ঢাকা ০৮:৩০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কীভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয় বিএনপি জানে : তারেক রহমান গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে: সিইসি গাজীপুরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ২৪ লাখ টাকা ছিনতাই ডাকসু নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য জামায়াত নেতার, বিক্ষোভে উত্তাল ঢাবি ভোট দেখতে বিদেশ থেকে আসবে ৫০০ সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক জনগণকে সাবধানে নেতা বাছাই করার পরামর্শ দিলেন রুমিন ফারহানা বাড়ল মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এমপিদের ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি সুবিধা নেওয়া বন্ধ করতে হবে: হাসনাত আব্দুল্লাহ ‘সাকিবকে খেলার জন্য বিবেচনা করা ক্রিকেট বোর্ডের স্টান্টবাজি,’ বললেন আমিনুল হক কোন ষড়যন্ত্র বিএনপির বিজয় ঠেকাতে পারবে না: দুলু

এনআইডি থাকলেই প্রবাসীদের ভোট দেয়ার বিষয়টি সহজ হবে: সিইসি

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান ও ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে একটি সেমিনার বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) আয়োজিত এই সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, প্রথমে প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেয়া নিশ্চিত করতে হবে। এনআইডি থাকলেই প্রবাসীদের ভোট দেয়ার বিষয়টি সহজ হবে বলে মনে করেন তারা।

সেমিনারের প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান নির্বচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরূল হুদা। তিনি বলেন, বর্তমান কমিশন প্রবাসী ভোটার করতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। দেশের সন্তানরা বিদেশে অবস্থান করে দেশকে সমৃদ্ধশালী করছেন। তাদের কীভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগে সাহায্য করা যায়, কীভাবে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া যায় সে বিষয়ে আপনাদের মতামত প্রবাসীদের ভোট করার জন্য কাজে লাগবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘প্রবাসীদের একটি সমস্যা সমাধান করলেই হয়, সেটা হলো তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার বিষয়। এটা নিশ্চিত করা গেলে তারা অটোমেটিক জাতীয় পরিচয়পত্র পাবে। অন্যান্য সুবিধাও পাবে।’

সাখাওয়াত বলেন, ‘১২০টি দেশে তাদের প্রবাসীদের ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। এর মধ্যে এশিয়ার আছে ২০টি দেশ।’ তিনি বলেন, ‘প্রবাসীদের ভোট দেয়ার ব্যাপারে ২০০৮ সালে আইনি কাঠামো করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর পাঁচ বছর এটা নিয়ে আর কাজ করা হয়নি। তাই আমি নির্বাচন কমিশনকে বলবো, প্রবাসীদের কীভাবে ভোটার করা যায় সেজন্য একটি সেল গঠন করুন। প্রবাসীদের ভোট করার বিষয় তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। কারণ আগামী নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার বিষয়টি কাজ করবে না।’

সাবেক কূটনীতিক শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রবাসীদের প্রথমে জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে হবে। এরপর দেখতে হবে কীভাবে তারা ভোট দিতে পারে। কারণ জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় অনেক প্রবাসী জমি ক্রয়-বিক্রয়সহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়ে। তারা দেশে এসে বিভিন্ন সেবা পেতে হয়রানির শিকার হয়।’

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান বলেন, ‘দ্বৈত নাগরিকদের ভোট দেয়া সংবিধান অনুমতি দেয়নি। এজন্য এটা আলোচনা না করাই ভালো। প্রবাসীদের ভোট দেয়ার অধিকার, তাদের কীভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা যায় সেটা আলোচনা করা দরকার।’

এ সময় পোস্টাল ভোট বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটুকু কার্যকর তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন মশিউর। বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে কে ভোট দিয়েছে তা শনাক্তকরণ দুরূহ।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মহাপরিচালক কনসুলার নাহিদা রহমান সুমনা জানান, প্রবাসীদের সংখ্যা এখন দেড় কোটি। তারা দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছে। তাদের ভোটের অধিকার দেয়া আমাদের দায়িত্ব। তবে দ্বৈত নাগরিকদের নিয়ে ভাবতে হবে।

