ঢাকা ০৪:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইতিহাস বিকৃত করতে চাইলে ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয়: প্রধানমন্ত্রী

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

ইতিহাস বিকৃত করতে চাইলে ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও একসময় এটি নিষিদ্ধ ছিল। এই ভাষণ বাজানোর কারণে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিজয়ী জাতি হিসেবে বিজয়ের ইতিহাস বলতে পারবো না, এটা তো হয় না। এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বোঝা গেলো, ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয়।’

আজ শনিবার (১৮ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। ইউনেসকোর ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ স্বীকৃতি পাওয়া উপলক্ষে নাগরিক কমিটি এই সমাবেশের আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। এজন্য আমরা গর্বিত জাতি। আমাদের উন্নত শির যেন আর কোনোদিন পরাভূত না হয় সেজন্য সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত থাকবে, এর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি এগিয়ে যাবে, এটাই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা।

তিনি বলেন, ‘ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে আমরা মুক্তিযোদ্ধাসহ সবাই সম্মানিত হয়েছি। তবে পাকিস্তানের প্রেতাত্মা তোষামোদকারী ও চাটুকাররা যেন আর কখনও ইতিহাস বিকৃত করার সুযোগ না পায় সেজন্য বাংলার মানুষকে জাগ্রত থাকতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দুপুর আড়াইটার পরে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হন। এর পর তিনি মঞ্চে প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করলে ২টা ৪০ মিনিটে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এর মাধ্যমে মূলত সমাবেশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ৪টা ২০ এ বক্তব্য শুরু করেন তিনি। শেষ করে ৪টা ৫০ মিনিটে। প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতেই স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। স্মরণ করেন ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট নিহত বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং জেলহত্যার শিকার ৪ জাতীয় নেতাকে।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তাঁর বক্তব্যে ইউনেসকো ও যে দেশগুলো ভোট দিয়ে বঙ্গবন্ধু সাতই মার্চের ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়েছে তাদের ধন্যবাদ দেন। তিনি বলেন, বিশ্বে স্বীকৃতি পাওয়া ভাষণগুলো ছিল লিখিত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ লিখিত ছিল না। এই ভাষণের জন্য কোনো ‘নোটস’ ও বঙ্গবন্ধুর হাতে ছিল না।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ দেওয়ার আগে পায়চারির সময় আমার মা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বলেছিলেন— অনেকে অনেক কিছু বলছে। কিন্তু তুমি তাই বলবে যা তুমি ভালো মনে করো। কারণ তুমি জানো তোমার কি কথা বলতে হবে বাঙালি জাতির জন্য। প্রধানমন্ত্রী বাবাকে দেওয়া মায়ের এই পরামর্শকে শ্রেষ্ঠ পরামর্শ বলে উল্লেখ করেন।

আজ সকাল থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে আওয়ামী লীগ, এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন, বিভিন্ন সামাজিক ও ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যানার নিয়ে সমাবেশে আসতে শুরু করে। দুপুরের মধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে এ বিশাল উদ্যান। এখানেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শুনিয়েছিলেন স্বাধীনতার অমর সেই বাণী, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’

সমাবেশস্থল সাজানো হয়েছে ১৯৭১ সালে ৭ মার্চের মতো করে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কৃত্রিম লেকে শোভা পায় পাটবোঝাই পাল তোলা নৌকা। আর নৌকার পালে আছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের বিভিন্ন অংশ। এসবের মধ্যে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম,’ ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ’, ‘তোমাদের হাতে যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’ লেখা ব্যানার।

এদিকে আজকে ঢাকার আকাশ দিনভর মেঘাচ্ছন্ন ছিল। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের শেষ দিকে সূর্য উঁকি দেয়। সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এতদিন এরকম মেঘে ছেয়েছিল। আমাদের আকাশে সূর্য নতুনভাবে দেখা দিয়েছে।এই সূর্যই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশকে আবারও আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলবো।’

পৃথিবীর কোনও ভাষণ ৭ মার্চের ভাষণের মতো এতদিন এত ঘণ্টা ধরে বাজেনি বলে দাবি শেখ হাসিনার। তিনি বলেন, ‘যাদের এ দেশে জন্ম হয়নি, যারা স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাস করে না কিংবা করতে পারেনি, তারা বঙ্গবন্ধুর নাম ও ৭ মার্চের ভাষণ মুছে ফেলতে চেয়েছে। এ কারণে বাজাতে দেয়নি। এ দেশে বসবাস করলেও তারা মূলত পাকিস্তানের প্রেতাত্মা।কিন্তু তারা যতই বন্ধ করতে চেয়েছে স্বাধীনতার উদ্দীপনা ও চেতনাকে রুখতে পারেনি। আমার প্রশ্ন, বিশ্ব স্বীকৃতি পাওয়া দেখে আজ কি তাদের এতটুকু লজ্জা হয় না?’

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সব দিকনির্দেশনা ছিল বলে মনে করেন শেখ হাসিনা। তিনি বললেন, বঙ্গবন্ধু জানতেন পাকিস্তানি শাসকরা কখনও ক্ষমতা দেবে না। যুদ্ধ করেই দেশ স্বাধীন করতে হবে। ৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হয়েছিল জনগণের ম্যান্ডেট নিতে। তিনি জানতেন নির্বাচনে জিতলেও ক্ষমতা ছাড়বে না পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা। তাই ৭ মার্চের ভাষণে সব দিকনির্দেশনা দিয়ে যান জাতির পিতা। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, অর্থ সংগ্রহসহ সব পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা তার এই ভাষণে ছিল।

সমাবেশে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সভাপতিত্ব করেন এমিরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। বক্তব্য রাখেন দৈনিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী, নজরুল গবেষক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ইউনেস্কোর কান্ট্রি ডিরেক্টর (বাংলাদেশ) বিট্রিস কালদুল। স্বাগত বক্তব্য দেবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

আলোচনা ছাড়াও সমাবেশে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এখানে আবৃত্তি করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও কবি নির্মলেন্দু গুণ। শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীদের কণ্ঠে সমবেত গানের পর লোকগান পরিবেশন করেন চন্দনা মজুমদার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রামেন্দু মজুমদার ও শহীদ বুদ্ধিজীবী আবদুল আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী।

সমাবেশকে সফল করতে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানকে আহবায়ক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদকে যুগ্ম আহবায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, নাট্যজন আতাউর রহমান ও একাত্তর টেলিভিশনের মোজাম্মেল বাবু।

প্রসঙ্গত, ৪৬ বছর আগে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ১৮ মিনিটের ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকো।’ বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষণের মাধ্যমেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এরই সূত্র ধরে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইতিহাস বিকৃত করতে চাইলে ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয়: প্রধানমন্ত্রী

আপডেট সময় ০৬:৪৪:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৭

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

ইতিহাস বিকৃত করতে চাইলে ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও একসময় এটি নিষিদ্ধ ছিল। এই ভাষণ বাজানোর কারণে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিজয়ী জাতি হিসেবে বিজয়ের ইতিহাস বলতে পারবো না, এটা তো হয় না। এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বোঝা গেলো, ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয়।’

আজ শনিবার (১৮ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। ইউনেসকোর ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ স্বীকৃতি পাওয়া উপলক্ষে নাগরিক কমিটি এই সমাবেশের আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। এজন্য আমরা গর্বিত জাতি। আমাদের উন্নত শির যেন আর কোনোদিন পরাভূত না হয় সেজন্য সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত থাকবে, এর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি এগিয়ে যাবে, এটাই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা।

তিনি বলেন, ‘ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে আমরা মুক্তিযোদ্ধাসহ সবাই সম্মানিত হয়েছি। তবে পাকিস্তানের প্রেতাত্মা তোষামোদকারী ও চাটুকাররা যেন আর কখনও ইতিহাস বিকৃত করার সুযোগ না পায় সেজন্য বাংলার মানুষকে জাগ্রত থাকতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দুপুর আড়াইটার পরে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হন। এর পর তিনি মঞ্চে প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করলে ২টা ৪০ মিনিটে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এর মাধ্যমে মূলত সমাবেশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ৪টা ২০ এ বক্তব্য শুরু করেন তিনি। শেষ করে ৪টা ৫০ মিনিটে। প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতেই স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। স্মরণ করেন ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট নিহত বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং জেলহত্যার শিকার ৪ জাতীয় নেতাকে।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তাঁর বক্তব্যে ইউনেসকো ও যে দেশগুলো ভোট দিয়ে বঙ্গবন্ধু সাতই মার্চের ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়েছে তাদের ধন্যবাদ দেন। তিনি বলেন, বিশ্বে স্বীকৃতি পাওয়া ভাষণগুলো ছিল লিখিত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ লিখিত ছিল না। এই ভাষণের জন্য কোনো ‘নোটস’ ও বঙ্গবন্ধুর হাতে ছিল না।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ দেওয়ার আগে পায়চারির সময় আমার মা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বলেছিলেন— অনেকে অনেক কিছু বলছে। কিন্তু তুমি তাই বলবে যা তুমি ভালো মনে করো। কারণ তুমি জানো তোমার কি কথা বলতে হবে বাঙালি জাতির জন্য। প্রধানমন্ত্রী বাবাকে দেওয়া মায়ের এই পরামর্শকে শ্রেষ্ঠ পরামর্শ বলে উল্লেখ করেন।

আজ সকাল থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে আওয়ামী লীগ, এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন, বিভিন্ন সামাজিক ও ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যানার নিয়ে সমাবেশে আসতে শুরু করে। দুপুরের মধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে এ বিশাল উদ্যান। এখানেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শুনিয়েছিলেন স্বাধীনতার অমর সেই বাণী, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’

সমাবেশস্থল সাজানো হয়েছে ১৯৭১ সালে ৭ মার্চের মতো করে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কৃত্রিম লেকে শোভা পায় পাটবোঝাই পাল তোলা নৌকা। আর নৌকার পালে আছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের বিভিন্ন অংশ। এসবের মধ্যে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম,’ ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ’, ‘তোমাদের হাতে যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’ লেখা ব্যানার।

এদিকে আজকে ঢাকার আকাশ দিনভর মেঘাচ্ছন্ন ছিল। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের শেষ দিকে সূর্য উঁকি দেয়। সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এতদিন এরকম মেঘে ছেয়েছিল। আমাদের আকাশে সূর্য নতুনভাবে দেখা দিয়েছে।এই সূর্যই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশকে আবারও আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলবো।’

পৃথিবীর কোনও ভাষণ ৭ মার্চের ভাষণের মতো এতদিন এত ঘণ্টা ধরে বাজেনি বলে দাবি শেখ হাসিনার। তিনি বলেন, ‘যাদের এ দেশে জন্ম হয়নি, যারা স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাস করে না কিংবা করতে পারেনি, তারা বঙ্গবন্ধুর নাম ও ৭ মার্চের ভাষণ মুছে ফেলতে চেয়েছে। এ কারণে বাজাতে দেয়নি। এ দেশে বসবাস করলেও তারা মূলত পাকিস্তানের প্রেতাত্মা।কিন্তু তারা যতই বন্ধ করতে চেয়েছে স্বাধীনতার উদ্দীপনা ও চেতনাকে রুখতে পারেনি। আমার প্রশ্ন, বিশ্ব স্বীকৃতি পাওয়া দেখে আজ কি তাদের এতটুকু লজ্জা হয় না?’

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সব দিকনির্দেশনা ছিল বলে মনে করেন শেখ হাসিনা। তিনি বললেন, বঙ্গবন্ধু জানতেন পাকিস্তানি শাসকরা কখনও ক্ষমতা দেবে না। যুদ্ধ করেই দেশ স্বাধীন করতে হবে। ৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হয়েছিল জনগণের ম্যান্ডেট নিতে। তিনি জানতেন নির্বাচনে জিতলেও ক্ষমতা ছাড়বে না পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা। তাই ৭ মার্চের ভাষণে সব দিকনির্দেশনা দিয়ে যান জাতির পিতা। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, অর্থ সংগ্রহসহ সব পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা তার এই ভাষণে ছিল।

সমাবেশে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সভাপতিত্ব করেন এমিরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। বক্তব্য রাখেন দৈনিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী, নজরুল গবেষক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ইউনেস্কোর কান্ট্রি ডিরেক্টর (বাংলাদেশ) বিট্রিস কালদুল। স্বাগত বক্তব্য দেবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

আলোচনা ছাড়াও সমাবেশে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এখানে আবৃত্তি করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও কবি নির্মলেন্দু গুণ। শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীদের কণ্ঠে সমবেত গানের পর লোকগান পরিবেশন করেন চন্দনা মজুমদার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রামেন্দু মজুমদার ও শহীদ বুদ্ধিজীবী আবদুল আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী।

সমাবেশকে সফল করতে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানকে আহবায়ক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদকে যুগ্ম আহবায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, নাট্যজন আতাউর রহমান ও একাত্তর টেলিভিশনের মোজাম্মেল বাবু।

প্রসঙ্গত, ৪৬ বছর আগে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ১৮ মিনিটের ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকো।’ বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষণের মাধ্যমেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এরই সূত্র ধরে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।