মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়ে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান–২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ক্লাস নেওয়া ২০ হাজারেরও বেশি শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো ডিগ্রি নেই। যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব থাকায় অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকদের এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়াতে হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সব মিলিয়ে দেখা গেছে, ২০ হাজারের বেশি শিক্ষক স্নাতকে অন্য বিষয়ে পড়লেও ক্লাস নিচ্ছেন ইংরেজি ও গণিতে। এতে বিদ্যালয়ে যথাযথভাবে পড়াশোনা হয় না। বাকি প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষকের ইংরেজি বিষয়সহ স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষক স্নাতক বা স্নাতকোত্তরে গণিত পড়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি পড়ান এমন ৬৪ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৯ হাজার ৯৮২ জনেরই স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়টি ছিল না। একই চিত্র গণিতের ক্ষেত্রেও। মোট ৬৭ হাজার ৬৯৭ জন গণিত শিক্ষক ক্লাস নিলেও, তাঁদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জনের স্নাতকে গণিত বিষয়ের কোনো পাঠ ছিল না। এমনকি এইচএসসি পাস করা শিক্ষকেরাও অনেক বিদ্যালয়ে পাঠদান করছেন, যা নির্দেশ করে যে বিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতাহীন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যানবেইসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিকে ইংরেজিতে ক্লাস নেন ৬৪ হাজার ২৫৩ শিক্ষক। এ ছাড়া এইচএসসি পাস শিক্ষক আছেন ৪ হাজার ২১২ জন।
শিক্ষকসংকটের এমন বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায় রাজধানীর ১৯০ বছরের পুরোনো ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। এই বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষকের পদ আটটি হলেও কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। গণিত শিক্ষকের ছয়টি পদের বিপরীতে আছেন চারজন। বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক জানান, গণিতের ক্লাসগুলো এখন ভৌতবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষকেরা সমন্বয় করে নিচ্ছেন। বাধ্য হয়ে সামাজিক বিজ্ঞান ও ধর্ম বিষয়ের শিক্ষকদেরও ইংরেজি পড়াতে হচ্ছে।
ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ৪৮৬ জন ছাত্রী থাকলেও শিক্ষক মাত্র দুজন। বর্তমানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক এবং সহকারী শিক্ষক জুলহাস সুজনের ওপরই বিদ্যালয়ের সকল দায়িত্ব। শিক্ষকসংকট মেটাতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অস্থায়ীভাবে ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছে।
শুধু বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার অভাব নয়, শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণের ঘাটতিও এখন বড় উদ্বেগের কারণ। মাধ্যমিক স্তরে কর্মরত শিক্ষকদের প্রায় ৪০ শতাংশেরই বিএড, এমএড বা বিপিএডের মতো কোনো পেশাগত প্রশিক্ষণ বা সনদ নেই। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৬ হাজার ৭৩৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৭ জন, যার মধ্যে মাত্র ৬৫ শতাংশ প্রশিক্ষিত। ২ হাজার ৪৭৪টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার মাত্র ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। এছাড়া ১ হাজার ৫৫৬টি স্কুল অ্যান্ড কলেজে মাধ্যমিক স্তরে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৩৫ শতাংশ শিক্ষকের এ ধরনের প্রশিক্ষণ নেই। ২ হাজার ৪৭৪টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি) শিক্ষক আছেন ২৫ হাজারের বেশি। সব মিলিয়ে মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ রয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী আছে ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি।
এই দুর্বল ভিত্তির প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে। চলতি বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় ১৯ হাজার কমেছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ভালো ফল করতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হচ্ছে। অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে বিদ্যালয়ের বাইরে কোচিং ও প্রাইভেটের পেছনে অর্থ ব্যয় করছেন। ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় পাসের প্রস্তুতি নিতে বিদ্যালয়ের বাইরেও অর্থ খরচ করে কোচিং ও প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে। কুমিল্লা ছাড়া আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে। গণিতেও কয়েকটি বোর্ডে ফল তুলনামূলক ভালো হয়নি। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে এ বছরের এসএসসিতে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ। এমনকি এ বছর পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি, যা গত বছর ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ। দুটি বিষয়ই বাধ্যতামূলক হওয়ায় এগুলোতে অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব পড়েছে সার্বিক পাসের হারে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের অভাব নয়, বিদ্যালয়গুলোতে সার্বিকভাবে শিক্ষকসংকট রয়েছে। তিনি বলেন, দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। শিক্ষার্থীদের গণিত শিক্ষার মানোন্নয়নে ‘খান একাডেমি বাংলাদেশ’-এর সাথে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে শিক্ষা বিষয়ে ডিগ্রিধারীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনে যোগদানের আগেই পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সনদ থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। কেবল স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করলে যথাযথ সামর্থ্য অর্জন করা সম্ভব হয় না। তাই বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























