ঢাকা ১০:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মক্কা-মদিনায় হুমকি এলে বাংলাদেশ চুপ থাকবে না: শামা ওবায়েদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন চলতি অক্টোবরের শেষ দিকে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করলেন চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উদ্বোধনের আগেই কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরু সাইবার সুরক্ষা আইন যেন নিপীড়নমূলক না হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অক্টোবর-নভেম্বরে তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সন্ত্রাস দমন তহবিলে কাতারের ১৪১ মিলিয়ন ডলার অনুদান নিউইয়র্কে চার দিনে ৩০টি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত সফর জাতিসংঘে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধে চার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

গণপরিবহন ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তোইয়ামা কীভাবে বদলে যাচ্ছে

জাপানের অনেক আঞ্চলিক শহর যখন দ্রুত জনসংখ্যা হ্রাস, প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত গাড়িনির্ভরতার সমস্যায় ভুগছে, তখন অনন্য এক নগর পরিকল্পনার উদাহরণ হয়ে উঠেছে তোইয়ামা সিটি। আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা, সুপরিকল্পিত আবাসন এবং ডিজিটাল নাগরিক সেবার কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে শহরটি দেখাচ্ছে কীভাবে কম জনসংখ্যা নিয়েও জীবনযাত্রাকে আরও সহজ ও সুসংগঠিত করা সম্ভব। পর্বত ও সমুদ্রঘেরা এ শহরটি নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের ঘোষিত ৫২টি সেরা ভ্রমণ গন্তব্যের তালিকায় স্থান পাওয়া দুটি জাপানি শহরের মধ্যে তোইয়ামা একটি। তবে ভ্রমণ আকর্ষণের পাশাপাশি শহরটির এই নগর পুনরুজ্জীবন কৌশল এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। পাহাড়, সমুদ্র, সামুদ্রিক খাদ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির টান শহরটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করেছে।

তোইয়ামার এই বিশেষ নগর পরিকল্পনা বাস্তবে কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা সরেজমিনে দেখার জন্য সম্প্রতি তোইয়ামা নগর কর্তৃপক্ষ বিদেশি সাংবাদিকদের সফরের আয়োজন করে। সফরকালে নগর ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র হিরোহিসা ফুজিই শহরের ভবিষ্যৎ কমপ্যাক্ট সিটি রূপরেখা ও স্মার্ট সিটি গড়ার পরিকল্পনা বিশদভাবে তুলে ধরেন। গত ২৫ আগস্ট সেই সফরে নগর ভবনে সাংবাদিকদের সামনে মেয়র হিরোহিসা ফুজিই তুলে ধরেন শহরের চলমান কমপ্যাক্ট সিটি নীতি ও নতুন স্মার্ট সিটি পরিকল্পনার রূপরেখা। মেয়র বলেন, ‘আমরা শহরতলিসহ সব এলাকার মানুষকে রক্ষা করতে চাই। তোইয়ামার এই নগর ভাবনা এবং এর প্রয়োগ কাছ থেকে দেখতে সম্প্রতি প্রথম আলোসহ টোকিওভিত্তিক বিদেশি গণমাধ্যমের কয়েকজন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানায় শহর কর্তৃপক্ষ।

জাপানের অন্যান্য অঞ্চলের মতো তোইয়ামাতেও জনসংখ্যার হার ক্রমাগত কমছে। ২০১০ সালে শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছানোর পর তা কমতে শুরু করে। ধারণ করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা নেমে আসবে ৩ লাখ ৫০ হাজারে। একই সঙ্গে শহরের মোট বাসিন্দার প্রায় ৩০ শতাংশই প্রবীণ। বড় একটি অংশ শহরতলিতে বাস করায় দৈনিক যাতায়াতের জন্য তাঁরা মূলত ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এর ফলে সার্বজনীন সেবা পৌঁছানো, পরিবহন অবকাঠামো বজায় রাখা এবং বয়স্কদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। এই সংকট সামাল দিতেই পুরো নগর কাঠামোকে গণপরিবহনকেন্দ্রিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নগর পুনর্গঠনের প্রধান হাতিয়ার করা হয় ‘লাইট রেল ট্রানজিট’ (এলআরটি) বা আধুনিক ট্রাম যোগাযোগ ব্যবস্থাকে। এর মূল লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে আনা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবাগুলো যেন মানুষ হেঁটে পাওয়ার মতো দূরত্বে পায়, তা নিশ্চিত করা। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যাত্রীসংকটে পড়া জাপান রেলওয়ের পুরোনো তোইয়ামা পোর্ট লাইনকে দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এলআরটি হিসেবে রূপান্তর করা হয়। সরকারি অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও এটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় বেসরকারি খাতকে। হোনশু দ্বীপের জাপান সাগর উপকূলে অবস্থিত তোইয়ামা আকারে মাঝারি হলেও পরিচয়ে বহুমাত্রিক। এলআরটি হলো পরবর্তী প্রজন্মের ট্রামব্যবস্থা।

