ঢাকা ০৩:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘৪ জনের নাম বাদ না দিলে তোরও একই অবস্থা হবে’

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

‘তুই ডলি? তোর জামাই খুন হয়েছে না? তুই বেশি ফালাফালি করছিস। চারজনের নাম বাদ না দিলে তোরও একই অবস্থা হবে।’ শনিবার দুপুরে এমন একটি ফোনকল আসে রাজধানীর শাহজাহানপুরে সন্ত্রাসীদের গুলীতে নিহত আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপুর স্ত্রীর ডলির কাছে। ফারহানা ইসলাম ডলি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর। এ ধরনের ফোন পাওয়ার পর তিনি চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে প্রতিটি মুহূর্ত পার করছেন। ইতোমধ্যে থানায় জিডি করাসহ জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সরকারি দলের এ কমিশনার। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।

মোবাইল ফোনে দেওয়া ওই হুমকির পর শনিবার সন্ধ্যায় শাহজাহানপুর থানায় গিয়ে তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডি নং ৮৬৮। বিষয়টি মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকেও জানানো হয়েছে। জনৈক আশিক কল করে যেই চারজনের নাম বাদ দিতে বলেছেন তাদের সম্পর্কেও পুলিশকে বিস্তারিত জানিয়েছেন টিপুর স্ত্রী। এরা হলেন-মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সোহেল শাহরিয়ার ও মতিঝিল থানার ১০নং ওয়ার্ড যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি মারুফ রেজা সাগর। এরা দুজনই ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন। অপর দুজন হলেন-ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মারুফ আহমেদ মনসুর ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আশরাফ তালুকদার। তবে এই দুজনকে এখন পর্যন্ত পুলিশ এ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। কিন্তু ফোন করে তাদের নামও মামলা থেকে কেন প্রত্যাহার করতে বলা হলো তা নিয়ে নতুন করে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে মনসুরের ঘনিষ্ঠজন হিসাবে পরিচিত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মাহবুবুর রহমান টিটুকেও হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেফতার করে ডিবি।

এদিকে জিডিতে টিপুর স্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘শনিবার বেলা ১টা ২৩ মিনিটে আমার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে +৫২৯৪০ নম্বর থেকে একজন কল করেন। তিনি নিজেকে আশিক পরিচয় দিয়ে তার স্বামী হত্যার মামলা থেকে সাগর, সোহেল শাহরিয়ার, মুনসুর ও আশরাফ তালুকদারদের নাম বাদ দিতে বলেন। তখন আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে আবারও নিজেকে আশিক বলে পরিচয় দেন। আমি তাকে বলি যে, আমি তো কারও নাম উল্লেখ করে মামলা করিনি। তখন সে বলে, বেশি ফালাফালি করিস না। তাহলে তোর হাত-পা ভেঙে প্রাণে মেরে ফেলব। তখন সে আবার ওই চারজনের নাম উল্লেখ করে তাদের নাম অভিযোগ থেকে বাদ দিতে বলে। না হলে আরও অনেক লাশ পড়বে বলে হুমকি দেয়। বর্তমানে আমি বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’

কারাগারে থাকায় অভিযোগের বিষয়ে মারুফ রেজা সাগর ও সোহেল শাহরিয়ারের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর মারুফ আহমেদ মনসুর রোববার বলেন, ‘আমি আশিক নামের কাউকে চিনি না। ফোনকলের বিষয়েও কিছুই জানি না।’

