ঢাকা ০৯:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
এবার দুষ্কৃতকারীদের ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালট ছিনতাইয়ের সুযোগ নেই : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নির্বাচনী মিছিলে অসুস্থ হয়ে বিএনপি নেতার মৃত্যু নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে তুলব: জামায়াত আমির হাসিনা যুগের সমাপ্তি? জয় বললেন ‘সম্ভবত তাই’ ‘দুলাভাই’ ‘দুলাভাই’ ধ্বনিতে মুখরিত সিলেটের আলিয়া মাঠ ভারতে টি-২০ বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত সরকারের বিপুল ভোটে জিতে ১০ দলীয় জোট সরকার গঠন করবে : নাহিদ ইসলাম ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব টেক্সটাইল মিল বন্ধের ঘোষণা ১১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি থাকবে : শফিকুল আলম কারচুপির খেলা খেলার স্পর্ধা যেন কোনো রাজনৈতিক দল না দেখায়: রুমিন ফারহানার হুঁশিয়ারি

মিয়ানমারের ওপর কঠোর অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার আহ্বান

অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধন’ রুখতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর কঠোর অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমারের শাস্তি নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

এইচআরডব্লিউ’র ওয়েবসাইটে গতরাতে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং রোহিঙ্গা ইস্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর কঠোর অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেন তাদের ‘জাতিগত নিধন’ সংক্রান্ত প্রচারণা ও কার্যক্রম বন্ধ করা যায়।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমারের শাস্তি নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, “প্রথমত নিরাপত্তা পরিষদের একটি উন্মুক্ত আলোচনায় বসা উচিত। রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুতেরেসকেও আমন্ত্রণ জানানো উচিত আলোচনায়। যারা এরকম নৃশংস অপরাধ করেছে তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে শাস্তির বিষয় নিশ্চিত করা উচিত পরিষদের।”

তবে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে দ্রুত মিয়ানমারের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও প্রস্তাব দিয়েছে এই মানবাধিকার সংস্থাটি। এইচআরডব্লিউ মনে করছে, “রোহিঙ্গা ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। মিয়ানমারে তাদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত এবং অপরাধী নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা উচিত। সামরিক সহায়তা বন্ধ করা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করা এবং মিয়ানমারের সেনা পরিচালিত ব্যবসাগুলোর আর্থিক লেনদেনও বন্ধ করা উচিত।”

এইচআরডব্লিউ’র বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ সহিংস ভূমিকার কারণে বিশ্বব্যপী নিন্দিত হচ্ছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। এবার দেশটির সেনাবাহিনীর ওপর এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা দরকার যেন কোনোভাবেই সে দেশের জেনারেলরা তা উপেক্ষা করতে না পারেন।”

সীমান্তে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন ৪০০ রোহিঙ্গা নারী

গত দুই সপ্তাহে চার শতাধিক রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার নো ম্যানস ল্যান্ডে। উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপনে হুমকির মুখে পড়েছে এ শিশুদের জীবন। অনেক শিশুই ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে। সন্তান হারানো এমন মায়েদের একজন সুরাইয়া সুলতান।

সীমান্তের ৫০০ গজ দূরের একটি কর্দমাক্ত স্থানে আরো অনেক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর সাথে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় ছিলেন সুরাইয়া। সে সময় তার প্রসব বেদনা শুরু হলে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি তাকে একটি নৌকায় ওঠায়। নৌকার চার দিকে শাড়ি দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়। সেখানেই একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন সুরাইয়া। শিশুটির নাম রাখা হয় আয়েশা।
এরপর অসুস্থ মা ও শিশুকে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয় নয়াপাড়া উদ্বাস্তু শিবিরে। এ শিবিরটির কর্মকর্তা মোমিনুল হক জানিয়েছেন, একই রকম অবস্থায় আরো অনেকে এসেছে এ শিবিরে। তাদের প্রায় সবারই অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। মোমিনুল হক বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো তাদের সহায়তার চেষ্টা করছি, কিন্তু আমাদের সামর্থ্য সীমিত।’

ভয়াবহ এ দুরবস্থার মধ্যেই দিন কাটছে রোহিঙ্গা মা ও নবজাতকদের। অনেক মা সন্তান প্রসবের সময় মারা গেছেন। কোনো সেবা বা সাহায্য ছাড়াই সন্তান জন্ম দিতে হচ্ছে। কারো নবজাতক মারা যাচ্ছে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে। সন্তান হারিয়েছেন মাসুমা বাহাদুর (২৮)। তিনি বলেন, ‘প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে জ্বর এসেছিল আমার সন্তানের। তার স্বামী আবু বকর চিকিৎসা সহায়তার খোঁজে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু ফিরে এসে দেখেন ছেলে আর বেঁচে নেই।’

