কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পাশাপাশি আরও ছয়জন দগ্ধ হন।
রোববার সকাল ১০টার দিকে তদন্ত দলের সদস্যরা উখিয়ার মেরিন ড্রাইভের পাশের ওই রিসোর্টে পৌঁছান। তারা অগ্নিকাণ্ডের কারণ, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও নিবন্ধন সংক্রান্ত নথিপত্র এবং অবকাঠামোগত ত্রুটিসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখেন। তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত কমিটির সদস্যরা একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেন। তদন্তের জন্য পাঁচ কার্যদিবসের বেশি সময়ও লাগতে পারে। কিন্তু রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ আবেদনই করেনি।
তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, অগ্নিকাণ্ডের উৎস ও রিসোর্টের গাফিলতির বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাপ্ত তথ্য ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, এই অগ্নিকাণ্ড ও মৃত্যুর ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে কাজ করছেন তারা। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তারা হলেন দলের সদস্যরা ১০ জনের মৃত্যু ও আগুনের ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
- ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩) – বনশ্রী, ঢাকা; এবং লায়লা জাহান (২৭) – খিলগাঁও, ঢাকা।
- নাফিসতা মীম (২৭) – খিলগাঁও, ঢাকা; এবং ফারিহা কবির (৩৩) – চুয়াডাঙ্গা।
- ফায়িজান আহম্মেদ (৫ বছর বয়সী শিশু)। বাকি চারজনের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তগীন মাহমুদ জানান, দেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় বর্তমানে চাক্ষুষ দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব নয়। চূড়ান্ত পরিচয়ের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হবে। এদিকে, ঘটনায় দগ্ধ আরও ছয়জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর মধ্যে চারজনকে শনিবার বিকেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে এবং বাকি দুজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ঢাকায় ফিরেছেন। ডিএনএ পরীক্ষার পর কোনটি কার লাশ সেটি নিশ্চিত হওয়া যাবে। তাঁরা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯); মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার রাতে উখিয়া থানায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পুলিশ বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করে। মামলার এজাহারে রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর ও নেওয়াজ মোর্শেদসহ চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান জানান, এ ঘটনায় রিসোর্ট ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ ছাড়াও উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন করে প্রতিনিধিকে সদস্য করা হয়। কয়েকজনকে দ্বিতীয়তলা থেকে নিচে লাফ দিতে দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের তথ্যানুযায়ী, শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিসোর্টের ভেতরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এরপরই কাঠের তৈরি তিনতলা ভবনটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ভবনের মেঝে ও সিঁড়িতে কাঠের ব্যবহার থাকায় আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন জানিয়েছেন, সরকারি কোনো অনুমোদন ছাড়াই রিসোর্টটি চলছিল। ফায়ার সার্ভিসের কোনো ছাড়পত্র বা অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা সেখানে ছিল না। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এর আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’। এরপর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠে রিসোর্টটিতে। ভবনের চারপাশের দেয়াল ইট-পাথরের হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় তলার মেঝে কাঠের পাটাতন দিয়ে করা। নিচতলা থেকে ওপরে ওঠানামার সিঁড়িতেও লোহার ফ্রেমে কাঠের তক্তা বিছানো।
রিসোর্টের পাশেই থাকা দোকানদার গিয়াস উদ্দিন জানান, বিস্ফোরণের পর মুহূর্তেই রিসোর্ট দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করে। ধোঁয়ার তীব্রতায় ভেতরে ঢুকে কাউকে উদ্ধার করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। উল্লেখ্য, ২০ শতক জায়গার ওপর নির্মিত এই রিসোর্টটি তিন বছর আগে স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে জমি কিনে নির্মাণ করা হয়েছিল। দোকানের মালিক গিয়াস উদ্দিন (৪০) বলেন, রিসোর্টের আগুনের তাঁর চা-কফির দোকানের একটি ফ্রিজ ও দোকানের কিছু অংশ (কাঠ) পুড়ে গেছে। রিসোর্টের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় থাকা নারী-পুরুষেরা চিৎকার-দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























