ঢাকা ১২:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ওমানে একসঙ্গে বাংলাদেশি ৪ ভাইয়ের লাশ উদ্ধার এসএসসি জানুয়ারিতে এইচএসসি এপ্রিলে করার পক্ষে মত গুলি করে ১৯ লাখ টাকা ছিনতাই: ‎জামায়াত এমপির ভাগ্নে কারাগারে এক মাস বয়সি শিশুকে টিকার পরিবর্তে দেওয়া হলো জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন ইমরান খান পারমাণবিক সুরক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত: প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা সংকট কাটলে টিকার বিষয়ে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফিলিপাইনের সিনেটে গোলাগুলি, সিনেটরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষা ও সেবা নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে চীনকে গ্যারান্টর হিসেবে চায় ইরান

মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ছে প্রবাসীদের, আমিরাতেই একবছরে ২৩১জনের মৃত্যু

অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

নিজ দেশের ভূখন্ড ছেড়ে জীবন জীবিকার তাগিয়ে পরবাসে ঠাই নেন প্রবাসীরা। দেশের মায়া ত্যাগ করে হাজার মাইল দূরে শ্রম বিক্রি করা প্রবাসীরা স্বপ্ন পূরণের আশায় কাজ করেন বছরের পর বছর। সবারই লক্ষ্য থাকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হয়ে ফিরে আসবেন দেশে। অথচ শ্রম বিক্রিতে ব্যস্ত প্রবাসীদের কর্ম ক্ষমতার পাশাপাশি কমতে থাকে আয়ুষ্কাল।

ল্যাম্পপোস্টের আলো দেখে যাদের ভোর হয়, তাদের চোখে রাতও নামে ল্যাম্পপোস্টের আলোতে। মাঝখানে দিনের আলো শুধুই কর্মযজ্ঞে ব্যস্ততা। ৮ থেকে ১২ ঘন্টা কর্মস্থলে ব্যয় করে যখন ঘরে ফেরেন তখনই শুরু হয় নানামুখী চিন্তা। কখনো পারিবারিক চিন্তা, কখনো ভিসার মেয়াদ উর্ত্তীণ হয়ে যাবার চাপ, ভিসা পরিবর্তনের খরচ জোগাতে হিমশম খাওয়া, কখনো বা কোম্পানি বন্ধ হয়ে দেশে ফেরার ভয়। নিদ্রাহীন এসব প্রবাসীদের পেয়ে বসে হৃদরোগ। নিয়তির বিধানে কারো কারো জীবন অবসান ঘটে যায় নিষ্ঠুর পরবাসে।

হৃদরোগ, গাড়ি দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, হত্যা সহ প্রতিবছরেই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হয় হাজারও প্রবাসীর নাম। এ তালিকা লম্বা হয় হৃদরোগে আক্রান্ত প্রবাসীদের নামে। বয়সের ভারে নয় বরং তাজা যুবকরাও হৃদরোগে ঝরে যান অকালে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাইয়ে গত একবছরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শতকরা ৭৭ ভাগ ও ৪৯ ভাগ প্রবাসী মারা গেছেন।

আবুধাবিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) ড. মোহাম্মদ মোকসেদ আলী জানান, গত বছর আবধাবী ও এর অধিনস্থ শহরগুলোতে বিভিন্নভাবে মারা গেছেন ১৪৪ জন প্রবাসী। তাদের মধ্যে ১১১ জনই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

তিনি বলেন, ‘প্রবাসীরা মাত্রাতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বিশেষ করে ভিসার মেয়াদ শেষে নবায়নের চিন্তা, ভাল কর্মসংস্থান না পাওয়া, মাস শেষে ঠিক মত বেতন না পাওয়া সহ পারিবারিক নানা দুশ্চিন্তা তাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।’

দুবাই ও উত্তর আমিরাত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের প্রথম সচিব ( শ্রম) একেএম মিজানুর রহমান জানান, ‘ ‍দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটের অধীনস্থ শহরগুলো গতবছর বিভিন্নভাবে ২৪৪ জন প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হৃদরোগে মারা গেছেন ১২০ জন, সাধারণ মৃত্যু ৫২ জন, সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০জন, কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় ১৩ জন, আত্মহত্যা-হত্যা মিলে ১৯ জন প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে।’

এছাড়াও সৌদি আরবের জেদ্দা কনস্যুলেটের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গত বছর বিভিন্নভাবে সেখানে মারা যায় ৮৩০ প্রবাসী বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে হৃদরোগ ও সাধারণ মৃত্যু ৫৯৯জন, গাড়ি দূর্ঘটনায় ১৭১ জন, আত্মহত্যা ১৯ জন ও অন্যান্য ৪১ জনের মৃত্যু হয়। বাহরাইন মানামা বাংলাদেশ কনস্যুলেটের তথ্য অনুযায়ী সেখানে গতবছর বিভিন্ন ভাবে ১১৩ জন প্রবাসীর মৃত্যু হয়, এতে হৃদরোগ ও সাধারণ মৃতের সংখ্যা ৮২ জন।

