ঢাকা ১২:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চীন ও মালয়েশিয়া ঐকমত্য পোষণ করেছে: মাহদী আমিন ভিসা চালুর ঘোষণা: স্বাগত জানাল পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী ও বিধায়করা ফ্যামিলি কার্ড আপনাকে খুঁজতে হবে না, পৌঁছে যাবে আপনার দোরগোড়ায়’ মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ ভূমিমন্ত্রীর চট্টগ্রামে সেপটিক ট্যাংকে নেমে প্রাণ গেল ৪ জনের বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপে খেলবে: আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত পবিত্র আশুরা উপলক্ষে দেশবাসীকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের শুভেচ্ছা টাঙ্গাইলে ‘জনতার সংযোগ’ কার্যক্রমের উদ্বোধন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দক্ষ মানবসম্পদ গড়তে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে সরকার: আমান উল্লাহ আমান

কারবালা, রক্তিম প্রান্তরের অনন্ত আলোকরেখা

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

ইতিহাসের বিস্তীর্ণ মরুকোষে এমন কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল কালপঞ্জির একটি তারিখ নয়, বরং মানবিক চেতনার অন্তর্লিখিত শপথপত্র। এমন কিছু প্রান্তর আছে, যেগুলো ভৌগোলিক মানচিত্রের সীমারেখা অতিক্রম করে পরিণত হয়েছে বিবেকের ভূগোলে।

কারবালা তেমনই এক নাম যেখানে বালুকণার সঙ্গে মিশে আছে আত্মত্যাগের অমৃতরক্ত, আর মরুর বাতাসে আজও ভেসে আসে সত্যের জন্য অবিচল দাঁড়িয়ে থাকার মহিমান্বিত প্রতিধ্বনি।

হিজরি ৬১ সালের আশুরার সেই রৌদ্রদগ্ধ অপরাহ্ন কেবল একটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং একটি অনির্বাণ নৈতিক মহাকাব্যের সূচনা। ফোরাতের তীরে সেদিন তলোয়ারের ঝনঝনানি যতটা উচ্চারিত হয়েছিল, তার চেয়েও প্রবলভাবে উচ্চারিত হয়েছিল আদর্শের আহ্বান।

রাজশক্তির প্রাচুর্য, সামরিক বলয়ের বিপুলতা এবং ক্ষমতার উদ্ধত অট্টালিকার বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল একটি ক্ষুদ্র কাফেলা কিন্তু সেই কাফেলার অন্তরে ছিল বিশ্বাসের এমন দীপ্তি, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রম করেও ম্লান হয়নি।

সেই কাফেলার অগ্রনায়ক ছিলেন রাসুলুল্লাহ সা. এর নয়নমণি, জান্নাতের যুবকদের নেতা, হযরত ইমাম হুসাইন রা.। তার পরিচয় কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নয়, তিনি ইসলামী নৈতিকতার এক জীবন্ত প্রতীক, আত্মমর্যাদার এক জাগ্রত মিনার এবং সত্যনিষ্ঠতার এক অবিনশ্বর আলোকস্তম্ভ।

কারবালার ঘটনাকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসের প্রতি অবিচার। এটি ছিল আদর্শ বনাম আপস, বিবেক বনাম ভীতি, ন্যায় বনাম ক্ষমতার এক গভীরতম মুকাবিলা। যখন শাসনের অলিন্দে নীতির পরিবর্তে আনুগত্যের দাবি উচ্চারিত হচ্ছিল, তখন হুসাইন রা. উপলব্ধি করেছিলেন কখনো কখনো নীরবতা অপরাধের সহযোগী হয়ে ওঠে। ফলে তিনি এমন এক পথ বেছে নিয়েছিলেন, যার শেষপ্রান্তে ছিল শাহাদাত, কিন্তু যার অন্তর্নিহিত আলো ছিল চিরস্থায়ী।

