ঢাকা ১১:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শাহরাস্তিতে ধর্ষণের শিকার শিশু ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, অভিযুক্ত আটক সংসদে প্রবেশে মাথা ঝোঁকানোতে আপত্তি জামায়াত এমপির বহিষ্কৃত শিবির নেতা জিসান কারাগারে খেলা শেষ হওয়ার ২ ঘণ্টার মধ্যে আমেরিকা ছাড়ার নির্দেশ ইরানকে নিখোঁজের চার দিন পর সাগরতীরে মিলল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর লাশ ভবানীপুরে শুভেন্দুর জয়কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মমতা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করলে ইরানে নরক নেমে আসবে: ট্রাম্প বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে চান শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী প্রতিহিংসার মানসিকতা বদলাতে বললেন প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেট ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে : নিপুণ রায়

এআই: ডিজিটাল উপনিবেশবাদের শেকলে আটকে যাচ্ছে মানুষ

আকাশ নিউজ ডেস্ক: 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক প্যারাডক্সের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বিশ্ব। একদিকে সাধারণ মানুষের তৈরি তথ্য, উন্মুক্ত ফোরাম, উইকিপিডিয়া ও গবেষণাপত্র ব্যবহার করে টেক জায়ান্টরা তৈরি করছে তাদের শক্তিশালী এআই মডেল, আর অন্যদিকে সেই সফলতার পর সাধারণ ব্যবহারকারীদেরই সেই প্রযুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। অতি সম্প্রতি মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর তৈরি করা সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল ‘ক্লড ফেবল’ এবং ‘ক্লড মিথোস’ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে খোদ মার্কিন সরকার।

কোনো বিদেশি নাগরিক, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বা বাইরে যেখানেই থাকুন না কেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবেন না। সুরক্ষার যুক্তি দেখিয়ে বলা হচ্ছে, এই মডেলগুলোর ক্ষমতা এতটাই প্রভূত যে তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরণের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফলস্বরূপ, মার্কিন প্রশাসন এখন এআই-কে পারমাণবিক প্রযুক্তি বা স্যাটেলাইট সিস্টেমের মতোই একটি জাতীয় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে বড় বড় এআই কোম্পানির অংশীদারিত্বের যে আলোচনা চলছে, তাতে চীন বা রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো এখন এই এআই প্রযুক্তিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীরই একটি বর্ধিত রূপ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থার পেছনের গল্পটি চরম পরিহাসের। অ্যানথ্রোপিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ডেটা শিট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের পঞ্চম প্রজন্মের এই আধুনিক মডেলগুলো মূলত ইন্টারনেট থেকে স্ক্র্যাপ করা কোটি কোটি সাধারণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। অথচ, মানবজাতির এই যৌথ জ্ঞান ভাণ্ডারকে পুঁজিকৃত করার পর এখন তা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেলা হচ্ছে। ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের একটি বিখ্যাত বক্তব্য এখানে উল্লেখ্য , যেখানে তিনি জ্ঞানকে একটি পণ্য হিসেবে রূপান্তরের কথা বলেছিলেন। ঠিক এই কাজটিই আজ নিখুঁতভাবে ঘটছে। যে জ্ঞান একসময় মুক্ত, বিকেন্দ্রীকৃত এবং সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, তা আজ একচেটিয়া কর্পোরেট ব্ল্যাক বক্সের ভেতরে বন্দি। সেখানে সাধারণ মানুষের আর কোনো অধিকার নেই; সেই প্রক্রিয়াজাত জ্ঞান পেতে হলে এখন বেসরকারি সংস্থাকে চড়া মূল্যে টোল দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এই অবস্থাকে একটি ‘নব্য-সামন্ততান্ত্রিক সমাজ’ ব্যবস্থার সাথে তুলনা করছেন, যেখানে রাষ্ট্র ও কর্পোরেট পরাশক্তিগুলো এক জোট হয়ে একটি বিশেষ জ্ঞান-অভিজাত শ্রেণি তৈরি করছে। তথ্যের চুরির এই আইনি লড়াইয়ে গত বছরই অ্যানথ্রোপিককে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়েছে জলদস্যুতার মতো করে বইপত্র ব্যবহারের অভিযোগে, যা প্রমাণ করে যে এই তথাকথিত বুদ্ধিমত্তার ভিত কতটা প্রশ্নবিদ্ধ।

