আকাশ জাতীয় ডেস্ক :
ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ যদি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়, সেক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে আর দলের নেতৃত্বে নাও দেখা যেতে পারে—এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। সম্প্রতি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার কথা ভাবছেন। পার্টিতে এমনিতেই তার মেয়াদ শেষ। বয়সও হয়েছে।
সাক্ষাতকারে জয় বলেন, ‘আমার মা আসলে দেশে ফিরতে চান। তিনি অবসর নিতে চান। তিনি বিদেশে থাকতে চান না।’
মার্কিন নাগরিক সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটন ডিসিতে তার বাসভবনে এই সাক্ষাতকার নেন আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে জয় বলেন, ‘অবশ্যই আছে। আওয়ামী লীগ কোথাও যাচ্ছে না। এটা সবচেয়ে প্রাচীন ও বড় দল। আমাদের ৪০-৫০ শতাংশ ভোট আছে। আপনি কি মনে করেন ৪০-৫০ শতাংশ মানুষ হঠাৎ সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে দেবে? দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৬-৭ কোটি ভোটার আওয়ামী লীগের। তারা কি হঠাৎ সমর্থন বন্ধ করে দেবে?’
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালান টানা চারবারের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। তিনি ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড সাজা হয়েছে। এমতাবস্থায় দেশে ফিরতে হলে তাকে সাজা ভোগ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, ‘আমি জিজ্ঞেস করছি কারণ আপনি বলেছেন, আপনার মা রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার কথা ভাবছেন। এখন, যদি তিনি কখনো বাংলাদেশে ফিরে যান, তিনি কি আর রাজনীতিতে থাকবেন না?’
উত্তরে জয় বলেন, ‘না, তার বয়স হয়েছে (৭৮ বছর)। এমনিতেই এটা তার শেষ মেয়াদ হত। তিনি অবসর নিতে চাচ্ছেন।’
শ্রীনিবাসন জৈন তখন প্রশ্ন করেন, তাহলে এটাকে কি ‘হাসিনা যুগের সমাপ্তি’ বলা যায়?
শেখ হাসিনার ছেলে জয় বলেন, ‘সম্ভবত তাই।’
এই সাংবাদিক আবারও প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে আপনি বলছেন যে আওয়ামী লীগ যদি আবার বাংলাদেশে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়, তাকে (শেখ হাসিনা) ছাড়াই সেটা হবে?’
জয় বলেন, ‘হ্যাঁ। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। এটা সবচেয়ে পুরনো দল। ৭০ বছর ধরে আছে। তাকে (শেখ হাসিনা) সঙ্গে নিয়ে অথবা তাকে ছাড়াই এ দল চলবে। তিনি… কেউ তো চিরদিন বাঁচে না।’
ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন শেখ হাসিনা। তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী। জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারছে না।
দলের অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা বর্তমানে দেশের বাইরে আত্মগোপনে আছেন। যারা দেশে ছিলেন, তাদের অনেকে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের অধীনে ১৫ বছরে যে তিনটি নির্বাচন হয়েছে, তার সবগুলোই নানা অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সে সময় জামায়াতে ইসলামী ছিল নিষিদ্ধ। আর এখন আওয়ামী লীগের কার্যকম নিষিদ্ধ, আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারছে না।
সে প্রসঙ্গ ধরে শ্রীনিবাসন জৈন প্রশ্ন করেন, ‘আপনি একমত হবেন, সার্বিকভাবে রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ একটি বাজে ধারণা। বহু মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাও তাই বলে। কিন্তু এখানে কি এক ধরনের আয়রনি নেই? আপনি যখন কারচুপির নির্বাচন ও অনিয়মের অভিযোগ করেন, ঠিক সেই অভিযোগ তো বছরের পর বছর ধরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে।’
ওই অভিযোগ থাকার কথা মেনে নিয়েই জয় তার উত্তরে বলেন, আওয়ামী লীগ ‘কখনো কাউকে’ নিষিদ্ধ করেনি। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল আদালতের সিদ্ধান্তে।
