ঢাকা ০৫:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চলতি অক্টোবরের শেষ দিকে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করলেন চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উদ্বোধনের আগেই কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরু সাইবার সুরক্ষা আইন যেন নিপীড়নমূলক না হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অক্টোবর-নভেম্বরে তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সন্ত্রাস দমন তহবিলে কাতারের ১৪১ মিলিয়ন ডলার অনুদান নিউইয়র্কে চার দিনে ৩০টি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত সফর জাতিসংঘে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধে চার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর অক্টোবরেই চালু হচ্ছে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশে ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ মৃত্যু, হাসপাতালে ১৭৮২

চীনের মানবসদৃশ রোবট জাপান ‘দখল’ করছে

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

বৈশ্বিক রাজনীতি যখনযুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার ‘প্রযুক্তি যুদ্ধ’ আর ঝুঁকি হ্রাসের আলোচনায় উত্তপ্ত, ঠিক তখনই টোকিওর হানেদা বিমানবন্দরের লাগেজ লোডিং এলাকায় অলক্ষ্যে ঘটে চলেছে এক নীরব প্রযুক্তিগত যুদ্ধবিরতি। তীব্র শ্রমঘাটতি এবং বার্ধক্যের দিকে ধাবিত কর্মীবাহিনীর সংকটে পড়া জাপান এখন লাগেজ সামলানোর মতো কঠিন কাজগুলোর জন্য চীনা প্রযুক্তিতে তৈরি হিউম্যানয়েড (মানবসদৃশ) রোবটের দিকে ঝুঁকছে।

ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের চেয়ে পিঠের ব্যথা আর মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতার বাস্তবতাই এখন এই অঞ্চলের দেশগুলোর কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র ৪,৯০০ মার্কিন ডলার মূল্যের একটি উন্নত রোবট যখন মানুষের বিকল্প হয়ে উঠছে, তখন বার্ধক্যে জর্জরিত সমাজগুলোর কাছে রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি একটি বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

২০২৬ সালের শুরুর দিকে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরের প্রদর্শনীতে রোবটের চমৎকার কর্মক্ষমতা দেখানো হলেও গত এপ্রিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ভিন্ন এক রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। সেখানে দেখা যায়, কাজের প্রচণ্ড চাপে ক্লান্ত এক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার অত্যন্ত ক্ষিপ্তভাবে লাগেজ ছুড়ে মারছেন। এই চাপ কেবল সিঙ্গাপুরেই সীমাবদ্ধ নয় জাপানেও এর তীব্রতা ভয়াবহ। ২০২৫ সালে রেকর্ড ৪ কোটি ২৭ লাখেরও বেশি পর্যটককে স্বাগত জানানো জাপান এক তীব্র কর্মী সংকটের মুখোমুখি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে তাদের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে অন্তত ৬৫ লাখ বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হবে অথচ অভিবাসন নীতি নিয়ে দেশটিতে রয়েছে চরম রাজনৈতিক চাপ।

ঠিক এই সন্ধিক্ষণে গত ১৯ এপ্রিল বেইজিং হাফ-ম্যারাথনে একটি অ্যান্ড্রয়েড (মানবসদৃশ) রোবট মানুষের চেয়েও দ্রুত গতিতে দৌড়ে ইতিহাস গড়ে। এর পরপরই হানেদা বিমানবন্দরে এই রোবটের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের ঘোষণা আসে। গত এক বছর ধরে হ্যাংঝু-ভিত্তিক কোম্পানি ‘ইউনিট্রি’র হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর অদ্ভুত টালমাটাল হাঁটার ভঙ্গি প্রযুক্তিকে কেবল একটি প্রদর্শনী বা তামাশা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে বেইজিংয়ের ম্যারাথনে রোবটগুলোর অবিরাম দৌড় প্রমাণ করেছে, এই টালমাটাল ভারসাম্য আসলে একটি যান্ত্রিক প্রতিরূপকে নিখুঁত করার কঠোর সাধনা মাত্র। বিমানবন্দর বা কার্গো হাবের ভেজা ও বিশৃঙ্খল মেঝেতে ভারী মালামাল ঠেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই উন্নত ভারসাম্য ও সংবেদনশীলতা অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখছে।