এই আধিপত্যের খেলা শুধু ডিজিটাল দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের বাস্তব পরিবেশ এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনে। একটি শক্তিশালী এআই মডেল সচল রাখতে প্রয়োজন হচ্ছে বিশাল সব ডেটা সেন্টার, যার জন্য দরকার পড়ে বিপুল পরিমাণ জমি, বিদ্যুৎ এবং পানি। এই পরিকাঠামো গড়ে তোলার হিড়িককে অনেকেই এখন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক সম্পদের লুণ্ঠনের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখছেন। উদাহরণস্বরূপ, ভারত সরকার বৈশ্বিক ক্লাউড পরিষেবা সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করতে ২০ বছরের বিশাল কর ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে, যার লক্ষ্য ভারতকে এআই পরিকাঠামোর একটি বড় হাব হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে ভারতের স্থানীয় কৃষকদের। ডেটা সেন্টারের জন্য জমি ছাড়তে বাধ্য করায় ইতিমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কেবল ভারতেই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া, আইওয়া বা অ্যারিজোনার মতো এলাকাতেও এই পরিবেশগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ও স্থানীয় মানুষের অধিকার হরণ করে যে ডেটা সেন্টারগুলো গড়ে উঠছে, তার চূড়ান্ত মুনাফা চলে যাচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানির পকেটে, আর সাধারণ মানুষকে সেই ডিজিটাল সেবা আবার চড়া দামে কিনে নিতে হচ্ছে। ঔপনিবেশিক আমলের সাথে আজকের এই নব্য-ডিজিটাল উপনিবেশবাদের পার্থক্য শুধু একটাই; আগে সম্পদ লুটের পেছনে জোর খাটানো হতো, আর আজ উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের নামে দেশগুলো স্বেচ্ছায় এই ফাঁদে পা দিচ্ছে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শাহরাস্তিতে ধর্ষণের শিকার শিশু ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, অভিযুক্ত আটক

এআই: ডিজিটাল উপনিবেশবাদের শেকলে আটকে যাচ্ছে মানুষ

আপডেট সময় ০৯:৫০:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

আকাশ নিউজ ডেস্ক: 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক প্যারাডক্সের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বিশ্ব। একদিকে সাধারণ মানুষের তৈরি তথ্য, উন্মুক্ত ফোরাম, উইকিপিডিয়া ও গবেষণাপত্র ব্যবহার করে টেক জায়ান্টরা তৈরি করছে তাদের শক্তিশালী এআই মডেল, আর অন্যদিকে সেই সফলতার পর সাধারণ ব্যবহারকারীদেরই সেই প্রযুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। অতি সম্প্রতি মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর তৈরি করা সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল ‘ক্লড ফেবল’ এবং ‘ক্লড মিথোস’ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে খোদ মার্কিন সরকার।

