনে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক সেবার সংকটে পড়েছেন। এই সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি লোহিত সাগরের নৌ চলাচল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও পড়ছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ও হুতিদের মধ্যে ২০২২ সালের মার্চ থেকে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের হামলা এবং গাজায় ইসরাইলি অভিযানের পর ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে ইসরাইল লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে হুতিরা। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। এরপর কয়েক বছর ধরে সৌদি হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে তাদের হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গত জুলাই মাসে সৌদির বিরুদ্ধে ‘নৌ অবরোধ’ ঘোষণার পাশাপাশি বন্দর ও তেল স্থাপনায় নতুন করে হামলার হুমকি দেয় হুতিরা। তাদের দাবি, ইয়েমেনের ওপর সৌদি অবরোধ এবং সানার বিমানবন্দরে বিমান হামলার জবাব দিতেই তারা এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেওয়ার পর সৌদি আরব বিমান হামলা চালালে সংঘাত চরম আকার ধারণ করে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 




















