আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের প্রায় ৭০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো মাজার কর্তৃপক্ষের আপত্তি ও অসন্তোষের মাঝেই দানবাক্সের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হয়েছে।
সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মাজারের দানের অর্থ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত এবং সিলগালা করা তিনটি বড় ডেগ খোলা হয়।
মাত্র ৩ দিনে জমা হওয়া এই দানবাক্স ও ডেকচিগুলো থেকে নগদ ১৭ লাখ ৬৬ হাজার ৫৫৯ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। নগদ টাকার সিংহভাগই ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট হলেও এতে প্রচুর ১০০, ৫০, ২০ ও ১০ টাকার নোট ছিল। দেশি মুদ্রা ছাড়াও সোনা, রিয়াল, ডলার ও পাউন্ড পাওয়া গেছে। এছাড়াও ছোট ছোট সোনার টুকরোও রয়েছে।
মেশিন দিয়ে টাকা গণনার এই কাজে দরগাহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জন স্বেচ্ছাসেবক এবং আরও ২-৩ জন তদারকিতে যুক্ত ছিলেন।
এদিকে মঙ্গলবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেট সফরে গেলে দরগাহ প্রসঙ্গ নিয়ে বৈঠক করার কথা রয়েছে।
এর আগে গত ১২ জুন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম মাজার পরিদর্শনে গিয়ে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ঘোষণা দেন এবং এরই অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার বিকালে মাজারের ঐতিহাসিক ৩টি ডেগ সিলগালা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিজস্ব নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়।
এ উদ্যোগের পর মাজার সংশ্লিষ্টদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিলে এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সমালোচনার মুখে গত রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে হঠাৎ প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
পূর্বে ডিসি নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন ১৫ দিন পর টাকা গণনা করা হবে, তবে প্রত্যাহার আদেশের পর সিলেট ছাড়ার আগে সোমবার তড়িঘড়ি করে তিনি নিজেই উপস্থিত থেকে এই প্রকাশ্যে গণনার কাজ শুরু করেন। যদিও গণনার কিছু সময় পরই তিনি মাজার ত্যাগ করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১০ মাসের মাথায় এই হঠাৎ প্রত্যাহারের সরকারি প্রজ্ঞাপনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ নেই। তবে দরগাহের ডেগ সিলগালা করা ও মাজারের তহবিল ব্যবস্থাপনায় হাত দেওয়া এবং একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগকেই এর মূল কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ডিসি সারওয়ার আলমের এই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের পর সিলেটে তীব্র পক্ষে-বিপক্ষে কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে ‘সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ’, ‘যুব সমাজ’ ও ‘সচেতন তরুণ’সহ বিভিন্ন ব্যানারে জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
বিক্ষোভকারীরা ‘ডিসি সারওয়ারের প্রত্যাহার মানি না’, ‘সিলেটবাসীর দরকার ডিসি সারওয়ার’ স্লোগান দিয়ে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের চক্রান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সকালে কার্যালয়ে প্রবেশের সময় ডিসি সারওয়ার আলম বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে করমর্দন করেন।
এ প্রত্যাহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সিলেট জেলা খেলাফত মজলিস, মহানগর জামায়াত, মহানগর হেফাজতে ইসলাম এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ বিভিন্ন ইসলামী দলসমূহ, জামায়াতের নায়েবে আমির নুরুল ইসলাম বাবুল এবং খেলাফত মজলিসের সভাপতি মাওলানা নেহাল আহমদ।
তারা বলেন, ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফেরানো ও ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ফান্ড গঠনকারী একজন জনবান্ধব ডিসিকে মাজারকেন্দ্রিক সুবিধাভোগী ও অপশক্তির ষড়যন্ত্রে হঠাৎ প্রত্যাহার করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
অপরদিকে মাজার নিয়ে জেলা প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহ্য ও মাজার সংস্কৃতিবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়ে সিলেটের ৬৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক এক যৌথ বিবৃতি প্রদান করেছেন। বিবৃতিতে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউদ্দিন আহমেদ, প্রবীণ আইনজীবী তবারক হোসেন ও সিলেট পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান বাবরুল হোসেনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সই করেন। দরগাহে অতীতে কখনো না হওয়া এমন প্রশাসনিক হস্তক্ষেপকে একটি বিশেষ মহলের অভিসন্ধি পূরণের চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 


















