দীর্ঘদিন হাম নিয়ন্ত্রণে সফলতার পরিচয় দিলেও, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতায় বড় ধরনের হোঁচট খায় বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি। মাঠপর্যায়ে প্রচারণার ঘাটতি, দুর্বল তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং টিকাদানের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার ফলে সংক্রামক এই রোগটি বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশ্বের সামনে বাংলাদেশ এখন টিকাদানের হার কমে গেলে কী ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে, তার এক বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালে রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির প্রভাবে এ সফলতায় বড় ধাক্কা লাগে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছাকাছি থাকলেও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার জেরে সেই টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। সংক্রামক এই রোগটিকে ভ্যাকসিন দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলো অনেক বছর। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করছে দেশের শিশুরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২ হাজার রোগীর সংক্রমণ ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হয়েছে। এটিই বর্তমানে বিশ্বে সর্বোচ্চ আক্রান্তের হার। এখন পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো দেশের মহামারি ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ জরুরি। কিন্তু ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জেরে দেশে প্রথম ডোজের হার ৯০ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৮৬ শতাংশে নেমে আসে।
ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, টিকাদান কর্মসূচির পরেও বড় ধরনের শূন্যতা রয়ে গেছে। আগে আক্রান্ত শিশুদের ৮২ শতাংশ যেমন টিকাহীন ছিল, ক্যাম্পেইনের পরেও সেই হার ৮৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ডব্লিউএইচওর উপদেষ্টা মার্ক জিৎ জানান, জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার চেয়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। তিনি এটিকে বিশ্বের জন্য একটি চরম সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, সরকার প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও কিছু শিশু অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব বা অসুস্থতার কারণে বাদ পড়ে থাকতে পারে।
ভুল তথ্য এবং প্রস্তুতির ঘাটতি সরকারি টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। জুনের এক স্বাস্থ্য কার্যক্রমে দেখা যায়, এপ্রিলে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার দাবি করা হলেও সমবয়সী আরও ৪০ লাখ শিশু তালিকার বাইরে থেকে গেছে। এছাড়া তদারকির অভাবে টিকাদানের অনেক ধাপ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এর সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা গেছে সিলেটে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই অঞ্চলে সরকারি হিসাবেই ১৮০ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। ভুক্তভোগী স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামে স্বাস্থ্যকর্মীরা সঠিক সময়ে টিকা নিয়ে পৌঁছায়নি, এমনকি শিশু মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য বিভাগ তৎপর হয়েছে। সেসময় যাদের হামের টিকা দেয়া হয়নি বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে তাদের। এছাড়া সাধারণ সময়ে টিকাদান অভিযানের আগে চারটি ধাপে প্রস্তুতি যাচাই করা হলেও সময় স্বল্পতার অজুহাতে মাত্র একটি ধাপে তা শেষ করা হয়েছিল। স্থানীয় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অভিযোগ করেছে, তাদের গ্রামে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী সময়মতো টিকা দিতে আসেনি। শিশুর মৃত্যুর পরই কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন সেখানে হাজির হয়েছে।
বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন হামের রোগী শনাক্ত হচ্ছে। একই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ দেখা দিয়েছে। সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এখন পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন, কারণ মোট আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশ এই বয়সী শিশু। কেন ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে, তা নিয়েও এখন নতুন করে গবেষণার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সিলেটের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি রয়েছে। সাধারণত ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা মাতৃগর্ভ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি দ্বারা সুরক্ষিত থাকে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