কাছাকাছি কোনো কবরস্থান না থাকায় আবু বকর নিকটস্থ জঙ্গলে কবর খুঁড়ে তিন দিন বয়সী ছেলেকে দাফন করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরেক রোহিঙ্গা নারী জানিয়েছেন, মৃত্যুর দুই দিন পরও দাফন দেয়ার ব্যবস্থা করতে না পেরে নাফ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন ছেলের লাশ।

বাংলাদেশ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী মনজুর কাদির আহমেদ জানান, যথাযথ খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে মায়ের বুকের দুধও পাচ্ছে না এসব নবজাতকেরা। জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তা ভিভিয়ান তান বলেন, এক লোক কম্বলে মোড়ানো একটি ঝুড়ি নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। ঝুড়ি খুলে দেখলাম তার ভেতর দুই যমজ নবাজাতক। রাখাইন থেকে পালিয়ে আসার সময় পথিমধ্যেই তার স্ত্রী এ সন্তানদের জন্ম দিয়েছেন। তাদের কাছে আসার কিছুক্ষণ পর একটি বাচ্চা মারা যায়।

জাতিসঙ্ঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থলি লেক বলেন, সীমান্তের উভয় পাশে অনেক নারী ও শিশু আছে যাদের জরুরি সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন। মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে সব ধরনের ত্রাণকার্যক্রম নিষিদ্ধ করার কারণে এ বিষয়টিতে বাংলাদেশের এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করে ইউনিসেফ।

গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ক্যাম্প ও একটি সেনা আবাসে কথিত সন্ত্রাসী হামলার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নির্বিচারে গ্রামের পর গ্রামে হামলা-নির্যাতন চালাচ্ছে। নারীদের ধর্ষণ করছে। গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে লুটপাট করছে। সেনাবাহিনীর জুলুম নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে এইচআরডব্লিউ’র বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলতি মাসের প্রথম দিকে একটি স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশের মাধ্যমে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছিল, অন্তত ৭০০ বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তারা স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে কাজ করার সুযোগ দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছিল। গতকালের বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারকে উপনিবেশিক ‘বার্মা’ হিসেবে পরিচিত করেছে।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাড়িতে আগুন দিয়েছে মিয়ানমার সেনারা

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনকে ‘জাতিগত নিধন’ উল্লেখ করে তা বন্ধে বারবার সতর্ক করে আসছে জাতিসঙ্ঘ। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনীর অভিযানকে ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়ে এতে কোনো বেসামরিক লোক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না বলে দাবি করেছে। এ অবস্থায় জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুতারেস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি এই মুহূর্তে সু চি কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি কিভাবে পরিবর্তন আসবে তা নিয়েও ভয়ের কারণ রয়েছে। আর আসলে আমি জানি না সেই ভয়ানক পরিস্থিতির পরিবর্তন কিভাবে আসবে।

এর আগে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থার প্রধান জেইদ রা’দ আল হুসেইন রাখাইনের ঘটনাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞের পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত’ আখ্যা দিয়েছেন।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রহস্যময়ী ফেসবুক পোস্টে কাকে ইঙ্গিত করলেন ওমর সানী?

মিয়ানমারের ওপর কঠোর অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার আহ্বান

আপডেট সময় ০৩:০২:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭

অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধন’ রুখতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর কঠোর অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমারের শাস্তি নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

এইচআরডব্লিউ’র ওয়েবসাইটে গতরাতে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং রোহিঙ্গা ইস্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর কঠোর অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেন তাদের ‘জাতিগত নিধন’ সংক্রান্ত প্রচারণা ও কার্যক্রম বন্ধ করা যায়।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমারের শাস্তি নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, “প্রথমত নিরাপত্তা পরিষদের একটি উন্মুক্ত আলোচনায় বসা উচিত। রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুতেরেসকেও আমন্ত্রণ জানানো উচিত আলোচনায়। যারা এরকম নৃশংস অপরাধ করেছে তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে শাস্তির বিষয় নিশ্চিত করা উচিত পরিষদের।”

তবে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে দ্রুত মিয়ানমারের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও প্রস্তাব দিয়েছে এই মানবাধিকার সংস্থাটি। এইচআরডব্লিউ মনে করছে, “রোহিঙ্গা ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। মিয়ানমারে তাদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত এবং অপরাধী নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা উচিত। সামরিক সহায়তা বন্ধ করা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করা এবং মিয়ানমারের সেনা পরিচালিত ব্যবসাগুলোর আর্থিক লেনদেনও বন্ধ করা উচিত।”

এইচআরডব্লিউ’র বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ সহিংস ভূমিকার কারণে বিশ্বব্যপী নিন্দিত হচ্ছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। এবার দেশটির সেনাবাহিনীর ওপর এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা দরকার যেন কোনোভাবেই সে দেশের জেনারেলরা তা উপেক্ষা করতে না পারেন।”

