বিদেশে কর্মসংস্থান করতে গিয়ে পাবনার আল আমিনের অকাল প্রস্থান ঘটেছিল কম্বোডিয়ার একটি টাইলস কারখানায়। সেখানে শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে ১২ এপ্রিল ২০২৫ সালে তার মৃত্যু হয়। তবে মরদেহটি পরিবারের কাছে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় দেড় বছর, যা গত ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে আসে। তার শ্যালক মাসুম খান জানিয়েছেন, কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস না থাকায় মরদেহ খুঁজে পেতে তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল। প্রবাসীদের সহায়তায় স্থানীয় পুলিশের নম্বর সংগ্রহ করে শেষ পর্যন্ত ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডকে সহায়তা করতে হয়েছিল তাদের। দেশটিতে গত আড়াই বছর ধরে কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে আছে। কর্মী যদি দেশ থেকে বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গিয়ে থাকেন বা বিদেশে যাওয়ার পর দূতাবাস থেকে সদস্য নিবন্ধন নেন; তাহলে তাঁর মরদেহ আনার খরচ কল্যাণ বোর্ডের।
বিদেশে কোনো প্রবাসী কর্মী মারা গেলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড মরদেহ দেশে আনার বিষয়টি সমন্বয় করে। তবে অনিয়মিত বা বৈধ নথিপত্রহীন কর্মীদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, অনিয়মিত কর্মীদের মরদেহ দেশে ফেরাতে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে একাধিক দপ্তর থেকে অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে, যদিও আগের তুলনায় এই জটিলতা কিছুটা কমেছে।
২০১৯ সালে দেশে ৩ হাজার ৬৫১ জন প্রবাসীর দেহাবশেষ এসেছিল। ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে এই সংখ্যা ৩ হাজার ১৪০ জনে নেমে আসে, কারণ অনেকেরই মরদেহ স্থানীয়ভাবে দাফন করা হয়েছিল। এরপর ২০২১ সাল থেকে নিয়মিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত—অর্থাৎ মাত্র ২৭৩ দিনে ৪ হাজার ৬০টি মরদেহ দেশে এসেছে, যা দৈনিক গড়ে ১৪টিরও বেশি। ২০২১ সাল থেকে দেশে আসা মরদেহ বাড়তে থাকে।
সবচেয়ে বেশি প্রবাসী কর্মী মারা গেছেন সৌদি আরবে, যেখানে এ বছর মৃতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। এরপরেই রয়েছে মালয়েশিয়ার অবস্থান। অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর মতে, বিদেশ থেকে পাঠানো মৃত্যুর কারণ প্রায় ক্ষেত্রেই ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, আগুন, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া কিংবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো ঘটনায় অনেক কর্মী মারা যান। কেবল ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৫ বছরে ১৮ হাজার ১৬৬ জন প্রবাসীর দেহ দেশে ফিরেছে, যার বড় একটি অংশ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর ঘটনা সবচেয়ে বেশি—প্রায় ২ হাজার ৬৪৯ জন। গত ১৬ জুলাই সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নোয়াখালীর ফয়েজ আহম্মেদ ও তার ছোট ভাই সুজন আহম্মেদ নিহত হন। খেজুর পরিবহনের সময় তাদের গাড়িতে ঘটা এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো দুই ভাইয়ের মরদেহ ২৮ জুলাই দেশে পৌঁছায়। তাদের পরিবার কল্যাণ বোর্ড থেকে দাফন বাবদ ৭০ হাজার টাকা সহায়তা পায়। মরদেহ আনতে এমন হয়রানির ঘটনা অহরহ নয়। করোনাকাল বাদ দিয়ে সাধারণ সময় মৃতের ১ শতাংশের কম দাফন হয় গন্তব্য দেশগুলোতে। এর কোনোটি না থাকলেও বোর্ডে আবেদন করতে পারে পরিবার।
বর্তমানে প্রতিটি মৃতদেহ দাফনের জন্য ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ৩৫ হাজার টাকা নগদ দেয়। এছাড়া আর্থিক অনুদান হিসেবে পরিবারকে ৩ লাখ টাকা এবং বিমার সুবিধা প্রদান করা হয়। এ বছরের প্রথম ৬ মাসে পরিবারগুলোকে প্রায় ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান এবং ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দাফন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে বিদেশ থেকে ক্ষতিপূরণ বা বকেয়া আদায় করার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লাগার অভিযোগ রয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র দাবদাহে কাজ করা প্রবাসীদের স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত তাপ দীর্ঘমেয়াদী কিডনি, হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার সৃষ্টি করে, যা অনেক সময় অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান জানান, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী যুবকদের মধ্যেও মৃত্যুর হার বাড়ছে। প্রতিটি মৃত্যুর কারণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি, যাতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধ করা সম্ভব হয়।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার প্রবাসীদের চিকিৎসা ও মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। অনিয়মিত কর্মীদের জন্যও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বিএমইটির বর্তমান তিন দিনের কর্মশালা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। প্রবাসীদের কর্মঘণ্টা, কাজের ধরন ও প্রতিকূল পরিবেশে সুস্থ থাকার কৌশল নিয়ে আরও ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ১ অক্টোবর প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বাড়ানো হয়েছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

















