আকাশ আইসিটি ডেস্ক:
মহাকাশে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। বাঙালি জাতি অধীর অপেক্ষায় আছে কখন এটি উৎক্ষেপিত হবে। একই সঙ্গে জনসাধারণের মনে প্রশ্ন জেগেছে বঙ্গবন্ধু-১ কী ধরনের স্যাটেলাইট। এটি দিয়ে কী কী কাজ করা যাবে।
এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে স্যাটেলাইট কী সে সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক। স্যাটেলাইট হলো কৃত্রিম উপগ্রহ। যা তথ্য সংগ্রহ বা যোগাযোগের জন্য কোনো গ্রহ বা উপগ্রহের কক্ষপথে স্থাপিত হয়। পৃথিবীর কক্ষপথে হাজার হাজার স্যাটেলাইট নিজস্ব কক্ষপথে পরিচালিত হচ্ছে।
টেলিকমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু-১ মূলত কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট। এটি উৎক্ষেপণের পর নিজ কক্ষপথে পরিচালিত হওয়ার পর সম্প্রচার যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। প্রত্যন্ত এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বিস্তৃত করতেও এর ভূমিকা থাকবে।
আকাশে বালাদেশের স্যাটেলাইটটির ফলে টেলিভিশন সম্প্রচার পদ্ধতি আরও সহজতর হওয়ার পাশাপাশি খরচ কমাবে। ফলে খরচ কমবে বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর। আবার বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া নিতে হয় বলে যে বিদেশি মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়, সেটিও আর যাবে না।
মহাকাশ বিজ্ঞান ও নাসার বিভিন্ন আবিষ্কার নিয়ে কাজ করা স্পেস অ্যাপস বাংলাদেশের প্রধান আরিফুল হাসান অপু দৈনিক আকাশকে বলেন, ‘এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি।’
‘স্যাটেলাইটটির গ্রাউন্ড স্টেশন যেহেতু বাংলাদেশেই তাই এটিকে নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ হবে। এই স্যাটেলাইটকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা মহাকাশ বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহী হবে। যার ফলশ্রুতিতে ভবিষ্যতে মহাকাশে এই ধরনের আরও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সহজতর।’
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ন্যানো স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’র সহ-উদ্যোক্তা আবদুল্লা হিল কাফি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর আমরা প্রধান তিনটি সুবিধা পাব। এর প্রথমটা হলো, ডাইরেক্ট টু হোম(ডিটিএইচ) সুবিধা। এই ডিটিএইচ সুবিধার আওতায় ডিশ অ্যান্টেনার মাধ্যমে তার ছাড়াই ঘরে বসে স্যাটেলাইট টেলিভিশন দেখা যাবে।’
‘এর বড় সুবিধাটা পাবে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ব্রডকাস্টিং করার ক্ষেত্রে। এখন দেশি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিদেশি স্যাটেলাইটের ব্যান্ড ব্যবহার করছে। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের চালু হলো টেলিভিশন চ্যানেলগুলো তাদের অনুষ্ঠান সম্পচার করার ক্ষেত্রে খরচ অনেকটাই কমে যাবে। একই ভাবে তারা যখন কোনো একটি স্পট থেকে দর্শকদের জন্য সরাসরি কোনো অনুষ্ঠান, ঘটনা সম্প্রচার করে ক্ষেত্রেও সহায়তা করবে এই স্যাটেলাইট। যেহেতু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ‘সি’ ব্যান্ড ‘কেইউ’ ব্যান্ডের তাই টেলিভিশন সম্প্রচার আরো সহজতর হবে।’
‘স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমরা ইন্টারনেট সেবাটাও পেতে পারব। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট পরিষেবা বিস্তৃত করা যাবে।’
‘ধরুন বান্দরবানে আমরা ব্রডব্যান্ড কেবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট পরিষেবা দিতে পারছি না। সেক্ষেত্রে পাহাড়ি এলাকায় যদি স্যাটেলাইট রিসিভার থাকে তবে আমাদের স্যাটেলাইট থেকে ইন্টারনেট রিসিভ করে ওই এলাকায় বিস্তৃত করতে পারব।’
স্যাটেলাইট বিভিন্ন আকৃতির হতে পারে। প্রত্যেক স্যাটেলাইট এর দুইটি সাধারণ অংশ থাকে। এগুলো হলো অ্যান্টেনা এবং শক্তির উৎস। অ্যান্টেনা তথ্য গ্রহণ ও সংগ্রহের কাজ করে থাকে। সোলার প্যানেল অথবা ব্যাটারি, উভয়েই শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে। নাসা’র স্যাটেলাইটে ক্যামেরা এবং কিছু সেন্সর লাগানো থাকে।
কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপন করার জন্য আলাদা মহাশূন্য যান রয়েছে। একে বলা হয় ‘উৎক্ষেপণ যন্ত্র’। কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপনের ক্ষেত্রে যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মাথা ঘামাতে হয়, তা হলো অভিকর্ষজ ত্বরণ এবং মহাশূন্য যানটির গতির সমতা রক্ষা করা। কারণ অভিকর্ষজ ত্বরণ আমাদের উৎক্ষেপণ যন্ত্রকে পৃথিবীর দিকে টানতে থাকে।
পৃথিবীর কক্ষপথে তিন ধরনের স্যাটেলাইট রয়েছে। এগুলো লো আর্থ অরবিট, মিডিয়াম আর্থ অরবিট এবং জিও স্টেশনারি আর্থ অরবিট। এগুলো সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।
LEO ( Low Earth Orbit ) – পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ১৬০-২০০০ কি.মি. উপরে অবস্থিত। সাধারণত পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইটগুলো এই কক্ষপথে থাকে। পৃথিবী পৃষ্ঠের খুব কাছে থাকায় এই কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন এই কক্ষপথে অবস্থিত।
MEO ( Medium Earth Orbit) – পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ২০০০০ কি.মি. উপরে অবস্থিত। সাধারণত জিপিএস স্যাটেলাইট গুলো এই কক্ষপথে থাকে। এই কক্ষপথের স্যাটেলাইট গুলোর গতিবেগ মন্থর। এই স্যাটেলাইটগুলো পাঠাতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়।
GEO (Geostationary Earth Orbit) – GEO পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ৩৬০০০ কি.মি. উপরে অবস্থিত। এই কক্ষপথে অ্যান্টেনা এর অবস্থান নির্দিষ্ট থাকে। সাধারণত রেডিও এবং টিভি এর ট্রান্সমিশনের কাজে ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট থাকছে ৩৬০০০ কিলোমিটার উপরে। তাই বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট জিও স্টেশনারি আর্থ অরবিট স্যাটেলাইট বলা যায়।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