আওয়ামী লীগের সময়ের নির্বাচনগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও জাতিসংঘের সমালোচনার বিষয়গুলো সামনে আনলে সজীব ওয়াজেদ জয় ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের জরিপের কথা তোলেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের জরিপ, আমেরিকানদের জনমত জরিপ—সবই দেখাচ্ছিল আওয়ামী লীগ বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবে। আমাদের কারো কোনো অনিয়মের প্রয়োজন ছিল না। প্রশাসনের ভেতরে কিছু লোক নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে এসব করেছে। দলীয় দিক থেকে আমার মা ও আমি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম।’
‘আমরা একটি পরিচ্ছন্ন নির্বাচন চেয়েছিলাম, কারণ আমরা যে কোনোভাবেই জিততে যাচ্ছিলাম। আমাদের জনমত জরিপ—আমি নিজেই আমাদের দলের জন্য জরিপ পরিচালনা করি—আমরা ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে জরিপ করেছিলাম, যেগুলো ছিল মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। ওই ১৬০টি আসনে আমাদের সর্বনিম্ন জয়ের ব্যবধান ছিল ৩০ শতাংশ। তাই কোনোভাবেই এর প্রয়োজন ছিল না।’
জয় দাবি করেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে কোনো ‘কারচুপি হয়নি’। বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটা ‘দুর্ভাগ্যজনক’।
সজীব ওয়াজেদ জয় এর আগে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন ‘হতে দেওয়া হবে না’। সরকার যদি দমন–পীড়ন চালায়, তাহলে তা ‘সহিংসতার দিকে যাবে।’
সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার একটি কারণ হিসেবে সরকার বলছে, আপনারা এসব নির্বাচনে সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছেন। আর সেটি কি সত্য নয়? কারণ আপনি সাক্ষাতকারে বলেছেন…’
জবাবে জয় বলেন, ‘দেখুন, যখন কাউকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলা হয়, তখন আর কী… কী হবে? আমরা সহিংসতা চাই না। আমাদের তো প্রতিবাদ করতেও দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ কী সহিংসতা করছে?’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের ওপর নিপীড়নের পাল্টা অভিযোগ এনে জয় বলেন, ‘গত বছরের জুলাইয়ের আন্দোলনের পর থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের শত শত কর্মী নিহত হয়েছেন। ত্রিশের বেশি মানুষ হেফাজতে মারা গেছেন। মাত্র গত সপ্তাহেই আমাদের দলের এক সংখ্যালঘু নেতা, একজন হিন্দু ভদ্রলোক, কারাগারে হেফাজতে নিহত হয়েছেন।’
‘আপনি বলছেন, ভুলকে ভুল দিয়ে ঠিক করা যায় না। আবারও বলছি, যখন কাউকে বলপ্রয়োগ করে দমন করা হয়, কোনো বিকল্প না রাখা হয়, তখন কী হবে?’
শ্রীনিবাসন জৈন তখন বলেন, ‘কিন্তু জনাব ওয়াজেদ, আপনি কি মনে করেন না, এই ধরনের বক্তব্য (সহিংসতার পথে যাবে) ব্যবহার করে আপনি আসলে সেই ধারণাকেই সমর্থন করছেন যে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা উচিত? কারণ আপনি সহিংসতার এই হুমকিটা সামনে রাখছেন—আমাদের ভোট করতে দিন, নইলে…।’
জয় উত্তরে বলেন, ‘আমি সহিংসতার হুমকি দিইনি। আমি বলেছি, আমাদের যদি সহিংসভাবে দমন করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সহিংসতা হবে। আমি আমার কর্মীদের হামলা করতে বলিনি।’
আল জাজিরার সাংবাদিক তখন ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনা এবং তাতে আওয়ামী লীগ কর্মীর জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করেন।
তিনি বলেন, ‘এটা কি সত্যি? তার হত্যার পেছনে কি আওয়ামী লীগের হাত ছিল?’
সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘অবশ্যই না। দেখুন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মত সক্ষমতা যদি আমাদের থাকত, তাহলে আপনি কি মনে করেন এই রেজিম (অন্তর্বর্তী সরকার) এখনো টিকে থাকত?’
শেখ হাসিনার ছেলে দাবি করেন, হাদি হত্যার পেছনে আওয়ামী লীগ নেই, এমন সহিংস লোকজন আওয়ামী লীগের ‘নেই’, হয়তো অন্য সংগঠনের থাকতে পারে।
হাদিকে গুলি করার জন্য যাকে দায়ী করা হচ্ছে, সেই ফয়সাল করিম মাসুদ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশের ভাষ্য। মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের কড়া সমালোচক ছিলেন হাদি, সে কারণেই তাকে হত্যা করা হয়, এটি ছিল ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধের’ ঘটনা।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জয় বলেন, ‘শুটার কে, তা আমি জানি না। এ বিষয়ে অনেক নাম সামনে এসেছে। তারা এমন অনেকের নাম বলেছে, যাদের এর সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। আমাদের ছাত্রসংগঠনের কথা যদি বলেন, বিশেষ করে আমরা যখন সরকারে ছিলাম, তখন এর সঙ্গে অসংখ্য তরুণ যুক্ত ছিল। সে (ফয়সাল) কি সত্যিই যুক্ত ছিল? কতটা যুক্ত ছিল? তার কি কোনো পদ ছিল? সবকিছুর দায় তারা আওয়ামী লীগের ওপর চাপাচ্ছে।’
শ্রীনিবাসন তখন বলেন, ‘কিন্তু এই ধারণা করা কি যুক্তিসংগত নয় জনাব ওয়াজেদ? কারণ একদিকে আপনি সহিংসতার সম্ভাবনা, সহিংসতার হুমকির কথা বলছেন, আর অন্যদিকে বাস্তবেই একটি সহিংস ঘটনা ঘটেছে।’
জয় তখন বলেন, তার সহিংসতার কথা এসেছে ‘প্রতিবাদ থেকে’।
‘আপনি কি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে রাস্তায় নামতে দেখছেন? সেটাই তো হচ্ছে না। আমাদের দশ হাজারের বেশি মানুষ কারাগারে। আমরা যখনই প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছি, তখনই সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নয়। এখন আমাদের প্রচারণা হল—এই কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনে মানুষ যেন ভোট না দেয়। আমরা সেটাই করছি।’
জুলাই হত্যাকাণ্ড ও দায় প্রশ্ন-
জয়ের কাছে শ্রীনিবাসন জানতে চান, চব্বিশের অভ্যুত্থান দমানোর ‘নির্মম’ চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়। এসবের জন্য কোনো অনুশোচনা আছে কি না।
জবাবে শেখ হাসিনার ছেলে বলেন, ‘সেটা সত্য নয়। আপনি যদি অনলাইনে আমার বক্তব্য শুনে থাকেন, দেখবেন আমি বারবার বলেছি—আওয়ামী লীগ ঠিকমত বিক্ষোভ সামলাতে পারেনি। আমাদের সরকার মিসহ্যান্ডেল করেছে।’
আল জাজিরার সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, যেখানে ‘শেখ হাসিনার নির্দেশে’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শত শত নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে, সেখানে ‘মিসহ্যান্ডেলড’ শব্দটি কি অনেক বেশি নমনীয় নয়?
সজীব ওয়াজেদ জয় দাবি করেন, এর কোনো কিছুই তার মায়ের নির্দেশে হয়নি।
জয় বলেন, ‘আমার মা যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে চাইতেন, তাহলে তিনি এখনো ক্ষমতায় থাকতেন। ইরানে এখন যা ঘটছে, সেটাই দেখুন। তারা কি কিছু করতে পারছে? না।’
৫ অগাস্ট সরকারপতনের দিনের কথা তুলে ধরে জয় বলেন,‘আমার মা বারবার বলেছেন—সেদিন আমার সঙ্গে আলাপেও তিনি বলছিলেন, ‘তারা (বিক্ষোভকারীরা) প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। আমাদের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রধানমন্ত্রীর দেহরক্ষীরা তাকে রক্ষা করতে প্রস্তুত। কিন্তু যদি সেটা ঘটে, শত শত মানুষ মারা যাবে। আমি তাদের রক্ত আমার হাতে নিতে চাই না।’
‘এটাই আমার মায়ের কথা। ওই সময়ে শত শত পুলিশ সদস্য নিহত হন। আমাদের শত শত কর্মীও নিহত হন। এই রেজিম (অন্তর্বর্তী সরকার) আসলে বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দিয়েছে…।’
আল জাজিরার প্রতিবেদন, বিবিসির প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন অডিও রেকর্ডের প্রসঙ্গ টেনে শ্রীনিবাসন জৈন প্রশ্ন করেন, ‘সেগুলোর কথা কীভাবে অস্বীকার করবেন? সেখানে আপনার মাকে বলতে শোনা গেছে, তিনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি তো পুরোপুরি ওপেন অর্ডার দিয়ে দিয়েছি। এখন ওরা মারবে, যেখানে পাবে সেখানে গুলি করবে।’
জবাব দিতে গিয়ে জয় দাবি করেন, আল জাজিরা ও বিবিসি পুরো ক্লিপ শোনায়নি, ফলে সেখানে প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হয়নি।
জয় বলেন, ‘আমি পুরো ক্লিপটি আমার ফেইসবুক পেজে দিয়েছিলাম। সেখানে তিনি বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতার এবং জানমাল ও সম্পত্তি রক্ষায় সশস্ত্র জঙ্গিদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। সেখানে জঙ্গিরা জড়িত ছিল। অনলাইনে এমন ভিডিও আছে, যেখানে বেসামরিক লোকদের অস্ত্রসহ দেখা যায়।’
শ্রীনিবাসন বলেন, জয়ের ফেইসবুক পেইজ খুঁজে ওইরকম কোনো অডিও ক্লিপ তিনি পাননি। জয় তখন তাকে বলেন, ওই অডিও ক্লিপ তিনি আবার প্রকাশ করবেন।
জয় যেখানে বলছেন, জানমাল রক্ষায় শেখ হাসিনা ওই নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে মিলছে কিনা, সেই প্রশ্ন রাখেন আল জাজিরার সাংবাদিক।
উত্তরে জয় বলেন, ‘সেটা (ওই নির্দেশ) ছিল সহিংস বিক্ষোভকারী, সশস্ত্র বিক্ষোভকারী, সন্ত্রাসীদের জন্য। নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের জন্য নয়। এখন বলুন তো, কোনো দেশে যদি সশস্ত্র বিক্ষোভকারীরা মানুষ ও পুলিশকে গুলি করতে থাকে, তাহলে আইনের দৃষ্টিতে সরকার কী করবে?’
সাক্ষাতকারের এ পর্যায়ে শ্রীনিবাসন জৈন প্রশ্ন করেন, তাহলে আবু সাঈদ, জোবায়েদ হোসেন ইমন, মীর রহমান মুগ্ধের মত নিরস্ত্র তরুণরা, যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন, তারাও উগ্রবাদী কিনা।
উত্তরে জয় বলেন, ‘পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত সহিংস ছিল। কিছু পুলিশ সদস্য অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন। আমাদের সরকারের আমলে সে সময় অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তদন্তের জন্য আমরা একটি বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করেছিলাম। সেই তদন্তগুলো কেন আর এগোয়নি?’
জয় কিংবা তার মা শেখ হাসিনা নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত কিনা-সেই প্রশ্ন রাখা হয় সাক্ষাতকারে।
উত্তরে জয় বলেন, আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পরপরই তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তার মা, তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জয় বলেন, ‘আমাদের সরকারের পতনের আগে তিনি এসব পরিবারের কয়েকটির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি পূর্ণ তদন্ত ও পূর্ণ জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।’
যখন বলা হল, জুলাই আন্দোলনে কেবল ওই কয়েকজন নন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হওয়ার তথ্য এসেছে এবং তাদের বেশিরভাগই ছিলেন ‘নির্দোষ, নিরস্ত্র বিক্ষোভকারী’, তখন জয় বলেন, সরকারের হিসাব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা প্রায় ৮০০।
‘১,৪০০ সংখ্যাটি ধরা হয়েছে ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত। আমাদের সরকার পতন হয় ৫ অগাস্ট। ৫ অগাস্ট থেকে ১৫ অগাস্টের মধ্যে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের কে হত্যা করেছে?’
সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘আমাদের সরকার পতনের পর যে ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছে, তাদের কী হবে? তাদের কে হত্যা করেছে? কারা তাদের মেরেছে?’
বিচার ‘সবার জন্য সমান’ হতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘একতরফা বিচার হতে পারে না। একতরফা বিচার মানেই বিচার নয়।’
শ্রীনিবাসন তখন জানতে চান, সেই বিচার তখনকার সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে কিনা, কারণ জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তখনকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশনায় বিক্ষোভকারীদের ওপর যে গুরুতর নিপীড়ন চালানো হয়েছে, আর সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে শেখ হাসিনাও আছেন।
জবাবে জয় বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি। আমি জানি, জাতিসংঘের প্রতিবেদন পক্ষপাতদুষ্ট। আবারও বলছি, জাতিসংঘের প্রতিবেদন ১,৪০০ মৃত্যুর কথা বলেছে। এর মধ্যে আমাদের সরকার পতনের পরের মৃত্যুগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং সেগুলোর দায়ও আমাদের সরকারের ওপর চাপানো হয়েছে। এটা কীভাবে ন্যায্য প্রতিবেদন হতে পারে?’
তাহলে কি সেসব হত্যাকাণ্ড, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ‘অপব্যবহারের’ জন্য শেখ হাসিনা একেবারেই দায়ী নন?
এই প্রশ্নে জয় বলেন, ‘আমি মোটেও সেটা বলছি না। আমি যা বলছি তা হল—আমরা কাউকে দায়মুক্তি দিইনি। আমরা সবার জন্য বিচার চেয়েছি। যে কেউ যদি কোনো মৃত্যুর জন্য দায়ী হয়ে থাকে।’
শেখ হাসিনাও সেই বিচারের আওতায় আসতেন কিনা-এমন প্রশ্নে তার ছেলে বলেন, ‘আমার মা কোনো হত্যার নির্দেশ দেননি। আমার মা কোনো মৃত্যু চাননি।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















