ঢাকা ০৩:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সার্ক কার্যকর করতে বাংলাদেশ-নেপাল একমত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গ্রেফতার রাত ১২টায় পুকুরপাড়ে দেখা করলে মিলবে ফ্যামিলি কার্ড:বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ ৬.৫ টনের শক্তিশালী চুম্বকের সফল পরীক্ষা, বিশাল ‘সূর্য’ বানাচ্ছে চীন ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় নতুন দাবানল নিয়ে শঙ্কায় ফ্রান্স নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কি মির্জা ফখরুলের জুতা টানার যোগ্যতা রাখে: রাশেদ খাঁন ইসিকে স্বাধীনভাবে চোখ কান খুলে দায়িত্ব পালন করতে বলেছি: গোলাম পরওয়ার মধ্য বাড্ডায় গৃহকর্ত্রী হত্যায় গাড়িচালকের মৃত্যুদণ্ড ‘ইরান ভেনেজুয়েলা নয়’, তেহরান-কারাকাস ঐতিহাসিক সম্পর্কে ফাটল সিআইডির নতুন প্রধান ব্যারিস্টার মোশাররফ হোছাইন

৬.৫ টনের শক্তিশালী চুম্বকের সফল পরীক্ষা, বিশাল ‘সূর্য’ বানাচ্ছে চীন

আকাশ নিউজ ডেস্ক:

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে চীন। নিজেদের বহুল আলোচিত ‘কৃত্রিম সূর্য’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সুপারকন্ডাক্টিং ফিউশন ম্যাগনেটের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে দেশটি। চায়না একাডেমি অফ সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অফ প্লাজমা ফিজিক্সে এই শক্তিশালী ডি-শেপড চুম্বকের সফল পরীক্ষাটি চালানো হয়। এটি মূলত পারমাণবিক ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন এবং প্রায় অসীম শক্তি উৎপাদনের যাত্রায় একটি অন্যতম বড় প্রকৌশলগত মাইলফলক।

সূর্যের অভ্যন্তরীণ শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি মূলত পারমাণবিক ফিউশনের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। অতি উচ্চ তাপমাত্রায় হালকা পরমাণুগুলোকে একত্রিত করে অপেক্ষাকৃত ভারী পরমাণু তৈরির মাধ্যমে এই শক্তি উৎপন্ন হয়। পৃথিবীতেও একই প্রক্রিয়ায় জ্বালানি তৈরির লক্ষ্যেই চীন নির্মাণ করছে তাদের এই পরীক্ষামূলক ফিউশন রিয়্যাক্টর। যেহেতু পৃথিবীতে সূর্যের মতো বিশাল অভিকর্ষ বল নেই, তাই ফিউশন বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য রিয়্যাক্টরের ভেতরের প্লাজমাকে প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করতে হয়। তবে এত প্রচণ্ড তাপমাত্রার সুপারহিটেড প্লাজমা কোনো সাধারণ কঠিন পদার্থের স্পর্শে এলে রিয়্যাক্টর গলে যাবে। তাই এই প্রাক-প্লাজমাকে ঘরের বাতাসে ভাসিয়ে রাখতে এবং কোনো দেয়াল স্পর্শ করা থেকে আটকে রাখতে অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করা প্রয়োজন হয়।

এই অদৃশ্য চৌম্বক খাঁচা তৈরির মূল দায়িত্ব পালন করছে নতুন পরীক্ষিত এই বিশাল আকৃতির ডি-শেপড সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকটি। এটি রিয়্যাক্টরে প্রায় ৬.৫ টেসলা শক্তির চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম, যা পৃথিবীর নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্রের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। সুবিশাল এই এককটি ২১ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১২ মিটার প্রস্থ বিশিষ্ট এবং এর ওজন প্রায় ৫৮২ টন, যা এ যাবৎকালে তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সুপারকন্ডাক্টিং ফিউশন ম্যাগনেট। ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক ফিউশন গবেষণা কেন্দ্র ‘আইটিইআর’-এ ব্যবহৃত চুম্বকের তুলনায় এটি প্রায় তিনগুণ বেশি শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে পারে। টানা ৬০ বছর কার্যকরভাবে সেবা দিতে পারার মতো নকশা নিয়ে এই সুপারকন্ডাক্টিং ব্যবস্থাটি তৈরি করা হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকটি হলো এর ভেতরের চরম তাপমাত্রার বৈপরীত্য। যেখানে রিয়্যাক্টরের কেন্দ্রস্থলে ভাসমান প্লাজমার তাপমাত্রা থাকে প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস, ঠিক তার ইঞ্চি খানেক দূরে এই সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকগুলোকে সচল রাখতে মাইনাস ২৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শীতল রাখতে হয়। ভ্যাকুয়াম ইনসুলেশন এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম ক্রায়োজেনিক কুলিং সিস্টেম ব্যবহার করে এই চরম বৈপরীত্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।

