অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
নিম্ন আদালত স্বাধীন নয় এমন দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তার দুর্নীতি মামলায় ‘ন্যায়বিচার’ পাওয়া নিয়ে আশঙ্কা করেছেন। তার আশঙ্কা আদালত সঠিক রায় দিতে পারবে না। শনিবার বেলা ১২টার দিকে রাজধানীর লা মেরিডিয়ান হোটেলে দলের নির্বাহী কমিটির সভায় উদ্বোধনী বক্তব্যে এই আশঙ্কার কথা জানান বিএনপি প্রধান।
দলের নেতাদেরকে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি যেখানেই থাকি না কেন আপনাদের সঙ্গে থাকব।’ তিনি বলেন, দলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। যারা দুই নৌকায় পা দেবে তাদের দিকে লক্ষ্য রাখা হবে। বক্তব্য চলার সময় নির্বাহী কমিটির নেতারা স্লোগান ধরেন, ‘আমার নেত্রী আমার মা বন্দী হতে দেবো না।’
আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় রায় ঘোষণা হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, আদালতকে ব্যবহার করে সাজা দিয়ে খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে রাজনীতি থেকে সরানোর চেষ্টা করছে সরকার।
গত ২৫ জানুয়ারি রায়ের তারিখ ঘোষণার দুই দিন পর বিএনপির কৌশল নির্ধারণে দলের স্থায়ী কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেন খালেদা জিয়া। পরদিন বৈঠক হয় শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে।
স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায় নিয়ে সোচ্চার হতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আর শরিক দলগুলোর নেতারা এই রায়ে যাই হোক না কেন, খালেদা জিয়ার পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। এই দুই বৈঠকের পর দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা ডাকা হয়।
নির্বাহী কমিটির উদ্বোধনী বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালত বলছে নিম্ন আদালত সরকারের কব্জায়। পত্রিকায় যা দেখছি তাতে বোঝা যাচ্ছে সঠিক রায় দেয়ার সুযোগ নেই। সঠিক রায় দিলে কি পরিণতি হয় তা তো দেখেছেন। তারেক রহমানের রায় দেয়ার পর বিচারককে দেশ ছাড়তে হয়েছে।’
ক্ষমতার দাপট আজ সর্বত্র। বিচার বিভাগ আজ স্বাধীন নয়। তারা শুধু হুকুমে কাজ করছে। তবে আদালত রায় দিলেও কিছু করতে পারবে না জানিয়ে বিএনপি নেত্রী বলেন, ‘আমাকে কোনো ভয়ভীতি, লোভলালসা দোখিয়ে কিছু করতে পারবে না। আমি আছি থাকব। সাহস সঞ্চার করতে হবে।’
নিজের মামলার পাশাপাশি খালেদা জিয়া দলের নেতা-কর্মীদের নামে থাকা মামলা নিয়েও কথা বলেন।
‘বিএনপি নেতা কর্মীদের হাজার হাজার মামলা দেয়া হয়েছে। বিরোধী নেতা কর্মীদের ধরে নিয়ে মামলা দিয়ে দিচ্ছে। মামলাগুলো আগেই তৈরি থাকে। রাজনৈতিক বিবেচনার মামলা শুধু শুধু। সরকারি দলের নেতা কর্মীদের প্রত্যাহার করা হয়।’
এ সময় অস্ত্রের মুখে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে দাবি করেন বিএনপি প্রধান। খালেদা বলেন, যারা নিজেদের গণতান্ত্রিক বলছেন, তারা অস্ত্রের মুখে জোর করে মিথ্যা তথ্য দিতে বাধ্য করছে। এদের মধ্যে আর মঈন-ফখরুদ্দিনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
প্রশাসনকে দলীয়করণ করে ধ্বংস করা হচ্ছে দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘প্রশাসনে নিজস্ব দলীয় লোকদের বসানো হচ্ছে। তারা মনে করে নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে সহযোগিতা করবে। কিন্তু তারা যদি একটু নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে চায় তাহলে কারো কোন কথা শুনবে না। কারণ তারা এদেশের নাগরিক।’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘সংসদের কোনো বিরোধী দল নেই। বিরোধীদল থাকলে দেশে যে অরাজগতা হচ্ছে এ নিয়ে তারা প্রতিবাদ করছে না কেন? দ্রব্যমূল্যের দাম কয়েকগুণ বাড়ছে। চালের দাম ৭০ টাকা পেঁয়াজের দাম ১২০ টাকা হলেও এ নিয়ে তারা কথা বলছে না।
বিএনপি প্রধান বলেন, ব্যাংকের টাকা লুট হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার পায়তাঁরা করছে। কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সুইস ব্যাংকে জমা হচ্ছে। বিএনপির এত টাকা নেই সুইস ব্যাংকে রাখার।’
সরকারি দলের নেতাদের উদ্দেশ্য করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘অনেকের পরিবার দেশের বাইরে বাড়ি বানাচ্ছে। দেশের টাকা বিদেশে পাঠিয়ে সেটেল হওয়ার চেষ্টা করছে। সরকারের ঘনিষ্ঠরা হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ মওকুফ করাচ্ছে। আর বিএনপির লোকেরা ব্যবসা করার জন্য ব্যাংক ঋণ পাচ্ছে না।’
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে কোনো প্রতিষ্ঠানই ভালো নেই। বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে না। গুম খুন হত্যার কারণে দেশে বিনিয়োগ করার পরিস্থিতি নেই। তাই তারা এদেশে বিদেশিরা আসছে না। দেশি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের পরিবেশ পাচ্ছে না। আর এই জন্য নতুন শিল্পকারখানা গঠে উঠছে না। এতে দিন দিন বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। দরিদ্র আরও দরিদ্র হচ্ছে।’
খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ ঘরে ঘরে চাকরি দেওয়ার কথা বলেছে। এখন সরকারি দলের লোক ছাড়া পিয়নের চাকরিও পাওয়া যায় না। তাও আবার তাদের ঘুষ দিতে হয়। পাঁচ লাখ ১০ লাখ টাকা না হলে চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না।
নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, জাতীয় নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। জনগণ যেন ভোট কেন্দ্রে আসতে পারে সে রকম পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে আমরা পরিষ্কার বলেছি নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। নির্বাচনে পুলিশের সঙ্গে অবশ্যই যেন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। তাহলে জনগণ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে যেতে পারবে।
এর আগে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যে দিয়ে নির্বাহী কমিটির বৈঠক শুরু হয়। এরপর গত দুই বছরে মৃত্যুবরণ করা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রয়াত দলীয় নেতাসহ অন্তত ১৭৮ জনের নামে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। শোক প্রস্তাবের পর সাংগঠনিক প্রতিবেদন পেশ করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
৫০২ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় নির্বাহী কমিটির অন্তত চার শ জন সদস্য উপস্থিত রয়েছেন সভায়। এ ছাড়া বিশেষ আমন্ত্রণে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের অনন্ত ৪০ জন সদস্য সভায় উপস্থিত রয়েছেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