কারবালার প্রান্তরে ফোরাতের জলরাশি ছিল দৃশ্যমান, অথচ পিপাসার্ত শিশুদের অধরা। আকাশ ছিল বিস্তৃত, অথচ স্বাধীনতার পরিসর ছিল সংকুচিত। পৃথিবী ছিল বিশাল, অথচ সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। তবুও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় সংখ্যা কখনো সত্যের মানদণ্ড নয়। কারণ নৈতিক মহত্ত্বের পরিমাপ সৈন্যবাহিনীর বহরে নয়, বরং আদর্শের দৃঢ়তায়।

আশুরার সেই দিনটিতে যে রক্তধারা কারবালার বালুকায় মিশে গিয়েছিল, তা কেবল শাহাদাতের স্মারক নয়; বরং মুসলিম সভ্যতার নৈতিক অভিধানের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়। ইমাম হুসাইন রা. এর শাহাদাত মানবজাতিকে শিখিয়েছে, কখনো কখনো পরাজয়ের দৃশ্যপটের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত বিজয়ের মহিমা। বাহ্যিক শক্তির কাছে পরাভূত হয়েও আদর্শের ইতিহাসে বিজয়ী হওয়ার যে অনুপম দৃষ্টান্ত, কারবালা তার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রম করেও কারবালার আবেদন নিঃশেষ হয়নি। কারণ এটি কেবল একটি স্মৃতিচারণ নয়, এটি আত্মসমালোচনার আয়না, ন্যায়বোধের মানদণ্ড এবং বিবেকের পুনর্জাগরণের আহ্বান। পৃথিবীর অসংখ্য সাম্রাজ্য ধুলিসাৎ হয়েছে, ক্ষমতার অসংখ্য সিংহাসন ভেঙে পড়েছে, কিন্তু কারবালার শিক্ষা এখনও অমলিন। মরুর সেই রক্তিম প্রান্তর আজও মানবতাকে বলে যায় সত্যকে হত্যা করা যায় না, আদর্শকে বন্দি করা যায় না, আর আত্মত্যাগের আলো কখনো নিভে যায় না।

এই কারণেই কারবালা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের শোকগাথা নয়, এটি সমগ্র মানবতার নৈতিক উত্তরাধিকার। এটি ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা এমন এক অমর আলোকরেখা, যা যুগে যুগে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ক্ষমতার স্থায়িত্ব ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্যের দীপ্তি অনন্ত।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চীন ও মালয়েশিয়া ঐকমত্য পোষণ করেছে: মাহদী আমিন

কারবালা, রক্তিম প্রান্তরের অনন্ত আলোকরেখা

আপডেট সময় ০৬:২০:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

ইতিহাসের বিস্তীর্ণ মরুকোষে এমন কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল কালপঞ্জির একটি তারিখ নয়, বরং মানবিক চেতনার অন্তর্লিখিত শপথপত্র। এমন কিছু প্রান্তর আছে, যেগুলো ভৌগোলিক মানচিত্রের সীমারেখা অতিক্রম করে পরিণত হয়েছে বিবেকের ভূগোলে।

কারবালা তেমনই এক নাম যেখানে বালুকণার সঙ্গে মিশে আছে আত্মত্যাগের অমৃতরক্ত, আর মরুর বাতাসে আজও ভেসে আসে সত্যের জন্য অবিচল দাঁড়িয়ে থাকার মহিমান্বিত প্রতিধ্বনি।

হিজরি ৬১ সালের আশুরার সেই রৌদ্রদগ্ধ অপরাহ্ন কেবল একটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং একটি অনির্বাণ নৈতিক মহাকাব্যের সূচনা। ফোরাতের তীরে সেদিন তলোয়ারের ঝনঝনানি যতটা উচ্চারিত হয়েছিল, তার চেয়েও প্রবলভাবে উচ্চারিত হয়েছিল আদর্শের আহ্বান।

