আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
রমজান মাসের প্রথম দশক—যা রহমতের সময় হিসেবে পরিচিত—শেষ হতে না হতেই অনেকের মনে এক ধরনের অপূর্ণতার অনুভূতি জন্ম নেয়। মাসের শুরুতে যে উদ্দীপনা ও আগ্রহ নিয়ে ইবাদত শুরু হয়েছিল, দশ দিন পার হওয়ার পর অনেকের মধ্যেই সেই উৎসাহে কিছুটা ভাটা দেখা যায়। শাবান মাসে করা ইবাদতের পরিকল্পনা বা নির্ধারিত রুটিন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেকেই নিজেকে পিছিয়ে পড়া অবস্থায় খুঁজে পান। তাই এই আধ্যাত্মিক স্থবিরতা কাটিয়ে রমজানের বাকি সময়কে ফলপ্রসূ করার জন্য এখনই সচেতন হওয়া জরুরি।
রমজানের প্রথম সপ্তাহে মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। তারাবির নামাজে অংশ নিতে গিয়ে অনেক সময় জায়গা সংকুলান করাই কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু মাসের মাঝামাঝি আসতেই সেই ভিড় ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ইফতার পার্টির আধিক্য, রাত জেগে আড্ডা কিংবা অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততার কারণে অনেকের ইবাদতের একাগ্রতায় ভাটা পড়ে।
অনেকেই মনে করেন, রমজান তো এখনো অনেক বাকি—এই ভাবনাই অজান্তে অলসতার জন্ম দেয়। ফলে যখন শেষ দশক ঘনিয়ে আসে, তখন তাড়াহুড়ো করে ইবাদত বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাড়াহুড়োর সেই ইবাদতে অনেক সময় মনোযোগ ও আন্তরিকতার ঘাটতি থেকে যায়।
রমজানকে অর্থবহ করে তুলতে এবং পরবর্তীতে আফসোস এড়াতে ইসলামিক স্কলাররা কয়েকটি কার্যকর কৌশলের কথা বলেছেন—
১. বেশি বেশি দোয়া ও আল্লাহর ওপর ভরসা:
রমজানকে ‘রমজান কারিম’ বলা হয়, অর্থাৎ মহানুভবতার মাস। এই মাসে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের জন্য সওয়াব অর্জনের অসংখ্য সুযোগ খুলে দেন। তাই রমজানের পরিকল্পনা সফল করতে নিজের সামর্থ্যের ওপর ভরসার চেয়ে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় আমরা নিজের পরিকল্পনা বা রুটিন কঠোরভাবে মেনে চলতে গিয়ে ব্যর্থ হলে হতাশ হয়ে পড়ি। অথচ রোজাদারের দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে হাদিসে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তাই প্রতিদিন আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে—তিনি যেন আমাদের ইবাদত কবুল করেন এবং ইবাদতকে সহজ করে দেন।
২. প্রতিদিন নিয়ত নবায়ন করা:
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, প্রতিটি কাজ তার নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে দিনের আমলগুলো পর্যালোচনা করা এবং পরের দিনের জন্য নতুন করে মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এই আত্মমূল্যায়ন আপনার ইবাদতের উদ্দেশ্যকে পরিষ্কার করবে এবং পরদিন নতুন উদ্যমে ইবাদতে মনোযোগী হতে সাহায্য করবে।
৩. মনোযোগ নষ্টকারী বিষয় থেকে দূরে থাকা:
ব্যস্ত জীবনে অনেককেই অফিস, ব্যবসা বা পড়াশোনার ফাঁকে রোজা ও ইবাদত করতে হয়। কিন্তু টেলিভিশন দেখা, গান শোনা বা ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের মূল্যবান সময় কেড়ে নেয়। অনেক সময় রমজানের শুরুতে এসব থেকে দূরে থাকলেও মাঝপথে এসে আবার পুরোনো অভ্যাস ফিরে আসে।
বলা হয়, একটি নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে বা পুরোনো অভ্যাস ত্যাগ করতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে। তাই রমজানকে একটি সুযোগ হিসেবে নিয়ে অপ্রয়োজনীয় অভ্যাসগুলো ত্যাগ করার দৃঢ় সংকল্প নেওয়া প্রয়োজন।
এছাড়াও ক্ষমার দশকের ইবাদতের অবহেলা থেকে বাঁচার কিছু কার্যকর কৌশল—
১. বিশেষ দোয়া ও ইস্তিগফার: প্রতিনিয়ত—
اَللَّهُمَّ اِنِّى اَعُوْذُبِكَ مِنْ شَرِّ سَمْعِىْ وَ شَرِّ بَصَرِىْ وَ شَرِّ لِسَانِىْ وَ شَرِّ قَلْبِىْ وَ شَرِّ مَنِيِّىْ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন শাররি সাময়ি ওয়া শাররি বাসারি ওয়া সাররি লিসানি ওয়া সাররি ক্বালবি ওয়অ সাররি মানিয়্যি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আমার কানের অপকারিতা, চোখের অপকারিতা, জবানের অপকারিতা, অন্তরের অপকারিতা এবং বীর্জের অপকারিতা থেকে আশ্রয় চাই।
এছাড়া ‘আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিম’ ও অন্যান্য ইস্তিগফার বেশি বেশি পড়ুন।
২. তারাবি ও ইবাদতে একাগ্রতা: রমজানের মাঝপথে এসে ইবাদতে যে ভাটা পড়ে, তা কাটাতে তারাবির নামাজে অলসতা না করা এবং ইফতার পার্টির আড্ডা কমিয়ে ইবাদতের সময় বাড়ানো।
৩. অহেতুক আড্ডা বর্জন: রাত জেগে অযথা আড্ডা বা মোবাইল ব্যবহারের কারণে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ ও সেহরির সময় ইবাদত নষ্ট হয়। তাই আড্ডা ও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন।
৪. গুনাহমুক্ত জীবন: এই দশকটি গুনাহ মাফের, তাই নতুন করে কোনো গুনাহে লিপ্ত না হওয়া। চোখের হেফাজত, গিবত থেকে বেঁচে থাকা এবং অন্তরের পবিত্রতা বজায় রাখা।
৫. ইতিকাফের মানসিকতা তৈরি করা: সম্ভব হলে রমজানের শেষ দশকের ন্যায় এই দশকেও আল্লাহর ঘরকে কেন্দ্র করে ইতিকাফের মাধ্যমে ইবাদতে মগ্ন হওয়া।
৬. লক্ষ্য নির্ধারণ: ক্ষমার এই দশকের প্রতিটি দিন যেন গুনাহমুক্ত হয় এবং বিগত জীবনের ভুলগুলোর জন্য আন্তরিক অনুশোচনা করা, এটি অলসতা দূর করতে সাহায্য করে।
মূল কথা হলো— আল্লাহ তাআলার রহমত ও ক্ষমা থেকে নিরাশ না হয়ে, এই সময়টুকু সর্বোচ্চ কাজে লাগানো, কারণ অলসতা করলে পরে অনুতাপ করতে হয়।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, রমজান কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের একটি প্রশিক্ষণ। সঠিক পরিকল্পনা, আন্তরিকতা এবং একাগ্রতার মাধ্যমে মাসের বাকি দিনগুলো কাজে লাগাতে পারলে আমরা এই পবিত্র সময়ের সর্বোচ্চ বরকত অর্জন করতে পারি।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