জাপানের মতো একটি দেশ, যা ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিবেশীদের ব্যাপারে সতর্ক এবং চীনের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে বদ্ধপরিকর, তাদের হানেদা বিমানবন্দরে এই চীনা রোবটের অনুপ্রবেশ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। জাপান এখানে কোনো কূটনীতি করছে না বরং তারা একজন কর্মীর মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষয়ের চেয়ে রোবটের মোটরের ওপর ভরসা রাখছে।

স্মার্টফোন এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির বিশাল বাজার থাকার কারণে চীন এমন এক হার্ডওয়্যার সাপ্লাই চেইন তৈরি করেছে যা বিশ্বের আর কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। তারা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ল্যাব থেকে এই হিউম্যানয়েড রোবটগুলোকে সাশ্রয়ী মূল্যে বাণিজ্যিক হাতিয়ার হিসেবে বাজারে নিয়ে এসেছে। ফোর্বসের তথ্যমতে, প্রতিটি ইউনিটের দাম মাত্র ৪,৯০০ ডলার থেকে শুরু, যা জাপানে একজন বিদেশি শ্রমিকের বার্ষিক বেতনের সামান্য অংশ মাত্র। ফলে ভূরাজনৈতিক উদ্বেগগুলো এখানে সহজেই আড়ালে চলে যাচ্ছে।

হং কংয়ের কার্গো হাবের বাঁধাধরা পথ ধরে চলা স্বয়ংক্রিয় যানের চেয়ে এই মানবসদৃশ রোবটগুলো মানুষের তৈরি বিশৃঙ্খল পরিবেশে অনেক বেশি মানিয়ে নিতে সক্ষম। সাম্প্রতিক এক প্রদর্শনীতে দেখা গেছে, একটি রোবট অত্যন্ত সাবধানে কার্গো ঠেলে নিয়ে যাওয়ার পর অলক্ষ্যে থাকা এক সহকর্মীকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে; যা যান্ত্রিক সৌজন্যের আড়ালে এক কঠোর ও গ্লানিময় শ্রমের বিকল্প হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেয়।

হানেদা বিমানবন্দরের এই সফল পরীক্ষা কেবল ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং খুব শিগগিরই এটি বিমানের কেবিন পরিষ্কার, বয়োবৃদ্ধদের সেবা এবং কৃষিকাজের মতো ক্ষেত্রগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মালয়েশিয়ায় ২৬৫ বাংলাদেশি পাসপোর্টসহ ২০ জন আটক

চীনের মানবসদৃশ রোবট জাপান ‘দখল’ করছে

আপডেট সময় ০২:০৫:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

বৈশ্বিক রাজনীতি যখনযুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার ‘প্রযুক্তি যুদ্ধ’ আর ঝুঁকি হ্রাসের আলোচনায় উত্তপ্ত, ঠিক তখনই টোকিওর হানেদা বিমানবন্দরের লাগেজ লোডিং এলাকায় অলক্ষ্যে ঘটে চলেছে এক নীরব প্রযুক্তিগত যুদ্ধবিরতি। তীব্র শ্রমঘাটতি এবং বার্ধক্যের দিকে ধাবিত কর্মীবাহিনীর সংকটে পড়া জাপান এখন লাগেজ সামলানোর মতো কঠিন কাজগুলোর জন্য চীনা প্রযুক্তিতে তৈরি হিউম্যানয়েড (মানবসদৃশ) রোবটের দিকে ঝুঁকছে।

ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের চেয়ে পিঠের ব্যথা আর মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতার বাস্তবতাই এখন এই অঞ্চলের দেশগুলোর কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র ৪,৯০০ মার্কিন ডলার মূল্যের একটি উন্নত রোবট যখন মানুষের বিকল্প হয়ে উঠছে, তখন বার্ধক্যে জর্জরিত সমাজগুলোর কাছে রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি একটি বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