রাজশক্তির প্রাচুর্য, সামরিক বলয়ের বিপুলতা এবং ক্ষমতার উদ্ধত অট্টালিকার বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল একটি ক্ষুদ্র কাফেলা কিন্তু সেই কাফেলার অন্তরে ছিল বিশ্বাসের এমন দীপ্তি, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রম করেও ম্লান হয়নি।

সেই কাফেলার অগ্রনায়ক ছিলেন রাসুলুল্লাহ সা. এর নয়নমণি, জান্নাতের যুবকদের নেতা, হযরত ইমাম হুসাইন রা.। তার পরিচয় কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নয়, তিনি ইসলামী নৈতিকতার এক জীবন্ত প্রতীক, আত্মমর্যাদার এক জাগ্রত মিনার এবং সত্যনিষ্ঠতার এক অবিনশ্বর আলোকস্তম্ভ।

কারবালার ঘটনাকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসের প্রতি অবিচার। এটি ছিল আদর্শ বনাম আপস, বিবেক বনাম ভীতি, ন্যায় বনাম ক্ষমতার এক গভীরতম মুকাবিলা। যখন শাসনের অলিন্দে নীতির পরিবর্তে আনুগত্যের দাবি উচ্চারিত হচ্ছিল, তখন হুসাইন রা. উপলব্ধি করেছিলেন কখনো কখনো নীরবতা অপরাধের সহযোগী হয়ে ওঠে। ফলে তিনি এমন এক পথ বেছে নিয়েছিলেন, যার শেষপ্রান্তে ছিল শাহাদাত, কিন্তু যার অন্তর্নিহিত আলো ছিল চিরস্থায়ী।

কারবালার প্রান্তরে ফোরাতের জলরাশি ছিল দৃশ্যমান, অথচ পিপাসার্ত শিশুদের অধরা। আকাশ ছিল বিস্তৃত, অথচ স্বাধীনতার পরিসর ছিল সংকুচিত। পৃথিবী ছিল বিশাল, অথচ সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। তবুও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় সংখ্যা কখনো সত্যের মানদণ্ড নয়। কারণ নৈতিক মহত্ত্বের পরিমাপ সৈন্যবাহিনীর বহরে নয়, বরং আদর্শের দৃঢ়তায়।

আশুরার সেই দিনটিতে যে রক্তধারা কারবালার বালুকায় মিশে গিয়েছিল, তা কেবল শাহাদাতের স্মারক নয়; বরং মুসলিম সভ্যতার নৈতিক অভিধানের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়। ইমাম হুসাইন রা. এর শাহাদাত মানবজাতিকে শিখিয়েছে, কখনো কখনো পরাজয়ের দৃশ্যপটের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত বিজয়ের মহিমা। বাহ্যিক শক্তির কাছে পরাভূত হয়েও আদর্শের ইতিহাসে বিজয়ী হওয়ার যে অনুপম দৃষ্টান্ত, কারবালা তার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রম করেও কারবালার আবেদন নিঃশেষ হয়নি। কারণ এটি কেবল একটি স্মৃতিচারণ নয়, এটি আত্মসমালোচনার আয়না, ন্যায়বোধের মানদণ্ড এবং বিবেকের পুনর্জাগরণের আহ্বান। পৃথিবীর অসংখ্য সাম্রাজ্য ধুলিসাৎ হয়েছে, ক্ষমতার অসংখ্য সিংহাসন ভেঙে পড়েছে, কিন্তু কারবালার শিক্ষা এখনও অমলিন। মরুর সেই রক্তিম প্রান্তর আজও মানবতাকে বলে যায় সত্যকে হত্যা করা যায় না, আদর্শকে বন্দি করা যায় না, আর আত্মত্যাগের আলো কখনো নিভে যায় না।

এই কারণেই কারবালা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের শোকগাথা নয়, এটি সমগ্র মানবতার নৈতিক উত্তরাধিকার। এটি ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা এমন এক অমর আলোকরেখা, যা যুগে যুগে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ক্ষমতার স্থায়িত্ব ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্যের দীপ্তি অনন্ত।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর