ঢাকা ০১:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘আমার মেয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে, সে অন্ধকারকে ভয় পায়’

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

পূর্ব তেহরানের রেসালাত এলাকায় ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়ের জন্য কান্না করছিলেন এক মা। আর কয়েকদিন ধরে অপেক্ষা করছেন কখন উদ্ধারকর্মীরা আসবেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে… সে অন্ধকারকে ভয় পায়। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় মেয়েকে এখনও বের করা সম্ভব হয়নি।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা হামলায় গত এক মাস ধরে ইরান কার্যত যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এসব হামলা মূলত সরকারি ও সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো হলেও আশপাশের বেসামরিক এলাকাগুলোতেও এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে।

বিবিসির অনুসন্ধানী ইউনিটের সংগ্রহ করা তথ্য ও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তেহরানের জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অবস্থিত রাষ্ট্র-সম্পর্কিত স্থাপনাগুলোকেই লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালানো হয়েছে। এতে আশপাশের আবাসিক ভবনগুলোও ধ্বংস হয়ে গেছে।

গত ৯ মার্চ রেসালাতে একটি বহুতল আবাসিক ভবনে হামলায় বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই এক হামলাতেই ৪০ থেকে ৫০ জন নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে এক নারী ও তার ছোট মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে; তবে ওই নারীর স্বামী বেঁচে গেছেন।

৫৫ বছর বয়সী এক বাসিন্দা বলেন, ‘হামলাটা আচমকাই হয়েছিল যে- আমি ঘরের ভেতর ছিটকে পড়ি। এখন আমার সবকিছু ধ্বংসস্তূপের নিচে।’

স্থানীয়রা বলছেন, হামলার সময় কোনো সাইরেন বা আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয় না। ‘কোনো সতর্কতা নেই, শুধু বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়’, বলেন এক বাসিন্দা।

এ ছাড়া আশ্রয়কেন্দ্র, সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা বা জরুরি সহায়তার ক্ষেত্রেও ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই জানেন না কোথায় গেলে নিরাপদ থাকবেন। অন্যদিকে ইন্টারনেট সীমিত থাকায় তথ্যপ্রবাহও ব্যাহত হচ্ছে, ফলে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।

ইসরায়েলি বাহিনী বলেছে, তারা ইরানের বাসিজ নামের একটি আধাসামরিক বাহিনীর স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে উপগ্রহচিত্র ও ঘটনাস্থলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আশপাশের একাধিক আবাসিক ভবনও ধ্বংস হয়েছে।

বিবিসির বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, বিস্ফোরণের প্রভাবে ৬৫ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি মার্ক ৮০ সিরিজের ভারী বোমা ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী মার্ক ৮৪ বোমার (ওজন প্রায় ২ হাজার পাউন্ড) ব্যবহার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এত শক্তিশালী বোমা ব্যবহার বেসামরিক মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী।

ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে তারা ইরানে ১২ হাজারের বেশি বোমা ফেলেছে, যার মধ্যে শুধু তেহরানেই ৩ হাজার ৬০০টি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, তারা ৯ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে পুলিশ স্টেশন, সামরিক স্থাপনা, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা। তবে এসব স্থাপনার অনেকগুলোই আবাসিক এলাকার মধ্যে অবস্থিত।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, যুদ্ধে বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনাকে সুরক্ষিত রাখা বাধ্যতামূলক।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

‘আমার মেয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে, সে অন্ধকারকে ভয় পায়’

আপডেট সময় ০৭:১৮:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

পূর্ব তেহরানের রেসালাত এলাকায় ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়ের জন্য কান্না করছিলেন এক মা। আর কয়েকদিন ধরে অপেক্ষা করছেন কখন উদ্ধারকর্মীরা আসবেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে… সে অন্ধকারকে ভয় পায়। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় মেয়েকে এখনও বের করা সম্ভব হয়নি।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা হামলায় গত এক মাস ধরে ইরান কার্যত যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এসব হামলা মূলত সরকারি ও সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো হলেও আশপাশের বেসামরিক এলাকাগুলোতেও এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে।

বিবিসির অনুসন্ধানী ইউনিটের সংগ্রহ করা তথ্য ও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তেহরানের জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অবস্থিত রাষ্ট্র-সম্পর্কিত স্থাপনাগুলোকেই লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালানো হয়েছে। এতে আশপাশের আবাসিক ভবনগুলোও ধ্বংস হয়ে গেছে।

গত ৯ মার্চ রেসালাতে একটি বহুতল আবাসিক ভবনে হামলায় বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই এক হামলাতেই ৪০ থেকে ৫০ জন নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে এক নারী ও তার ছোট মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে; তবে ওই নারীর স্বামী বেঁচে গেছেন।

৫৫ বছর বয়সী এক বাসিন্দা বলেন, ‘হামলাটা আচমকাই হয়েছিল যে- আমি ঘরের ভেতর ছিটকে পড়ি। এখন আমার সবকিছু ধ্বংসস্তূপের নিচে।’

স্থানীয়রা বলছেন, হামলার সময় কোনো সাইরেন বা আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয় না। ‘কোনো সতর্কতা নেই, শুধু বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়’, বলেন এক বাসিন্দা।

এ ছাড়া আশ্রয়কেন্দ্র, সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা বা জরুরি সহায়তার ক্ষেত্রেও ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই জানেন না কোথায় গেলে নিরাপদ থাকবেন। অন্যদিকে ইন্টারনেট সীমিত থাকায় তথ্যপ্রবাহও ব্যাহত হচ্ছে, ফলে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।

ইসরায়েলি বাহিনী বলেছে, তারা ইরানের বাসিজ নামের একটি আধাসামরিক বাহিনীর স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে উপগ্রহচিত্র ও ঘটনাস্থলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আশপাশের একাধিক আবাসিক ভবনও ধ্বংস হয়েছে।

বিবিসির বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, বিস্ফোরণের প্রভাবে ৬৫ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি মার্ক ৮০ সিরিজের ভারী বোমা ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী মার্ক ৮৪ বোমার (ওজন প্রায় ২ হাজার পাউন্ড) ব্যবহার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এত শক্তিশালী বোমা ব্যবহার বেসামরিক মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী।

ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে তারা ইরানে ১২ হাজারের বেশি বোমা ফেলেছে, যার মধ্যে শুধু তেহরানেই ৩ হাজার ৬০০টি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, তারা ৯ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে পুলিশ স্টেশন, সামরিক স্থাপনা, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা। তবে এসব স্থাপনার অনেকগুলোই আবাসিক এলাকার মধ্যে অবস্থিত।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, যুদ্ধে বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনাকে সুরক্ষিত রাখা বাধ্যতামূলক।