এই কর্মকর্তা বলেন, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারতে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) পদ্ধতি চালু আছে। এ পদ্ধতিতে কীভাবে ভোট নেয়া যায় সেটাও আমাদের দেখতে হবে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্বাহী পরিচালক ড. ইয়ামিন আকবরি বলেন, ‘এক কোটি ১৫ লাখ আমাদের প্রবাসী। এর ৩০ শতাংশ রয়েছে সৌদি আরবে। দেখা যায় অনেক প্রবাসী জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকার কারণে তাদের সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে। তারা ব্যাংকিং সুবিধা, ড্রাইভিং লাইসেন্স না পাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছে। অনেক সময় প্রবাসীরা দুর্ঘটনায় পড়ে। সে সময় তাদের সহায়তা করতেও আমাদের সমস্যা হয়। বিশেষ করে যারা ২০০০ সালের আগে বিদেশে গিয়েছে তারা। কারণ তাদের বেশির ভাগেরই জাতীয় পরিচয়পত্র নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি মিশন প্রধান মাহবুব হাসান সালেহ বলেন, ডুয়েল সিটিজেনদের যেহেতু নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার নেই তাই তিনি ভোটারও হতে পারবে না। প্রথমে যারা দ্বৈত নাগরিক নয় তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হোক।

সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, প্রবাসীদের প্রথমে প্রয়োজন তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)। এটা করতে একটা সময় নির্ধারণ করুন। আমি দেখেছি এনআইডি না থাকার কারণে প্রবাসীদের দেশে টাকা পাঠাতেও সমস্যা হচ্ছে। তারা দেশে এসেও পদে পদে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, প্রবাসীদের এনআইডি যেন দেয়া হয় সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, কি-নোট পেপারে (নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক উপস্থাপন করেন) দেখানো হয়েছে আমাদের প্রবাসী ৭৫ লাখ। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে আবার আরেক তথ্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দিল আরেক তথ্য। তিনটি প্রতিষ্ঠানই কিন্তু সরকারি। আসলে আমাদের প্রবাসী কত। ১০ থেকে ১৫ হাজার হেরফের না হয় মানা যায়। তাই বলে ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার পার্থক্য এটা কীভাবে হয়।

নজরুল ইসলাম বলেন, প্রবাসীদের সঠিক তালিকা করে তারা যেন ভোট দিতে পারে সে ব্যবস্থা আমদের করতে হবে। আমাদের সংবিধানে সব নাগরিকের ভোট দেয়ার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও আমরা সে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। প্রবাসীদের ভোট দেয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারিনি। আমরা কিন্তু প্রবাসীদের টাকা কীভাবে আনবো সেই পদ্ধতি ভালোভাবেই চালু করেছি। কিন্তু আমাদের উচিত ছিল টাকা আনার সঙ্গে সঙ্গে তারা যেন ভোট দিতে পারে সে ব্যবস্থা করার। আমাদের এখন আর এ ব্যাপারে সময় নষ্ট করা যাবে না দ্রুত প্রবাসীদের ভোট দেয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তবে কীভাবে তারা ভোট দেবে এটা নিয়ে আমাদের আরও আলোচনা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে যারা এ বিষয়ে যে দেশগুলো সফল হয়েছে তাদের কাছ থেকে আমরা পরামর্শ নিতে পারি।

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, পোস্টাল ভোট পদ্ধতিটা প্রথমে আমরা প্রয়োগ করে দেখতে পারি।

প্রসঙ্গত, পোস্টাল ভোট পদ্ধতিতে একজন প্রবাসী তার পছন্দমত যেকোনো জায়গা থেকে ভোট দিতে পারেন। আবেদন করলে ওই ঠিকানায় আগে থেকে ব্যালট পেপার সরবরাহ করে নির্বাচন কমিশন। ভোট দেয়ার পর তা দেশে ডাকযোগে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ পদ্ধতি প্রবাসীদের জন্য ২০০৮ সাল থেকে চালু আছে। যদিও এটা সম্পর্কে মানুষ জানে না এবং এর প্রয়োগও তেমন হয় না।

অনুষ্ঠানে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।

প্রবাসী ভোটারধিকারের বৈশ্বিক পরিস্থিতি

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক সাইদুল ইসলাম সেমিনারে কি-নোট পেপারে বলেন, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে দূতাবাসে একটি কক্ষে লোকাল সার্ভার স্থাপন; প্রবাসীদের সংখ্যানুপাতে রেজিস্ট্রেশন টিম তৈরি করে কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং নিবন্ধন কাজের জন্য যন্ত্রপাতি ও দক্ষ আইটি কর্মকর্তা নিয়োগে করতে হবে।

