রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ছয় মাসের মধ্যে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন বা ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ঢাকা মহানগরের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সাম্প্রতিক বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যমান ৯৮টি বাস রুটকে পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি রুটে নামিয়ে আনা হবে এবং প্রতিটি রুটে নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনা করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সংস্থাটির পক্ষ থেকে একটি উপস্থাপনা দেখানো হয়।
প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় বাসের নির্ধারিত থামার স্থান বা স্টপেজ, কাউন্টারভিত্তিক টিকিট, ই-টিকেটিং ব্যবস্থা এবং জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হবে। প্রথম দুই মাসে রুটগুলোতে স্টপেজ নির্ধারণ, পুরোনো বাস মেরামত এবং চালকদের মাসিক বেতনে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রাথমিকভাবে দুটি রুট চূড়ান্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. মশিউর রহমান জানান, ৩২টি রুটের মধ্যে আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাঁচটি রুটে এই ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যমান পরিবহন মালিকদের সমন্বয়ে পাঁচটি কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে এক রুটে একই রঙের বাস চলাচল নিশ্চিত করা হবে। এবার পুরোনো বাস রং করে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী ওঠানো, অন্য বাসকে পেছনে ফেলার চেষ্টা এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা নিত্যদিনের ঘটনা। সমাধান হিসেবে ২০০৪ সালে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছিল।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামানের মতে, রুট কমিয়ে ৩২টি করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রতিটি রুটে বাসের সংখ্যা ও মান নিয়ন্ত্রণ, সময়সূচি মেনে চলা এবং নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি বাসমালিকদের রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে এনে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। যাত্রী পেতে বাসগুলোর মধ্যে চলে প্রতিযোগিতা।
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে ডিটিসিএ ৫২টি স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন চলাচল পর্যবেক্ষণ করেছে। ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর ওঠানামা এবং ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রীর গন্তব্য বিশ্লেষণ করে ড্রোনের সাহায্যে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের প্রকৌশলগত নকশা তৈরি করা হয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় চার হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে বাস চলাচলের উপযোগী মাত্র ২৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬৮ কিলোমিটার এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১২ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে।
প্রস্তাবিত ৩২টি রুটের মধ্যে পাঁচটিতে ১২ মিটার দীর্ঘ ও ৫২ আসনের আধুনিক বাস চালুর প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে বেরাইদ-খিলগাঁও রেলগেট, টিটিপাড়া-সদরঘাট, কাঁচপুর-গাজীপুর চৌরাস্তা, নন্দনপার্ক-ডেমরা এবং শ্রীপুর-ঢাকেশ্বরী মন্দির উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য ২৫টি চক্রাকার বাস রুট চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে এবং প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল কমাতে ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক এবং পরবর্তীতে ২০২১ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগসহ বিগত দেড় দশকে একাধিকবার রুট র্যাশনালাইজেশনের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও মালিকদের অনাগ্রহ ও সমন্বয়ের অভাবে তা সফল হয়নি। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে পরীক্ষামূলকভাবে ঘাটারচর থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ২৬ নম্বর রুটে ঢাকা নগর পরিবহনের বাস চালু করা হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে এবং ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে এই উদ্যোগ পুনরুজ্জীবিত করেছেন। কিন্তু পরিবহনমালিকদের অনাগ্রহ, রাজনৈতিক প্রভাব ও সমন্বয়ের অভাবে কোনো উদ্যোগই টেকেনি। পরিবহন খাত–সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০১৫ সালের পরিকল্পনায় পুরোনো বাস তুলে দিয়ে তিন থেকে চার হাজার নতুন বাস নামানোর কথা ছিল। এ লক্ষ্যে সরকার, ব্যাংক ও পরিবহনমালিকদের মধ্যে অনেক সভা হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, অনুমোদিত ৪১৮টি রুটের মধ্যে ৯৮টি রুটে ৬৬টি কোম্পানির প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাস চলাচল করে। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম জানিয়েছেন, তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, তবে নতুন বাস চালুর জন্য সরকারের নীতিসহায়তা ও ব্যাংকঋণের সুবিধা প্রয়োজন। অতীতে বিআরটিসিকে দিয়ে এ ধরনের উদ্যোগ সফল হয়নি, তাই কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে পরিবহন খাত।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 





















