অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
নিরাপত্তাহীনতা দূর করা গেলে নারীর অগ্রযাত্রা ধরে রাখা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সাংবাদিক ও লেখক মাহফুজ উল্লাহ। মঙ্গলবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন বাংলাভিশনে সংবাদ বিশ্লেষণধর্মী অনুষ্ঠান ‘নিউজ এন্ড ভিউজ’ এ কথা বলেন তিনি। সাংবাদিক নাজমুল আশরাফের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন ডিবিসির প্রধান সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম।
মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ‘গত কয়েকদিন আগে কাশ্মিরে আসিফা নামের একটি আট বছরের মেয়ে ধর্ষিত হয় এবং পরে মারা যায়। এটাকে নিয়ে ওখানে যে পরিমাণ গণআন্দোলন হয়েছে, জনগণ যতখানি উত্তাল হয়েছে। আমরা অনেক বিষয়ে কথা বলি, কিন্তু নারীর যে নিরাপত্তাহীনতা, আমরা যদি তা রোধ করতে না পারি তাহলে নারীর যে অগ্রযাত্রা, সে অগ্রযাত্রা আমরা ধরে রাখতে পারব না।’
নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সঞ্চালকের করা এক প্রশ্নের জবাবে মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ‘প্রশ্নটা যেভাবে করেছেন, এর জবাবটা একটু জটিল। জটিল এই কারণে যে, একটা সমাজ তার নারীদের কিভাবে দেখে। এটা একটা খুব বড় বিষয়। দেখেন আমাদের ভেতরে দ্বন্দ্ব আছে। দ্বন্দ্বটা হচ্ছে- আপনি বা আমি বা যে কেউ আমাদের পরিবারের মা-বোন-মেয়েকে যে আদর যত্নে রক্ষা করি, বাইরে যখন কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন আমরা ওইভাবে প্রকাশ করি না।’
‘নারীর প্রতি সহিংসতা সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে বেড়েছে, মনে হচ্ছে অনেক বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনেই সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।’
এই সাংবাদিক বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন নারীর ক্ষমতায়নে শিক্ষা প্রয়োজন। শুধুমাত্র শিক্ষাই নারীকে পুরোপুরি ক্ষমতায়িত করবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর চল্লিশ-বেয়াল্লিশ হাজার ছাত্র বের হয়, তার প্রায় অর্ধেক নারী বের হয়। এই নারীরা কোথায় যায়, তারাতো সর্বোচ্চ ডিগ্রি পাচ্ছে। এখানে একটি কথা আছে, যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীকে না আনা যায়, তবে নারীর সত্যিকার অর্থে ক্ষমতায়ন হবে না।’
মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়নের সময় ত্রিশভাগ দেয়ার কথা, আজ পর্যন্ত কেউ সেটা অর্জন করতে পারে নাই। বরং কেউ কেউ মনে করেন এই কোটা দিয়ে মেয়েদেরকে রাখা হচ্ছে পার্লামেন্টে। সেটাও এক ধরনের বৈষম্য তৈরি করে।’
বড় দলগুলো দলের ভেতরে নারীর কতটুকু ক্ষমতায়ন করে এমন প্রশ্নে ডিবিসির প্রধান সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি নীতিগতভাবে মনে করি, তারা শুরু করেছেন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমরা পাহাড়ের ওপরে উঠতে গেলে মাঝ পথে গিয়ে দেখি উপরে আর কতদূর বাকি। কিন্তু একবার নিচেও আমাদের তাকিয়ে দেখতে হবে আমরা কতটুকু উঠে এলাম। আমাদের স্বাধীনতার ৪৭ বছরের মধ্যে গত পনের বছরে অথবা আরও যদি পরিষ্কার করে বলি নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পরে নারীর যে অগ্রগতি এবং গত দশ বছরে প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপের ফলে জ্যামিতিক হারে নারীর অগ্রগতি হয়েছে।’
মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কথায় কথায় যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দেই। যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ভোটাধিকার হয়েছে গত শতকে। তাদের স্বাধীনতার একশ বছর পরে হয়েছে। আমাদের আশার কথা হচ্ছে আমরা স্বাধীনতার প্রথম দিন থেকেই নারী এবং পুরুষের সমান ভোটাধিকার ছিল। ভোটাধিকার থাকলেও এটা আবার ব্যাহত হয়েছে নানান কারণে।’
‘আমাদের স্বাধীনতার মূল্যবোধ যেটা ছিল, অসাম্প্রদায়িক এবং সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করার রাজনীতি। সেখানে নারী-পুরুষ সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত ছিল। কিন্তু আমাদের এখানে মানুষ ধর্ম বিশ্বাস করে। ধর্মভীরু ধর্মান্ধ মানুষের সংখ্যা কম। ধর্মান্ধরা এক সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তখন আমাদের নারীদের পেছনে ফিরে যেতে হচ্ছে। সে জায়গায় আবার গণতন্ত্রের যাত্রা যখন শুরু হলো, নারীরা আবার সামনে চলে আসলো।’
এক প্রশ্নের জবাবে ডিবিসির প্রধান সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, গত দশ বছরে নারীরা নীতিনির্ধারণ নয়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আমি মনে করি নারীরা আন্দোলনে আছেন। তবে আন্দোলনের ঢংটা বদলে গেছে। বদলে গেছে এই কারণে, কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলের নেত্রী, স্পিকার না। সেনাবাহিনীতে, সচিব পদে সামরিক বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে এমনকি ইউনিভার্সিটির উপাচার্যও নারী। তারা নীতিনির্ধারণীর জায়গা থেকে সকলের অধিকার নিশ্চিতে কাজ করছে।’
‘নারীর ক্ষমতায়নে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা আছে। তার সাহসী পদক্ষেপের ফলেই প্রথমবারের মতো নারী স্পিকার, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হয়েছে। ফলে নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে।’
নারীদের অগ্রযাত্রায় জঙ্গিবাদ বড় বাধা কি না সঞ্চালকের এমন প্রশ্নে মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘এক সময় এই ধর্মান্ধগোষ্ঠী বাধা ছিল। এখন সেই বাধা অনেকটা কমছে, প্রতিদিনই কমছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয় তাদেরকে। এখানে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা যদি দেওয়া হয় তাদেরকে তখন জ্যামিতিকহারে বাড়ে। এখানে আমি মনে করি দুটি কারণে এটা কমে এসেছে। একটি হচ্ছে শিক্ষা, অপরটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে না। এতে ধর্মান্ধরা ক্রামান্বয়ে সংখ্যালঘু হয়ে যাবে।’
সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের দেশে নারীকে তালাক দেয়ার অধিকার দেয়া হয়েছে, এটা পৃথিবীর বহু মুসলমান দেশে নাই। কাজেই সেই দিক থেকে ধর্মান্ধগোষ্টি খুব বেশি করে নারীর অগ্রযাত্রায় ঠেকিয়ে রাখছে এটা পুরোপুরি সত্য নয়। এখানে আমাদের সমাজে প্রগতির যে ধারাটা এটা কিন্তু অনেক বেশি শক্তিশালী। দেশে এতো প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও নারীর অগ্রযাত্রাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে নাই।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