এর পর থেকে শহরজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে। ২০০৬ সালের এপ্রিলে চালু হয় তোইয়ামা লাইট রেল। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে শহরের প্রাণকেন্দ্রে যুক্ত করা হয় সেন্ট্রাম লুপ লাইন। ২০১৫ সালের মার্চে শিনকানসেনের উঁচু রেললাইনের নিচ দিয়ে ট্রামপথ বিস্তৃত করা হয় এবং ২০২০ সালের মার্চ নাগাদ উত্তর-দক্ষিণ ট্রাম লাইনের সংযোগ সম্পন্ন হয়। এর মাধ্যমে তোইয়ামা একটি সমন্বিত বহুস্তরের গণপরিবহন শহর হিসেবে পরিচিতি পায়।

উত্তর ও দক্ষিণের ট্রামলাইন যুক্ত হওয়ার পর তোইয়ামা স্টেশনটি পুরো নগরের যাতায়াতের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এতে করে স্থানীয় রেল, এলআরটি এবং শিনকানসেনের মধ্যে যাত্রীদের বদলাকিং বা ট্রানজিট অনেক সহজ হয়ে ওঠে। ট্রামের চলাচলের সময় কমানো, নতুন স্টেশন তৈরি, প্রবীণদের চলাচলের সুবিধার্থে নিচু মেঝের যান ব্যবহার, বাধামুক্ত নকশা এবং আইসি কার্ডে ভাড়া পরিশোধের সুযোগ এনে সেবা আধুনিক করা হয়। এর প্রভাবে এলআরটি চালুর এক দশকের মধ্যে কর্মদিবসে যাত্রী সংখ্যা আগের চেয়ে ২.১ গুণ এবং ছুটির দিনে ৩.৪ গুণ বেড়ে যায়।

উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শহরতলি থেকে প্রবীণসহ সাধারণ মানুষ শহরের কেন্দ্রস্থলে সহজে যাতায়াত করতে শুরু করেন। এতে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়, কেন্দ্রস্থলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে এবং জমির মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের কর রাজস্ব শক্তিশালী হয়। বর্তমানে গণপরিবহন সুবিধার মধ্যে বাস করা মানুষের হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সরকারের লক্ষ্য এই হার ৪২ শতাংশে উন্নীত করা। এ লক্ষ্যে শহরের কেন্দ্রস্থলের কাছে নতুন বাড়ি তৈরিতে ৫ লাখ ইয়েন পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মিউজিয়াম, লাইব্রেরি ও গ্র্যান্ড প্লাজার মতো নাগরিক সুবিধাসমূহ শহরের কেন্দ্রকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

কেন্দ্রীয় এলাকা ছাড়াও শহরতলির অধিবাসীদের সুবিধা নিশ্চিত করতে তোইয়ামা একটি ‘স্কিউয়ার্স অ্যান্ড ডাম্পলিংস’ বা হাবভিত্তিক মডেল অনুসরণ করছে। এখানে গণপরিবহন সংযোগকে স্কিউয়ার্স এবং ছোট ছোট নগর কেন্দ্রগুলোকে ডাম্পলিংস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো একক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল না থেকে গণপরিবহনের মাধ্যমে একাধিক ছোট কেন্দ্রকে সংযুক্ত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। ২০২৬-২০৪৫ মেয়াদের জন্য প্রণীত নতুন নগর মাস্টারপ্ল্যানে খালি জায়গা, পরিত্যক্ত বাড়ি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দেওয়া হচ্ছে।

তোইয়ামার স্মার্ট সিটি পরিকল্পনা কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়; এটি তাদের কমপ্যাক্ট সিটিরই বর্ধিত অংশ। গণপরিবহনে এআই চালিত ‘অন-ডিমান্ড’ বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যাত্রীদের সুবিধাজনক রুট নির্ধারণ করে দেবে, যা প্রবীণ ও গাড়ি না থাকা বাসিন্দাদের হাসপাতাল, বাজার বা অফিসে যাতায়াত সহজ করবে। এ ছাড়া নাগরিকেরা ‘লাইন’ অ্যাপ ব্যবহার করে দুর্যোগের পূর্বাভাস, শিশু পালনসংক্রান্ত তথ্য, সড়ক মেরামতের আবেদন বা মাই নম্বর কার্ড সংক্রান্ত সেবা সহজেই এক প্ল্যাটফর্ম থেকে পাবেন। প্রবীণরা যেন স্মার্টফোনের এই অ্যাপ ও সেবাগুলো সহজে আয়ত্ত করতে পারেন, সে জন্য তোইয়ামা সিটি বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অনলাইন কেনাকাটার সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হাসপাতালে ১৩ দিন চিকিৎসাধীন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী খালেদা আক্তার কল্পনা