এই সাফল্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের প্রভাব বিস্তার। সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে এবং ১০০ শতাংশ দেশীয় উপাদান দিয়ে এই সর্বাধুনিক চুম্বক তৈরি করেছে চীনের প্রযুক্তিবিদরা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিরল সব কাঁচামাল ও প্রযুক্তির জন্য চীনকে এখন আর কোনো বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। এর আগে নিজস্ব প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের ‘ইএএসটি’ রিয়্যাক্টরে ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস প্লাজমা টানা ১,০৬৬ সেকেন্ড ধরে রাখার নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল দেশটি। এ ধরনের সাফল্য চীনকে প্রযুক্তিগত বাজারে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। চীনের মূল লক্ষ্য হলো ২০২৭ সালের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যেই এই কৃত্রিম সূর্যের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সার্ক কার্যকর করতে বাংলাদেশ-নেপাল একমত

৬.৫ টনের শক্তিশালী চুম্বকের সফল পরীক্ষা, বিশাল ‘সূর্য’ বানাচ্ছে চীন

আপডেট সময় ০২:২০:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

আকাশ নিউজ ডেস্ক:

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে চীন। নিজেদের বহুল আলোচিত ‘কৃত্রিম সূর্য’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সুপারকন্ডাক্টিং ফিউশন ম্যাগনেটের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে দেশটি। চায়না একাডেমি অফ সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অফ প্লাজমা ফিজিক্সে এই শক্তিশালী ডি-শেপড চুম্বকের সফল পরীক্ষাটি চালানো হয়। এটি মূলত পারমাণবিক ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন এবং প্রায় অসীম শক্তি উৎপাদনের যাত্রায় একটি অন্যতম বড় প্রকৌশলগত মাইলফলক।

সূর্যের অভ্যন্তরীণ শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি মূলত পারমাণবিক ফিউশনের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। অতি উচ্চ তাপমাত্রায় হালকা পরমাণুগুলোকে একত্রিত করে অপেক্ষাকৃত ভারী পরমাণু তৈরির মাধ্যমে এই শক্তি উৎপন্ন হয়। পৃথিবীতেও একই প্রক্রিয়ায় জ্বালানি তৈরির লক্ষ্যেই চীন নির্মাণ করছে তাদের এই পরীক্ষামূলক ফিউশন রিয়্যাক্টর। যেহেতু পৃথিবীতে সূর্যের মতো বিশাল অভিকর্ষ বল নেই, তাই ফিউশন বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য রিয়্যাক্টরের ভেতরের প্লাজমাকে প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করতে হয়। তবে এত প্রচণ্ড তাপমাত্রার সুপারহিটেড প্লাজমা কোনো সাধারণ কঠিন পদার্থের স্পর্শে এলে রিয়্যাক্টর গলে যাবে। তাই এই প্রাক-প্লাজমাকে ঘরের বাতাসে ভাসিয়ে রাখতে এবং কোনো দেয়াল স্পর্শ করা থেকে আটকে রাখতে অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করা প্রয়োজন হয়।

এই অদৃশ্য চৌম্বক খাঁচা তৈরির মূল দায়িত্ব পালন করছে নতুন পরীক্ষিত এই বিশাল আকৃতির ডি-শেপড সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকটি। এটি রিয়্যাক্টরে প্রায় ৬.৫ টেসলা শক্তির চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম, যা পৃথিবীর নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্রের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। সুবিশাল এই এককটি ২১ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১২ মিটার প্রস্থ বিশিষ্ট এবং এর ওজন প্রায় ৫৮২ টন, যা এ যাবৎকালে তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সুপারকন্ডাক্টিং ফিউশন ম্যাগনেট। ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক ফিউশন গবেষণা কেন্দ্র ‘আইটিইআর’-এ ব্যবহৃত চুম্বকের তুলনায় এটি প্রায় তিনগুণ বেশি শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে পারে। টানা ৬০ বছর কার্যকরভাবে সেবা দিতে পারার মতো নকশা নিয়ে এই সুপারকন্ডাক্টিং ব্যবস্থাটি তৈরি করা হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকটি হলো এর ভেতরের চরম তাপমাত্রার বৈপরীত্য। যেখানে রিয়্যাক্টরের কেন্দ্রস্থলে ভাসমান প্লাজমার তাপমাত্রা থাকে প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস, ঠিক তার ইঞ্চি খানেক দূরে এই সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকগুলোকে সচল রাখতে মাইনাস ২৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শীতল রাখতে হয়। ভ্যাকুয়াম ইনসুলেশন এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম ক্রায়োজেনিক কুলিং সিস্টেম ব্যবহার করে এই চরম বৈপরীত্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।

এই সাফল্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের প্রভাব বিস্তার। সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে এবং ১০০ শতাংশ দেশীয় উপাদান দিয়ে এই সর্বাধুনিক চুম্বক তৈরি করেছে চীনের প্রযুক্তিবিদরা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিরল সব কাঁচামাল ও প্রযুক্তির জন্য চীনকে এখন আর কোনো বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। এর আগে নিজস্ব প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের ‘ইএএসটি’ রিয়্যাক্টরে ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস প্লাজমা টানা ১,০৬৬ সেকেন্ড ধরে রাখার নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল দেশটি। এ ধরনের সাফল্য চীনকে প্রযুক্তিগত বাজারে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। চীনের মূল লক্ষ্য হলো ২০২৭ সালের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যেই এই কৃত্রিম সূর্যের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা।