আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
যানবাহন প্রবেশ-নির্গমন ও চলাচল (ট্রাফিক সার্কুলেশন) সংক্রান্ত নকশা অনুমোদন ছাড়াই রাজধানীর জনসমাগম এলাকায় বহুতল বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। সরকারি দুই সংস্থা গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ এবং গণপূর্ত অধিদফতর এসব ভবনে ৩ হাজার ৮০৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে। ভবনগুলো রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, জিগাতলার বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় অবস্থিত। এ দুই সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও একইভাবে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সেতু বিভাগ (বিবিএ) পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নিয়ম অনুযায়ী, পরিবহন সংশ্লিষ্টতা আছে এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) থেকে ট্রাফিক সার্কুলেশন নকশার অনুমোদন নেয়ার বিধান রয়েছে। ওই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় ভবিষ্যতে গুরুতর সমস্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ডিটিসিএ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রাকিবুর রহমান বলেন, আইনে বহুতল ভবনের পার্কিং সংক্রান্ত নকশা ডিটিসিএ থেকে অনুমোদনের বিধান রয়েছে। কয়েকটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ওই নিয়ম মানা হয়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালে বেসরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে তারাও নকশার অনুমোদন নেয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হবেন। তিনি বলেন, এভাবে অনুমোদন নেয়া না হলে আমরাও জানতে পারছি না, কোন এলাকায় কী পরিমান ভবন আছে এবং সেখানে কতসংখ্যক গাড়ির যাতায়াত রয়েছে। পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনতে এখন থেকে সচেতন হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডিটিসিএর ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানান, পরিবহন ব্যবস্থা সুষ্ঠু ও পরিকল্পিতভাবে সাজাতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদী জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে ডিটিসিএ আইন ২০১২ সালে পাস করা হয়। এসব এলাকায় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিবহন সংশ্লিষ্টতা আছে এমন প্রকল্পের নকশার চূড়ান্ত অনুমোদন ডিটিসিএ থেকে নেয়ার বিধান রয়েছে। অথচ এত বছরেও ডিটিসিএকে শক্তিশালী ও কার্যকর করা যায়নি। এ কারণে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও ডিটিসিএকে পাশ কাটিয়ে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।
জানা গেছে, ট্রাফিক সার্কুলেশন সংক্রান্ত নকশার অনুমোদন ছাড়াই চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। সেগুলোর মধ্যে একটি মিরপুরের ৯ নম্বর সেকশনে অবস্থিত। সেখানে স্বপ্ননগর-১ নামে ১০টি ১৪ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব ভবনে সবমিলিয়ে এক হাজার ৪০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। একইভাবে মিরপুর-১৫ এ জয়নগর আবাসিক এলাকায় সরকারি ও আধা সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৫টি বহুতল ইমারত নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব ভবনে ফ্ল্যাটের সংখ্যা হবে ৫২০টি। মোহাম্মদপুর রিং রোডের পাশে মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটের ‘এফ’ ব্লকে ১৫ তলা ১৫টি ভবন নির্মাণ করছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এসব ভবনে ফ্ল্যাটের সংখ্যা ৯০০টি। এর বাইরে মিরপুরের কালশী রোডের মোড়ে বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা, নকশা ও বিশেষ প্রকল্প উইংয়ের সদস্য বিজয় কুমার মণ্ডল যুগান্তরকে বলেন, ট্রাফিক সার্কুলেশন নকশার অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে- এ তথ্য সঠিক। অনেক আগে যখন প্রকল্প নেয়া হয় তখন ডিটিসিএর কার্যকারিতা ওই অর্থে ছিল না। এছাড়া স্থাপত্য বিভাগ থেকে সরকারি নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী গাড়ি যাতায়াতের সব সুযোগ-সুবিধা রেখেই এসব ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১২ এর ‘গ’ ও ‘চ’ উপধারা অনুযায়ী পরিবহন সংক্রান্ত নকশা ডিটিসিএ থেকে অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ৯ (চ) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্মিতব্য বহুতল ভবন ও আবাসিক প্রকল্পে যানবাহনের প্রবেশ-নির্গমন ও চলাচল (ট্রাফিক সার্কুলেশন) সংক্রান্ত নকশা অনুমোদন ও তদারকি করবে ডিটিসিএ। তবে এ নিয়ম অমান্য করা হলে শাস্তি কী হবে তা আইনে উল্লেখ নেই।
জানা গেছে, একইভাবে গণপূর্ত অধিদফতর রাজধানীর জিগাতলায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৩০৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে কয়েকটি বহুতল ভবন নির্মাণ করছে। এসব ভবনে ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে ২৮৮টি। মিরপুরের পাইকপাড়ায় সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ৪৫৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনে ১২০ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৮৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ভবনগুলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ব্যবহার করবেন। একই এলাকায় কাঠের কারখানা প্রাঙ্গণে ৮৫২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বহুতল কয়েকটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব ভবনে ফ্ল্যাটের সংখ্যা ১ হাজার ৬৪টি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ডিটিসিএ থেকে ট্রাফিক সার্কুলেশন সংক্রান্ত নকশা অনুমোদন নেয়নি এ সংস্থাটি।
ডিটিসিএ সূত্র জানিয়েছে, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও গণপূর্ত অধিদফতরের এসব ভবনগুলো চারলেন বিশিষ্ট রাস্তার পাশে অবস্থিত। ট্রাফিক সার্কুলেশন সংক্রান্ত নকশা অনুমোদন না নেয়ায় যানজট আরও বাড়ছে। সূত্র আরও জানিয়েছে, এসব ভবন থেকে যে পরিমাণ গাড়ি প্রবেশ ও বের হবে তা বিদ্যমান রাস্তায় সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব ফেলবে তা ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট (টিআইএ) এর মাধ্যমে নিরূপণ করা হয়। টিআইএ প্রতিবেদনের বহুতল ভবন ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় সৃষ্ট যানজট নিরসনের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এসব ভবন নির্মাণ করার ক্ষেত্রে টিআইএ করা হয়েছে কী না- তা ডিটিসিএকে অবহিত করা হয়নি।
সড়ক প্রকল্পেও অনুমোদন নেই : মিরপুর ডিওএইচএস গেট-২ থেকে মিরপুর-১২ বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও মজবুতিকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর। এছাড়া রামপুরা ব্রিজ থেকে আমুলিয়া হয়ে ডেমরা সড়ক পর্যন্ত আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এ সংস্থাটি। এ দুটি প্রকল্পই ডিটিসিএভুক্ত এলাকার আওতাধীন হওয়া সত্ত্বেও সংস্থাটির অনুমোদন বা সম্মতি নেয়নি সওজ। একইভাবে রাজধানীর পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়ক থেকে মাদানী এভিনিউ হয়ে সিলেট মহাসড়ক সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প ও কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের পাশে ১০০ মিটার চওড়া খাল খনন ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে রাজউক। এ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অনুমোদনের আগে ডিটিসিএর সম্মতি বা অনুমোদন নেয়া হয়নি। এসব প্রকল্পের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে ডিটিসিএর ১৪তম বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, এসব প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ডিটিসিএ থেকে সম্মতি বা অনুমোদন নেয়া হয়নি। যাতে ডিটিসিএ আইন ও প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের ব্যত্যয় ঘটেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত নকশা ডিটিসিএ থেকে অনুমোদন করা না হলে পরিবহন নেটওয়ার্ক সমন্বয় করা সম্ভব হবে না। এতে ভবিষ্যতে গুরুতর সমস্যা হবে। ওই সভায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