গণপরিবহন ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তোইয়ামা কীভাবে বদলে যাচ্ছে

আপডেট সময় ০৯:১৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

জাপানের অনেক আঞ্চলিক শহর যখন দ্রুত জনসংখ্যা হ্রাস, প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত গাড়িনির্ভরতার সমস্যায় ভুগছে, তখন অনন্য এক নগর পরিকল্পনার উদাহরণ হয়ে উঠেছে তোইয়ামা সিটি। আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা, সুপরিকল্পিত আবাসন এবং ডিজিটাল নাগরিক সেবার কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে শহরটি দেখাচ্ছে কীভাবে কম জনসংখ্যা নিয়েও জীবনযাত্রাকে আরও সহজ ও সুসংগঠিত করা সম্ভব। পর্বত ও সমুদ্রঘেরা এ শহরটি নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের ঘোষিত ৫২টি সেরা ভ্রমণ গন্তব্যের তালিকায় স্থান পাওয়া দুটি জাপানি শহরের মধ্যে তোইয়ামা একটি। তবে ভ্রমণ আকর্ষণের পাশাপাশি শহরটির এই নগর পুনরুজ্জীবন কৌশল এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। পাহাড়, সমুদ্র, সামুদ্রিক খাদ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির টান শহরটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করেছে।

তোইয়ামার এই বিশেষ নগর পরিকল্পনা বাস্তবে কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা সরেজমিনে দেখার জন্য সম্প্রতি তোইয়ামা নগর কর্তৃপক্ষ বিদেশি সাংবাদিকদের সফরের আয়োজন করে। সফরকালে নগর ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র হিরোহিসা ফুজিই শহরের ভবিষ্যৎ কমপ্যাক্ট সিটি রূপরেখা ও স্মার্ট সিটি গড়ার পরিকল্পনা বিশদভাবে তুলে ধরেন। গত ২৫ আগস্ট সেই সফরে নগর ভবনে সাংবাদিকদের সামনে মেয়র হিরোহিসা ফুজিই তুলে ধরেন শহরের চলমান কমপ্যাক্ট সিটি নীতি ও নতুন স্মার্ট সিটি পরিকল্পনার রূপরেখা। মেয়র বলেন, ‘আমরা শহরতলিসহ সব এলাকার মানুষকে রক্ষা করতে চাই। তোইয়ামার এই নগর ভাবনা এবং এর প্রয়োগ কাছ থেকে দেখতে সম্প্রতি প্রথম আলোসহ টোকিওভিত্তিক বিদেশি গণমাধ্যমের কয়েকজন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানায় শহর কর্তৃপক্ষ।

জাপানের অন্যান্য অঞ্চলের মতো তোইয়ামাতেও জনসংখ্যার হার ক্রমাগত কমছে। ২০১০ সালে শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছানোর পর তা কমতে শুরু করে। ধারণ করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা নেমে আসবে ৩ লাখ ৫০ হাজারে। একই সঙ্গে শহরের মোট বাসিন্দার প্রায় ৩০ শতাংশই প্রবীণ। বড় একটি অংশ শহরতলিতে বাস করায় দৈনিক যাতায়াতের জন্য তাঁরা মূলত ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এর ফলে সার্বজনীন সেবা পৌঁছানো, পরিবহন অবকাঠামো বজায় রাখা এবং বয়স্কদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। এই সংকট সামাল দিতেই পুরো নগর কাঠামোকে গণপরিবহনকেন্দ্রিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নগর পুনর্গঠনের প্রধান হাতিয়ার করা হয় ‘লাইট রেল ট্রানজিট’ (এলআরটি) বা আধুনিক ট্রাম যোগাযোগ ব্যবস্থাকে। এর মূল লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে আনা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবাগুলো যেন মানুষ হেঁটে পাওয়ার মতো দূরত্বে পায়, তা নিশ্চিত করা। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যাত্রীসংকটে পড়া জাপান রেলওয়ের পুরোনো তোইয়ামা পোর্ট লাইনকে দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এলআরটি হিসেবে রূপান্তর করা হয়। সরকারি অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও এটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় বেসরকারি খাতকে। হোনশু দ্বীপের জাপান সাগর উপকূলে অবস্থিত তোইয়ামা আকারে মাঝারি হলেও পরিচয়ে বহুমাত্রিক। এলআরটি হলো পরবর্তী প্রজন্মের ট্রামব্যবস্থা।