প্রবাসীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া প্রসঙ্গে রাস আল খাইমা ফজল ক্লিনিকের পরিচালক ডাক্তার ফজলুর রহমান বলেন, ‘প্রবাসে যারা সিটিং জব করে তাদের মধ্যে বেশির ভাগ হৃদরোগের ঝুঁকি থাকে। বর্তমানে যারা সাধারণ শ্রমজীবি তাদের মধ্যেও হৃদরোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ তারা দেশ থেকে অনেক দূরে থাকে, তাদের মধ্যে সারাক্ষণ দেশের পরিবার পরিজনের জন্যে চিন্তা কাজ করে। আর্থিক অস্বচ্ছলতাও এর জন্যে দায়ী। তবে চর্বিযুক্ত খাবার ও সিগারেট সেবনের প্রবনতাও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।’

তিনি বলেন, ‘ হৃদরোগ ও মৃত্যু ঝুঁকি কমাতে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, অতিরিক্ত চর্বি যুক্ত খাবার বাদ দেয়া, নিয়মিত ব্যায়াম ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা, ব্লাড প্রেসার ও ডায়বেটিস চেক করাসহ প্রবাসীদের সচেতন করতে কমিউনিটি সংগঠনগুলো উদ্যোগি হওয়া প্রয়োজন। সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একটি করে হলেও সচেতনমূলক সেমিনার, প্রশ্ন-উত্তর পর্ব করলে ও প্রবাসীদের হৃদরোগের ঝুঁকি কিছুটা কমে আসতে পারে।’

সবার আগে প্রবাসীদের লাইফস্টাইল ঠিক করার কথা জানান দুবাই বাংলাদেশ স্যোশাল ক্লাবের সভাপতি প্রকৌশলী নওশের আলী। তিনি বলেন, ‘পরিবার পরিজন ছেড়ে প্রবাসে ৮-১০ জন মিলে একই রুমে থাকা, মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করা এগুলো দিন দিন হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবে খাদ্যাভ্যাসও এর জন্যে দায়ী। চাইলেই চর্বি যুক্ত খাবার ছেড়ে দেয়া যায় না। তবে ধীরে ধীরে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

পাশাপাশি ব্যাংক লোনে জড়িয়েও অনেক কষ্টে পড়ে যান প্রবাসীরা। নানামুখী চিন্তার এসব বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কমিউনিটি সংগঠনগুলো সচেতনতামূলক ছোট-খাটো কোর্স নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এতে করে সচেতন প্রবাসীদের কিছুটা হৃদরোগের ঝুঁকি কমে আসবে।’

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ওমানে একসঙ্গে বাংলাদেশি ৪ ভাইয়ের লাশ উদ্ধার

মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ছে প্রবাসীদের, আমিরাতেই একবছরে ২৩১জনের মৃত্যু

আপডেট সময় ০২:৩৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জানুয়ারী ২০১৮

অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

নিজ দেশের ভূখন্ড ছেড়ে জীবন জীবিকার তাগিয়ে পরবাসে ঠাই নেন প্রবাসীরা। দেশের মায়া ত্যাগ করে হাজার মাইল দূরে শ্রম বিক্রি করা প্রবাসীরা স্বপ্ন পূরণের আশায় কাজ করেন বছরের পর বছর। সবারই লক্ষ্য থাকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হয়ে ফিরে আসবেন দেশে। অথচ শ্রম বিক্রিতে ব্যস্ত প্রবাসীদের কর্ম ক্ষমতার পাশাপাশি কমতে থাকে আয়ুষ্কাল।

ল্যাম্পপোস্টের আলো দেখে যাদের ভোর হয়, তাদের চোখে রাতও নামে ল্যাম্পপোস্টের আলোতে। মাঝখানে দিনের আলো শুধুই কর্মযজ্ঞে ব্যস্ততা। ৮ থেকে ১২ ঘন্টা কর্মস্থলে ব্যয় করে যখন ঘরে ফেরেন তখনই শুরু হয় নানামুখী চিন্তা। কখনো পারিবারিক চিন্তা, কখনো ভিসার মেয়াদ উর্ত্তীণ হয়ে যাবার চাপ, ভিসা পরিবর্তনের খরচ জোগাতে হিমশম খাওয়া, কখনো বা কোম্পানি বন্ধ হয়ে দেশে ফেরার ভয়। নিদ্রাহীন এসব প্রবাসীদের পেয়ে বসে হৃদরোগ। নিয়তির বিধানে কারো কারো জীবন অবসান ঘটে যায় নিষ্ঠুর পরবাসে।