২০২৬ সালের শুরুর দিকে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরের প্রদর্শনীতে রোবটের চমৎকার কর্মক্ষমতা দেখানো হলেও গত এপ্রিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ভিন্ন এক রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। সেখানে দেখা যায়, কাজের প্রচণ্ড চাপে ক্লান্ত এক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার অত্যন্ত ক্ষিপ্তভাবে লাগেজ ছুড়ে মারছেন। এই চাপ কেবল সিঙ্গাপুরেই সীমাবদ্ধ নয় জাপানেও এর তীব্রতা ভয়াবহ। ২০২৫ সালে রেকর্ড ৪ কোটি ২৭ লাখেরও বেশি পর্যটককে স্বাগত জানানো জাপান এক তীব্র কর্মী সংকটের মুখোমুখি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে তাদের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে অন্তত ৬৫ লাখ বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হবে অথচ অভিবাসন নীতি নিয়ে দেশটিতে রয়েছে চরম রাজনৈতিক চাপ।

ঠিক এই সন্ধিক্ষণে গত ১৯ এপ্রিল বেইজিং হাফ-ম্যারাথনে একটি অ্যান্ড্রয়েড (মানবসদৃশ) রোবট মানুষের চেয়েও দ্রুত গতিতে দৌড়ে ইতিহাস গড়ে। এর পরপরই হানেদা বিমানবন্দরে এই রোবটের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের ঘোষণা আসে। গত এক বছর ধরে হ্যাংঝু-ভিত্তিক কোম্পানি ‘ইউনিট্রি’র হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর অদ্ভুত টালমাটাল হাঁটার ভঙ্গি প্রযুক্তিকে কেবল একটি প্রদর্শনী বা তামাশা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে বেইজিংয়ের ম্যারাথনে রোবটগুলোর অবিরাম দৌড় প্রমাণ করেছে, এই টালমাটাল ভারসাম্য আসলে একটি যান্ত্রিক প্রতিরূপকে নিখুঁত করার কঠোর সাধনা মাত্র। বিমানবন্দর বা কার্গো হাবের ভেজা ও বিশৃঙ্খল মেঝেতে ভারী মালামাল ঠেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই উন্নত ভারসাম্য ও সংবেদনশীলতা অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখছে।

জাপানের মতো একটি দেশ, যা ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিবেশীদের ব্যাপারে সতর্ক এবং চীনের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে বদ্ধপরিকর, তাদের হানেদা বিমানবন্দরে এই চীনা রোবটের অনুপ্রবেশ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। জাপান এখানে কোনো কূটনীতি করছে না বরং তারা একজন কর্মীর মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষয়ের চেয়ে রোবটের মোটরের ওপর ভরসা রাখছে।

স্মার্টফোন এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির বিশাল বাজার থাকার কারণে চীন এমন এক হার্ডওয়্যার সাপ্লাই চেইন তৈরি করেছে যা বিশ্বের আর কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। তারা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ল্যাব থেকে এই হিউম্যানয়েড রোবটগুলোকে সাশ্রয়ী মূল্যে বাণিজ্যিক হাতিয়ার হিসেবে বাজারে নিয়ে এসেছে। ফোর্বসের তথ্যমতে, প্রতিটি ইউনিটের দাম মাত্র ৪,৯০০ ডলার থেকে শুরু, যা জাপানে একজন বিদেশি শ্রমিকের বার্ষিক বেতনের সামান্য অংশ মাত্র। ফলে ভূরাজনৈতিক উদ্বেগগুলো এখানে সহজেই আড়ালে চলে যাচ্ছে।

হং কংয়ের কার্গো হাবের বাঁধাধরা পথ ধরে চলা স্বয়ংক্রিয় যানের চেয়ে এই মানবসদৃশ রোবটগুলো মানুষের তৈরি বিশৃঙ্খল পরিবেশে অনেক বেশি মানিয়ে নিতে সক্ষম। সাম্প্রতিক এক প্রদর্শনীতে দেখা গেছে, একটি রোবট অত্যন্ত সাবধানে কার্গো ঠেলে নিয়ে যাওয়ার পর অলক্ষ্যে থাকা এক সহকর্মীকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে; যা যান্ত্রিক সৌজন্যের আড়ালে এক কঠোর ও গ্লানিময় শ্রমের বিকল্প হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেয়।

হানেদা বিমানবন্দরের এই সফল পরীক্ষা কেবল ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং খুব শিগগিরই এটি বিমানের কেবিন পরিষ্কার, বয়োবৃদ্ধদের সেবা এবং কৃষিকাজের মতো ক্ষেত্রগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে।