জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানো এবং উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারের লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২৬ অক্টোবর চার দিনের সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই সফর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর ও যুগোপযোগী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে জাপানের অনুদান আগের চেয়ে কমে গেছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া তিনি জাইকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন এবং জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। এর আগে ১০ অক্টোবর পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, এবারের সফরে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
জাপান দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।
দেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্প যেমন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জাপানের বিশেষ অবদান রয়েছে।
গত ১২ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত সপ্তম বাংলাদেশ-জাপান পররাষ্ট্র দফতর পর্যায়ের আলোচনায় বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিসহ (ইপিএ) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা হয়। ওই সময় জাপানের জ্যেষ্ঠ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিরোয়ুকি নামাজু জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীদের কর্মসংস্থান বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দুই দেশ জনশক্তি সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে কাজ করছে, যা সফরের সময় চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে। বর্তমানে জাপানের বয়স্ক জনসংখ্যার বিপরীতে বিভিন্ন শিল্পখাতে কর্মীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থী পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার নতুন পথ প্রশস্ত করার ওপরও জোর দেওয়া হবে। তবে আসন্ন সফরে জনশক্তি বিষয়ে কোনো চুক্তি সই হবে কি না, সেই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টি সম্ভাব্য আলোচ্যসূচি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন শিল্পে কর্মীর চাহিদার কারণে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে যেন জাপানের অনুদান অব্যাহত থাকে সফরকালে সেই আলোচনা তোলা যেতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের আগস্টের বিবৃতিতে জাপানে বাংলাদেশি বিশেষায়িত দক্ষ শ্রমিক বা নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নাগরিক পর্যায়ের বিনিময় বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। এই সফরে জনশক্তি রফতানি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে কিছু খাত বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি) কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সফরটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এবারের সফরে জাপানের কাছে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাব করতে যাচ্ছে। ২০২৬-৩১ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত এই প্যাকেজে ১২টি বিশেষ খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন ও নগর যোগাযোগ ব্যবস্থায় ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার, এমআইডিআই ও মাতারবাড়ী হাবের জন্য ৩.১৪ বিলিয়ন ডলার, সেমিকন্ডাক্টর ও উৎপাদন শিল্পে ১.৫৭ বিলিয়ন ডলার, জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীলতা খাতে ২.২২ বিলিয়ন ডলার এবং কৃষি, পর্যটন ও ব্লু ইকোনমি খাতে ১.২২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এই প্যাকেজ সহায়তা প্রস্তাবের মধ্যে আরও রয়েছে— পরিবহন ও নগর যোগাযোগ ব্যবস্থায় ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার; সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে এমআইডিআই ও মাতারবাড়ী হাবের জন্য ৩.১৪ বিলিয়ন ডলার; উৎপাদন, স।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফরের প্রেক্ষাপটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অধ্যাপক ইউনূস ২০২৫ সালের মে মাসের শেষদিকে টোকিও সফরে গিয়ে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সেই সফরের ধারাবাহিকতায় অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে ৬০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণচুক্তি সই হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফর দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি ২০২৫ সালের ২৮-৩১ মে জাপান সফর করেন। ৩০ মে টোকিওতে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে তার শীর্ষ বৈঠক হয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান এই সফর প্রসঙ্গে বলেন, জাপান বাংলাদেশের পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত বন্ধু। যদিও অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে অনুদানের হার কিছুটা কমেছে, তবুও এবারের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় অনুদান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা উজ্জ্বল। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতার বিষয়গুলোও সফরের আলোচনায় স্থান পাবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মূলত বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠাই এবারের সফরের মূল লক্ষ্য। দেশটি বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে আসছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 





