হৃদরোগ, গাড়ি দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, হত্যা সহ প্রতিবছরেই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হয় হাজারও প্রবাসীর নাম। এ তালিকা লম্বা হয় হৃদরোগে আক্রান্ত প্রবাসীদের নামে। বয়সের ভারে নয় বরং তাজা যুবকরাও হৃদরোগে ঝরে যান অকালে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাইয়ে গত একবছরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শতকরা ৭৭ ভাগ ও ৪৯ ভাগ প্রবাসী মারা গেছেন।

আবুধাবিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) ড. মোহাম্মদ মোকসেদ আলী জানান, গত বছর আবধাবী ও এর অধিনস্থ শহরগুলোতে বিভিন্নভাবে মারা গেছেন ১৪৪ জন প্রবাসী। তাদের মধ্যে ১১১ জনই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

তিনি বলেন, ‘প্রবাসীরা মাত্রাতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বিশেষ করে ভিসার মেয়াদ শেষে নবায়নের চিন্তা, ভাল কর্মসংস্থান না পাওয়া, মাস শেষে ঠিক মত বেতন না পাওয়া সহ পারিবারিক নানা দুশ্চিন্তা তাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।’

দুবাই ও উত্তর আমিরাত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের প্রথম সচিব ( শ্রম) একেএম মিজানুর রহমান জানান, ‘ ‍দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটের অধীনস্থ শহরগুলো গতবছর বিভিন্নভাবে ২৪৪ জন প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হৃদরোগে মারা গেছেন ১২০ জন, সাধারণ মৃত্যু ৫২ জন, সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০জন, কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় ১৩ জন, আত্মহত্যা-হত্যা মিলে ১৯ জন প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে।’

এছাড়াও সৌদি আরবের জেদ্দা কনস্যুলেটের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গত বছর বিভিন্নভাবে সেখানে মারা যায় ৮৩০ প্রবাসী বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে হৃদরোগ ও সাধারণ মৃত্যু ৫৯৯জন, গাড়ি দূর্ঘটনায় ১৭১ জন, আত্মহত্যা ১৯ জন ও অন্যান্য ৪১ জনের মৃত্যু হয়। বাহরাইন মানামা বাংলাদেশ কনস্যুলেটের তথ্য অনুযায়ী সেখানে গতবছর বিভিন্ন ভাবে ১১৩ জন প্রবাসীর মৃত্যু হয়, এতে হৃদরোগ ও সাধারণ মৃতের সংখ্যা ৮২ জন।

প্রবাসীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া প্রসঙ্গে রাস আল খাইমা ফজল ক্লিনিকের পরিচালক ডাক্তার ফজলুর রহমান বলেন, ‘প্রবাসে যারা সিটিং জব করে তাদের মধ্যে বেশির ভাগ হৃদরোগের ঝুঁকি থাকে। বর্তমানে যারা সাধারণ শ্রমজীবি তাদের মধ্যেও হৃদরোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ তারা দেশ থেকে অনেক দূরে থাকে, তাদের মধ্যে সারাক্ষণ দেশের পরিবার পরিজনের জন্যে চিন্তা কাজ করে। আর্থিক অস্বচ্ছলতাও এর জন্যে দায়ী। তবে চর্বিযুক্ত খাবার ও সিগারেট সেবনের প্রবনতাও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।’

তিনি বলেন, ‘ হৃদরোগ ও মৃত্যু ঝুঁকি কমাতে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, অতিরিক্ত চর্বি যুক্ত খাবার বাদ দেয়া, নিয়মিত ব্যায়াম ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা, ব্লাড প্রেসার ও ডায়বেটিস চেক করাসহ প্রবাসীদের সচেতন করতে কমিউনিটি সংগঠনগুলো উদ্যোগি হওয়া প্রয়োজন। সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একটি করে হলেও সচেতনমূলক সেমিনার, প্রশ্ন-উত্তর পর্ব করলে ও প্রবাসীদের হৃদরোগের ঝুঁকি কিছুটা কমে আসতে পারে।’

সবার আগে প্রবাসীদের লাইফস্টাইল ঠিক করার কথা জানান দুবাই বাংলাদেশ স্যোশাল ক্লাবের সভাপতি প্রকৌশলী নওশের আলী। তিনি বলেন, ‘পরিবার পরিজন ছেড়ে প্রবাসে ৮-১০ জন মিলে একই রুমে থাকা, মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করা এগুলো দিন দিন হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবে খাদ্যাভ্যাসও এর জন্যে দায়ী। চাইলেই চর্বি যুক্ত খাবার ছেড়ে দেয়া যায় না। তবে ধীরে ধীরে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

পাশাপাশি ব্যাংক লোনে জড়িয়েও অনেক কষ্টে পড়ে যান প্রবাসীরা। নানামুখী চিন্তার এসব বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কমিউনিটি সংগঠনগুলো সচেতনতামূলক ছোট-খাটো কোর্স নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এতে করে সচেতন প্রবাসীদের কিছুটা হৃদরোগের ঝুঁকি কমে আসবে।’