গোলাম আশরাফ তালুকদার বলেন, ‘আমি এমন কোনো বিষয় এখনো শুনিনি। মাত্রই বিষয়টি শুনলাম। আশিক নামের এমন কাউকে আমি চিনি না।’ থানা থেকে জিডির বিষয়ে তার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেননি বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি বলেন, ‘ফোনের অপর প্রান্তে থাকা জনৈক আশিক আমাকে কল করে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে। বলে, ‘তুই ডলি? তোর জামাই খুন হয়েছে না? তুই বেশি ফালাফালি করছিস। চারজনের নাম বাদ না দিলে তোরও একই অবস্থা হবে।’ এরপর ঘটনাটি আমি আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র, ডিবি ও স্থানীয় পুলিশকে জানাই। বর্তমানে আমি চরম ভয়ে আছি। কারণ আমার স্বামীকে খুন করবে বলার দুদিন পরই তিনি খুন হন। এখন আমাকে খুন করবে বলার পর, আমারও একই অবস্থা হতে পারে। আমি ও আমার সন্তানদের জীবনের নিরাপত্তা চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন, দোষীরা যাতে কেউ ছাড় না পায়।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (প্রশাসন ও ডিবি দক্ষিণ) সঞ্জিত কুমার রায় বলেন, ‘জিডির বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। টিপুর স্ত্রী ও পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি।’ ২৪ মার্চ রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টায় শাহজাহানপুরের আমতলা এলাকায় সড়কে প্রকাশ্য গুলি করে খুন করা হয় আওয়ামী লীগ নেতা টিপু ও কলেজছাত্রী প্রীতিকে। পেশাদার কিলার বাহিনী এক থেকে দেড় মিনিটের অপারেশন শেষে পালিয়ে যায়। ১২ রাউন্ড গুলি ছোড়ে টিপুর দিকে। এর মধ্যে টিপুর শরীরে সাত রাউন্ড গুলি লাগে। সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে ঘটনাস্থলে সামিয়া আফরান জামাল প্রীতি (২২) নামের এক নিরীহ কলেজছাত্রী নিহত হন। এ ঘটনায় ২৫ মার্চ টিপুর স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে শাহজাহানপুর থানায় একটি মামলা করেন।

তিনি জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের মধ্য থেকে দুজন এবং বাইরে থাকা দুজনের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনলে তাকে খুন করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি পরিবার নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘৪ জনের নাম বাদ না দিলে তোরও একই অবস্থা হবে’

আপডেট সময় ০৮:১৭:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ অগাস্ট ২০২২

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

‘তুই ডলি? তোর জামাই খুন হয়েছে না? তুই বেশি ফালাফালি করছিস। চারজনের নাম বাদ না দিলে তোরও একই অবস্থা হবে।’ শনিবার দুপুরে এমন একটি ফোনকল আসে রাজধানীর শাহজাহানপুরে সন্ত্রাসীদের গুলীতে নিহত আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপুর স্ত্রীর ডলির কাছে। ফারহানা ইসলাম ডলি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর। এ ধরনের ফোন পাওয়ার পর তিনি চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে প্রতিটি মুহূর্ত পার করছেন। ইতোমধ্যে থানায় জিডি করাসহ জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সরকারি দলের এ কমিশনার। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।

মোবাইল ফোনে দেওয়া ওই হুমকির পর শনিবার সন্ধ্যায় শাহজাহানপুর থানায় গিয়ে তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডি নং ৮৬৮। বিষয়টি মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকেও জানানো হয়েছে। জনৈক আশিক কল করে যেই চারজনের নাম বাদ দিতে বলেছেন তাদের সম্পর্কেও পুলিশকে বিস্তারিত জানিয়েছেন টিপুর স্ত্রী। এরা হলেন-মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সোহেল শাহরিয়ার ও মতিঝিল থানার ১০নং ওয়ার্ড যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি মারুফ রেজা সাগর। এরা দুজনই ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন। অপর দুজন হলেন-ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মারুফ আহমেদ মনসুর ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আশরাফ তালুকদার। তবে এই দুজনকে এখন পর্যন্ত পুলিশ এ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। কিন্তু ফোন করে তাদের নামও মামলা থেকে কেন প্রত্যাহার করতে বলা হলো তা নিয়ে নতুন করে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে মনসুরের ঘনিষ্ঠজন হিসাবে পরিচিত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মাহবুবুর রহমান টিটুকেও হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেফতার করে ডিবি।

এদিকে জিডিতে টিপুর স্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘শনিবার বেলা ১টা ২৩ মিনিটে আমার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে +৫২৯৪০ নম্বর থেকে একজন কল করেন। তিনি নিজেকে আশিক পরিচয় দিয়ে তার স্বামী হত্যার মামলা থেকে সাগর, সোহেল শাহরিয়ার, মুনসুর ও আশরাফ তালুকদারদের নাম বাদ দিতে বলেন। তখন আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে আবারও নিজেকে আশিক বলে পরিচয় দেন। আমি তাকে বলি যে, আমি তো কারও নাম উল্লেখ করে মামলা করিনি। তখন সে বলে, বেশি ফালাফালি করিস না। তাহলে তোর হাত-পা ভেঙে প্রাণে মেরে ফেলব। তখন সে আবার ওই চারজনের নাম উল্লেখ করে তাদের নাম অভিযোগ থেকে বাদ দিতে বলে। না হলে আরও অনেক লাশ পড়বে বলে হুমকি দেয়। বর্তমানে আমি বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’

কারাগারে থাকায় অভিযোগের বিষয়ে মারুফ রেজা সাগর ও সোহেল শাহরিয়ারের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর মারুফ আহমেদ মনসুর রোববার বলেন, ‘আমি আশিক নামের কাউকে চিনি না। ফোনকলের বিষয়েও কিছুই জানি না।’

গোলাম আশরাফ তালুকদার বলেন, ‘আমি এমন কোনো বিষয় এখনো শুনিনি। মাত্রই বিষয়টি শুনলাম। আশিক নামের এমন কাউকে আমি চিনি না।’ থানা থেকে জিডির বিষয়ে তার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেননি বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি বলেন, ‘ফোনের অপর প্রান্তে থাকা জনৈক আশিক আমাকে কল করে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে। বলে, ‘তুই ডলি? তোর জামাই খুন হয়েছে না? তুই বেশি ফালাফালি করছিস। চারজনের নাম বাদ না দিলে তোরও একই অবস্থা হবে।’ এরপর ঘটনাটি আমি আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র, ডিবি ও স্থানীয় পুলিশকে জানাই। বর্তমানে আমি চরম ভয়ে আছি। কারণ আমার স্বামীকে খুন করবে বলার দুদিন পরই তিনি খুন হন। এখন আমাকে খুন করবে বলার পর, আমারও একই অবস্থা হতে পারে। আমি ও আমার সন্তানদের জীবনের নিরাপত্তা চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন, দোষীরা যাতে কেউ ছাড় না পায়।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (প্রশাসন ও ডিবি দক্ষিণ) সঞ্জিত কুমার রায় বলেন, ‘জিডির বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। টিপুর স্ত্রী ও পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি।’ ২৪ মার্চ রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টায় শাহজাহানপুরের আমতলা এলাকায় সড়কে প্রকাশ্য গুলি করে খুন করা হয় আওয়ামী লীগ নেতা টিপু ও কলেজছাত্রী প্রীতিকে। পেশাদার কিলার বাহিনী এক থেকে দেড় মিনিটের অপারেশন শেষে পালিয়ে যায়। ১২ রাউন্ড গুলি ছোড়ে টিপুর দিকে। এর মধ্যে টিপুর শরীরে সাত রাউন্ড গুলি লাগে। সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে ঘটনাস্থলে সামিয়া আফরান জামাল প্রীতি (২২) নামের এক নিরীহ কলেজছাত্রী নিহত হন। এ ঘটনায় ২৫ মার্চ টিপুর স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে শাহজাহানপুর থানায় একটি মামলা করেন।

তিনি জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের মধ্য থেকে দুজন এবং বাইরে থাকা দুজনের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনলে তাকে খুন করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি পরিবার নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।