কোনো বিদেশি নাগরিক, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বা বাইরে যেখানেই থাকুন না কেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবেন না। সুরক্ষার যুক্তি দেখিয়ে বলা হচ্ছে, এই মডেলগুলোর ক্ষমতা এতটাই প্রভূত যে তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরণের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফলস্বরূপ, মার্কিন প্রশাসন এখন এআই-কে পারমাণবিক প্রযুক্তি বা স্যাটেলাইট সিস্টেমের মতোই একটি জাতীয় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে বড় বড় এআই কোম্পানির অংশীদারিত্বের যে আলোচনা চলছে, তাতে চীন বা রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো এখন এই এআই প্রযুক্তিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীরই একটি বর্ধিত রূপ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থার পেছনের গল্পটি চরম পরিহাসের। অ্যানথ্রোপিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ডেটা শিট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের পঞ্চম প্রজন্মের এই আধুনিক মডেলগুলো মূলত ইন্টারনেট থেকে স্ক্র্যাপ করা কোটি কোটি সাধারণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। অথচ, মানবজাতির এই যৌথ জ্ঞান ভাণ্ডারকে পুঁজিকৃত করার পর এখন তা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেলা হচ্ছে। ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের একটি বিখ্যাত বক্তব্য এখানে উল্লেখ্য , যেখানে তিনি জ্ঞানকে একটি পণ্য হিসেবে রূপান্তরের কথা বলেছিলেন। ঠিক এই কাজটিই আজ নিখুঁতভাবে ঘটছে। যে জ্ঞান একসময় মুক্ত, বিকেন্দ্রীকৃত এবং সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, তা আজ একচেটিয়া কর্পোরেট ব্ল্যাক বক্সের ভেতরে বন্দি। সেখানে সাধারণ মানুষের আর কোনো অধিকার নেই; সেই প্রক্রিয়াজাত জ্ঞান পেতে হলে এখন বেসরকারি সংস্থাকে চড়া মূল্যে টোল দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এই অবস্থাকে একটি ‘নব্য-সামন্ততান্ত্রিক সমাজ’ ব্যবস্থার সাথে তুলনা করছেন, যেখানে রাষ্ট্র ও কর্পোরেট পরাশক্তিগুলো এক জোট হয়ে একটি বিশেষ জ্ঞান-অভিজাত শ্রেণি তৈরি করছে। তথ্যের চুরির এই আইনি লড়াইয়ে গত বছরই অ্যানথ্রোপিককে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়েছে জলদস্যুতার মতো করে বইপত্র ব্যবহারের অভিযোগে, যা প্রমাণ করে যে এই তথাকথিত বুদ্ধিমত্তার ভিত কতটা প্রশ্নবিদ্ধ।

এই আধিপত্যের খেলা শুধু ডিজিটাল দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের বাস্তব পরিবেশ এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনে। একটি শক্তিশালী এআই মডেল সচল রাখতে প্রয়োজন হচ্ছে বিশাল সব ডেটা সেন্টার, যার জন্য দরকার পড়ে বিপুল পরিমাণ জমি, বিদ্যুৎ এবং পানি। এই পরিকাঠামো গড়ে তোলার হিড়িককে অনেকেই এখন উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক সম্পদের লুণ্ঠনের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখছেন। উদাহরণস্বরূপ, ভারত সরকার বৈশ্বিক ক্লাউড পরিষেবা সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করতে ২০ বছরের বিশাল কর ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে, যার লক্ষ্য ভারতকে এআই পরিকাঠামোর একটি বড় হাব হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে ভারতের স্থানীয় কৃষকদের। ডেটা সেন্টারের জন্য জমি ছাড়তে বাধ্য করায় ইতিমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কেবল ভারতেই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া, আইওয়া বা অ্যারিজোনার মতো এলাকাতেও এই পরিবেশগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ও স্থানীয় মানুষের অধিকার হরণ করে যে ডেটা সেন্টারগুলো গড়ে উঠছে, তার চূড়ান্ত মুনাফা চলে যাচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানির পকেটে, আর সাধারণ মানুষকে সেই ডিজিটাল সেবা আবার চড়া দামে কিনে নিতে হচ্ছে। ঔপনিবেশিক আমলের সাথে আজকের এই নব্য-ডিজিটাল উপনিবেশবাদের পার্থক্য শুধু একটাই; আগে সম্পদ লুটের পেছনে জোর খাটানো হতো, আর আজ উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের নামে দেশগুলো স্বেচ্ছায় এই ফাঁদে পা দিচ্ছে।