সাইদুল ইসলাম বলেন, আলবেনিয়া, কম্বোডিয়া, কিউবা, ইফিওপিয়া, গ্রিস লাইবেরিয়া, উগান্ডাসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের ভোটের বিধান নেই।

ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ বিদেশে অবস্থানত নাগরিকদের জন্য ভোট চালু করার পর বিলুপ্ত করেছে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে ভুটান, ভারত, মালদ্বীপে বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের ভোটের ব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাজ্যে চালু রয়েছে প্রক্সি ও পোস্টাল ভোট। ১০০ বছর আগে তারা এই ব্যবস্থা চালু করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৪৯ সাল থেকে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ চালু আছে। বর্তমানে ডাকযোগে ও ব্যক্তিগতভাবে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট দেওয়ার বিধান চালু আছে। আফগানিস্তান, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় প্রবাসীদের ভোটের বিধান নেই।

প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ সংক্রান্ত সুপারিশ তুলে ধরে সাইদুল ইসলাম বলেন, প্রবাসী নাগরিকদের প্রবাসেই ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করা, প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের ভোটাধিকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করার জন্য ব্যাপক প্রচারণার ব্যবস্থা নেয়া, ভোটাধিকার ব্যবস্থা প্রবর্তনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন এবং বিদ্যামান আইন/বিধি সংশোধন করে উপযুক্ত আইনি কাঠামো তৈরি করা, প্রবাসে ভোট গ্রহণের সুবিধা-অসুবিধা বিস্তারিত পরীক্ষা নিরীক্ষাপূর্বক একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রবাসে ভোটগ্রহণের বিষয় বিবেচনা করা এবং ভবিস্যতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া।

প্রসঙ্গত, ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর এটিএম শামসুল হুদার কমিশন ২০০৮ সালে এবং কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন কমিশন ২০১৪ সালে দুই দফা প্রবাসীদের ভোটাধিকার দেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নেয়। কিন্তু পরে আর তা বাস্তবায়িত হয়নি।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকরা দেশে এলে জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা, আদালতে মামলাসংক্রান্ত সমস্যা, মানি লন্ডারিং বা দুর্নীতিসংক্রান্ত সমস্যা, দেশে বৈধ নাগরিকত্বের প্রমাণ, ব্যাংক হিসাব খোলা ও আর্থিক লেনদেন করা, মোবাইল সিম কেনা, সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, কর ও রাজস্ব প্রদান, ব্যবসা পরিচালনা, বাসা ভাড়া নেওয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যক্তিগত কার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারে না।

নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, চার নির্বাচন কমিশনার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, কয়েকজন রাষ্ট্রদূত অংশ নেন।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কীভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয় বিএনপি জানে : তারেক রহমান

এনআইডি থাকলেই প্রবাসীদের ভোট দেয়ার বিষয়টি সহজ হবে: সিইসি

আপডেট সময় ১১:৩৩:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৮

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান ও ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে একটি সেমিনার বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) আয়োজিত এই সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, প্রথমে প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেয়া নিশ্চিত করতে হবে। এনআইডি থাকলেই প্রবাসীদের ভোট দেয়ার বিষয়টি সহজ হবে বলে মনে করেন তারা।

সেমিনারের প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান নির্বচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরূল হুদা। তিনি বলেন, বর্তমান কমিশন প্রবাসী ভোটার করতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। দেশের সন্তানরা বিদেশে অবস্থান করে দেশকে সমৃদ্ধশালী করছেন। তাদের কীভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগে সাহায্য করা যায়, কীভাবে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া যায় সে বিষয়ে আপনাদের মতামত প্রবাসীদের ভোট করার জন্য কাজে লাগবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘প্রবাসীদের একটি সমস্যা সমাধান করলেই হয়, সেটা হলো তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার বিষয়। এটা নিশ্চিত করা গেলে তারা অটোমেটিক জাতীয় পরিচয়পত্র পাবে। অন্যান্য সুবিধাও পাবে।’

সাখাওয়াত বলেন, ‘১২০টি দেশে তাদের প্রবাসীদের ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। এর মধ্যে এশিয়ার আছে ২০টি দেশ।’ তিনি বলেন, ‘প্রবাসীদের ভোট দেয়ার ব্যাপারে ২০০৮ সালে আইনি কাঠামো করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর পাঁচ বছর এটা নিয়ে আর কাজ করা হয়নি। তাই আমি নির্বাচন কমিশনকে বলবো, প্রবাসীদের কীভাবে ভোটার করা যায় সেজন্য একটি সেল গঠন করুন। প্রবাসীদের ভোট করার বিষয় তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। কারণ আগামী নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার বিষয়টি কাজ করবে না।’

সাবেক কূটনীতিক শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রবাসীদের প্রথমে জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে হবে। এরপর দেখতে হবে কীভাবে তারা ভোট দিতে পারে। কারণ জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় অনেক প্রবাসী জমি ক্রয়-বিক্রয়সহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়ে। তারা দেশে এসে বিভিন্ন সেবা পেতে হয়রানির শিকার হয়।’

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান বলেন, ‘দ্বৈত নাগরিকদের ভোট দেয়া সংবিধান অনুমতি দেয়নি। এজন্য এটা আলোচনা না করাই ভালো। প্রবাসীদের ভোট দেয়ার অধিকার, তাদের কীভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা যায় সেটা আলোচনা করা দরকার।’

এ সময় পোস্টাল ভোট বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটুকু কার্যকর তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন মশিউর। বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে কে ভোট দিয়েছে তা শনাক্তকরণ দুরূহ।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মহাপরিচালক কনসুলার নাহিদা রহমান সুমনা জানান, প্রবাসীদের সংখ্যা এখন দেড় কোটি। তারা দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছে। তাদের ভোটের অধিকার দেয়া আমাদের দায়িত্ব। তবে দ্বৈত নাগরিকদের নিয়ে ভাবতে হবে।

এই কর্মকর্তা বলেন, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারতে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) পদ্ধতি চালু আছে। এ পদ্ধতিতে কীভাবে ভোট নেয়া যায় সেটাও আমাদের দেখতে হবে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্বাহী পরিচালক ড. ইয়ামিন আকবরি বলেন, ‘এক কোটি ১৫ লাখ আমাদের প্রবাসী। এর ৩০ শতাংশ রয়েছে সৌদি আরবে। দেখা যায় অনেক প্রবাসী জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকার কারণে তাদের সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে। তারা ব্যাংকিং সুবিধা, ড্রাইভিং লাইসেন্স না পাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছে। অনেক সময় প্রবাসীরা দুর্ঘটনায় পড়ে। সে সময় তাদের সহায়তা করতেও আমাদের সমস্যা হয়। বিশেষ করে যারা ২০০০ সালের আগে বিদেশে গিয়েছে তারা। কারণ তাদের বেশির ভাগেরই জাতীয় পরিচয়পত্র নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি মিশন প্রধান মাহবুব হাসান সালেহ বলেন, ডুয়েল সিটিজেনদের যেহেতু নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার নেই তাই তিনি ভোটারও হতে পারবে না। প্রথমে যারা দ্বৈত নাগরিক নয় তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হোক।

সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, প্রবাসীদের প্রথমে প্রয়োজন তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)। এটা করতে একটা সময় নির্ধারণ করুন। আমি দেখেছি এনআইডি না থাকার কারণে প্রবাসীদের দেশে টাকা পাঠাতেও সমস্যা হচ্ছে। তারা দেশে এসেও পদে পদে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, প্রবাসীদের এনআইডি যেন দেয়া হয় সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, কি-নোট পেপারে (নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক উপস্থাপন করেন) দেখানো হয়েছে আমাদের প্রবাসী ৭৫ লাখ। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে আবার আরেক তথ্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দিল আরেক তথ্য। তিনটি প্রতিষ্ঠানই কিন্তু সরকারি। আসলে আমাদের প্রবাসী কত। ১০ থেকে ১৫ হাজার হেরফের না হয় মানা যায়। তাই বলে ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার পার্থক্য এটা কীভাবে হয়।

নজরুল ইসলাম বলেন, প্রবাসীদের সঠিক তালিকা করে তারা যেন ভোট দিতে পারে সে ব্যবস্থা আমদের করতে হবে। আমাদের সংবিধানে সব নাগরিকের ভোট দেয়ার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও আমরা সে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। প্রবাসীদের ভোট দেয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারিনি। আমরা কিন্তু প্রবাসীদের টাকা কীভাবে আনবো সেই পদ্ধতি ভালোভাবেই চালু করেছি। কিন্তু আমাদের উচিত ছিল টাকা আনার সঙ্গে সঙ্গে তারা যেন ভোট দিতে পারে সে ব্যবস্থা করার। আমাদের এখন আর এ ব্যাপারে সময় নষ্ট করা যাবে না দ্রুত প্রবাসীদের ভোট দেয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তবে কীভাবে তারা ভোট দেবে এটা নিয়ে আমাদের আরও আলোচনা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে যারা এ বিষয়ে যে দেশগুলো সফল হয়েছে তাদের কাছ থেকে আমরা পরামর্শ নিতে পারি।

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, পোস্টাল ভোট পদ্ধতিটা প্রথমে আমরা প্রয়োগ করে দেখতে পারি।

প্রসঙ্গত, পোস্টাল ভোট পদ্ধতিতে একজন প্রবাসী তার পছন্দমত যেকোনো জায়গা থেকে ভোট দিতে পারেন। আবেদন করলে ওই ঠিকানায় আগে থেকে ব্যালট পেপার সরবরাহ করে নির্বাচন কমিশন। ভোট দেয়ার পর তা দেশে ডাকযোগে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ পদ্ধতি প্রবাসীদের জন্য ২০০৮ সাল থেকে চালু আছে। যদিও এটা সম্পর্কে মানুষ জানে না এবং এর প্রয়োগও তেমন হয় না।

অনুষ্ঠানে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।

প্রবাসী ভোটারধিকারের বৈশ্বিক পরিস্থিতি

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক সাইদুল ইসলাম সেমিনারে কি-নোট পেপারে বলেন, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে দূতাবাসে একটি কক্ষে লোকাল সার্ভার স্থাপন; প্রবাসীদের সংখ্যানুপাতে রেজিস্ট্রেশন টিম তৈরি করে কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং নিবন্ধন কাজের জন্য যন্ত্রপাতি ও দক্ষ আইটি কর্মকর্তা নিয়োগে করতে হবে।

সাইদুল ইসলাম বলেন, আলবেনিয়া, কম্বোডিয়া, কিউবা, ইফিওপিয়া, গ্রিস লাইবেরিয়া, উগান্ডাসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের ভোটের বিধান নেই।

ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ বিদেশে অবস্থানত নাগরিকদের জন্য ভোট চালু করার পর বিলুপ্ত করেছে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে ভুটান, ভারত, মালদ্বীপে বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের ভোটের ব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাজ্যে চালু রয়েছে প্রক্সি ও পোস্টাল ভোট। ১০০ বছর আগে তারা এই ব্যবস্থা চালু করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৪৯ সাল থেকে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ চালু আছে। বর্তমানে ডাকযোগে ও ব্যক্তিগতভাবে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট দেওয়ার বিধান চালু আছে। আফগানিস্তান, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় প্রবাসীদের ভোটের বিধান নেই।

প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ সংক্রান্ত সুপারিশ তুলে ধরে সাইদুল ইসলাম বলেন, প্রবাসী নাগরিকদের প্রবাসেই ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করা, প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের ভোটাধিকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করার জন্য ব্যাপক প্রচারণার ব্যবস্থা নেয়া, ভোটাধিকার ব্যবস্থা প্রবর্তনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন এবং বিদ্যামান আইন/বিধি সংশোধন করে উপযুক্ত আইনি কাঠামো তৈরি করা, প্রবাসে ভোট গ্রহণের সুবিধা-অসুবিধা বিস্তারিত পরীক্ষা নিরীক্ষাপূর্বক একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রবাসে ভোটগ্রহণের বিষয় বিবেচনা করা এবং ভবিস্যতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া।

প্রসঙ্গত, ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর এটিএম শামসুল হুদার কমিশন ২০০৮ সালে এবং কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন কমিশন ২০১৪ সালে দুই দফা প্রবাসীদের ভোটাধিকার দেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নেয়। কিন্তু পরে আর তা বাস্তবায়িত হয়নি।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকরা দেশে এলে জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা, আদালতে মামলাসংক্রান্ত সমস্যা, মানি লন্ডারিং বা দুর্নীতিসংক্রান্ত সমস্যা, দেশে বৈধ নাগরিকত্বের প্রমাণ, ব্যাংক হিসাব খোলা ও আর্থিক লেনদেন করা, মোবাইল সিম কেনা, সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, কর ও রাজস্ব প্রদান, ব্যবসা পরিচালনা, বাসা ভাড়া নেওয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যক্তিগত কার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারে না।

নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, চার নির্বাচন কমিশনার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, কয়েকজন রাষ্ট্রদূত অংশ নেন।