সীমান্তে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন ৪০০ রোহিঙ্গা নারী

গত দুই সপ্তাহে চার শতাধিক রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার নো ম্যানস ল্যান্ডে। উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপনে হুমকির মুখে পড়েছে এ শিশুদের জীবন। অনেক শিশুই ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে। সন্তান হারানো এমন মায়েদের একজন সুরাইয়া সুলতান।

সীমান্তের ৫০০ গজ দূরের একটি কর্দমাক্ত স্থানে আরো অনেক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর সাথে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় ছিলেন সুরাইয়া। সে সময় তার প্রসব বেদনা শুরু হলে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি তাকে একটি নৌকায় ওঠায়। নৌকার চার দিকে শাড়ি দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়। সেখানেই একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন সুরাইয়া। শিশুটির নাম রাখা হয় আয়েশা।
এরপর অসুস্থ মা ও শিশুকে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয় নয়াপাড়া উদ্বাস্তু শিবিরে। এ শিবিরটির কর্মকর্তা মোমিনুল হক জানিয়েছেন, একই রকম অবস্থায় আরো অনেকে এসেছে এ শিবিরে। তাদের প্রায় সবারই অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। মোমিনুল হক বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো তাদের সহায়তার চেষ্টা করছি, কিন্তু আমাদের সামর্থ্য সীমিত।’

ভয়াবহ এ দুরবস্থার মধ্যেই দিন কাটছে রোহিঙ্গা মা ও নবজাতকদের। অনেক মা সন্তান প্রসবের সময় মারা গেছেন। কোনো সেবা বা সাহায্য ছাড়াই সন্তান জন্ম দিতে হচ্ছে। কারো নবজাতক মারা যাচ্ছে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে। সন্তান হারিয়েছেন মাসুমা বাহাদুর (২৮)। তিনি বলেন, ‘প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে জ্বর এসেছিল আমার সন্তানের। তার স্বামী আবু বকর চিকিৎসা সহায়তার খোঁজে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু ফিরে এসে দেখেন ছেলে আর বেঁচে নেই।’

কাছাকাছি কোনো কবরস্থান না থাকায় আবু বকর নিকটস্থ জঙ্গলে কবর খুঁড়ে তিন দিন বয়সী ছেলেকে দাফন করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরেক রোহিঙ্গা নারী জানিয়েছেন, মৃত্যুর দুই দিন পরও দাফন দেয়ার ব্যবস্থা করতে না পেরে নাফ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন ছেলের লাশ।

বাংলাদেশ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী মনজুর কাদির আহমেদ জানান, যথাযথ খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে মায়ের বুকের দুধও পাচ্ছে না এসব নবজাতকেরা। জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তা ভিভিয়ান তান বলেন, এক লোক কম্বলে মোড়ানো একটি ঝুড়ি নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। ঝুড়ি খুলে দেখলাম তার ভেতর দুই যমজ নবাজাতক। রাখাইন থেকে পালিয়ে আসার সময় পথিমধ্যেই তার স্ত্রী এ সন্তানদের জন্ম দিয়েছেন। তাদের কাছে আসার কিছুক্ষণ পর একটি বাচ্চা মারা যায়।

জাতিসঙ্ঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থলি লেক বলেন, সীমান্তের উভয় পাশে অনেক নারী ও শিশু আছে যাদের জরুরি সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন। মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে সব ধরনের ত্রাণকার্যক্রম নিষিদ্ধ করার কারণে এ বিষয়টিতে বাংলাদেশের এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করে ইউনিসেফ।

গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ক্যাম্প ও একটি সেনা আবাসে কথিত সন্ত্রাসী হামলার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নির্বিচারে গ্রামের পর গ্রামে হামলা-নির্যাতন চালাচ্ছে। নারীদের ধর্ষণ করছে। গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে লুটপাট করছে। সেনাবাহিনীর জুলুম নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে এইচআরডব্লিউ’র বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলতি মাসের প্রথম দিকে একটি স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশের মাধ্যমে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছিল, অন্তত ৭০০ বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তারা স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে কাজ করার সুযোগ দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছিল। গতকালের বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারকে উপনিবেশিক ‘বার্মা’ হিসেবে পরিচিত করেছে।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাড়িতে আগুন দিয়েছে মিয়ানমার সেনারা

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনকে ‘জাতিগত নিধন’ উল্লেখ করে তা বন্ধে বারবার সতর্ক করে আসছে জাতিসঙ্ঘ। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনীর অভিযানকে ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়ে এতে কোনো বেসামরিক লোক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না বলে দাবি করেছে। এ অবস্থায় জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুতারেস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি এই মুহূর্তে সু চি কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি কিভাবে পরিবর্তন আসবে তা নিয়েও ভয়ের কারণ রয়েছে। আর আসলে আমি জানি না সেই ভয়ানক পরিস্থিতির পরিবর্তন কিভাবে আসবে।

এর আগে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থার প্রধান জেইদ রা’দ আল হুসেইন রাখাইনের ঘটনাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞের পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত’ আখ্যা দিয়েছেন।