এর পর থেকে শহরজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে। ২০০৬ সালের এপ্রিলে চালু হয় তোইয়ামা লাইট রেল। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে শহরের প্রাণকেন্দ্রে যুক্ত করা হয় সেন্ট্রাম লুপ লাইন। ২০১৫ সালের মার্চে শিনকানসেনের উঁচু রেললাইনের নিচ দিয়ে ট্রামপথ বিস্তৃত করা হয় এবং ২০২০ সালের মার্চ নাগাদ উত্তর-দক্ষিণ ট্রাম লাইনের সংযোগ সম্পন্ন হয়। এর মাধ্যমে তোইয়ামা একটি সমন্বিত বহুস্তরের গণপরিবহন শহর হিসেবে পরিচিতি পায়।

উত্তর ও দক্ষিণের ট্রামলাইন যুক্ত হওয়ার পর তোইয়ামা স্টেশনটি পুরো নগরের যাতায়াতের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এতে করে স্থানীয় রেল, এলআরটি এবং শিনকানসেনের মধ্যে যাত্রীদের বদলাকিং বা ট্রানজিট অনেক সহজ হয়ে ওঠে। ট্রামের চলাচলের সময় কমানো, নতুন স্টেশন তৈরি, প্রবীণদের চলাচলের সুবিধার্থে নিচু মেঝের যান ব্যবহার, বাধামুক্ত নকশা এবং আইসি কার্ডে ভাড়া পরিশোধের সুযোগ এনে সেবা আধুনিক করা হয়। এর প্রভাবে এলআরটি চালুর এক দশকের মধ্যে কর্মদিবসে যাত্রী সংখ্যা আগের চেয়ে ২.১ গুণ এবং ছুটির দিনে ৩.৪ গুণ বেড়ে যায়।

উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শহরতলি থেকে প্রবীণসহ সাধারণ মানুষ শহরের কেন্দ্রস্থলে সহজে যাতায়াত করতে শুরু করেন। এতে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়, কেন্দ্রস্থলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে এবং জমির মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের কর রাজস্ব শক্তিশালী হয়। বর্তমানে গণপরিবহন সুবিধার মধ্যে বাস করা মানুষের হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সরকারের লক্ষ্য এই হার ৪২ শতাংশে উন্নীত করা। এ লক্ষ্যে শহরের কেন্দ্রস্থলের কাছে নতুন বাড়ি তৈরিতে ৫ লাখ ইয়েন পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মিউজিয়াম, লাইব্রেরি ও গ্র্যান্ড প্লাজার মতো নাগরিক সুবিধাসমূহ শহরের কেন্দ্রকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

কেন্দ্রীয় এলাকা ছাড়াও শহরতলির অধিবাসীদের সুবিধা নিশ্চিত করতে তোইয়ামা একটি ‘স্কিউয়ার্স অ্যান্ড ডাম্পলিংস’ বা হাবভিত্তিক মডেল অনুসরণ করছে। এখানে গণপরিবহন সংযোগকে স্কিউয়ার্স এবং ছোট ছোট নগর কেন্দ্রগুলোকে ডাম্পলিংস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো একক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল না থেকে গণপরিবহনের মাধ্যমে একাধিক ছোট কেন্দ্রকে সংযুক্ত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। ২০২৬-২০৪৫ মেয়াদের জন্য প্রণীত নতুন নগর মাস্টারপ্ল্যানে খালি জায়গা, পরিত্যক্ত বাড়ি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দেওয়া হচ্ছে।

তোইয়ামার স্মার্ট সিটি পরিকল্পনা কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়; এটি তাদের কমপ্যাক্ট সিটিরই বর্ধিত অংশ। গণপরিবহনে এআই চালিত ‘অন-ডিমান্ড’ বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যাত্রীদের সুবিধাজনক রুট নির্ধারণ করে দেবে, যা প্রবীণ ও গাড়ি না থাকা বাসিন্দাদের হাসপাতাল, বাজার বা অফিসে যাতায়াত সহজ করবে। এ ছাড়া নাগরিকেরা ‘লাইন’ অ্যাপ ব্যবহার করে দুর্যোগের পূর্বাভাস, শিশু পালনসংক্রান্ত তথ্য, সড়ক মেরামতের আবেদন বা মাই নম্বর কার্ড সংক্রান্ত সেবা সহজেই এক প্ল্যাটফর্ম থেকে পাবেন। প্রবীণরা যেন স্মার্টফোনের এই অ্যাপ ও সেবাগুলো সহজে আয়ত্ত করতে পারেন, সে জন্য তোইয়ামা সিটি বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অনলাইন কেনাকাটার সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।