আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
কজন উদ্যোক্তা যখন ব্যবসা শুরু করেন, তখন তাকে ৩০ কেজি করে ৬০ কেজি ওজনের ব্যাগভর্তি স্যাম্পল নিয়ে ট্রাভেল করতে হয়। বায়ারদের দরজায় দরজায় গিয়ে এই স্যাম্পল দেখাতে হয়। ফ্যাক্টরি ও দেশ সম্পর্কে ভালো ভালো কথা বলতে হয় একটা বায়ারের মন জয়ের জন্য। অবিরাম চেষ্টায় অন্তত এক বছর চলে যায় বায়ারদের মন জয় করতে। এই এক বছর উদ্যোক্তাকে ফ্যাক্টরি চালাতে হয়। এসময়ে সমস্ত পুঁজি, সমস্ত সম্পত্তি এমনকি স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন দিতে হয়।
কথাগুলো বলছিলেন মাত্র দুই শ কর্মী নিয়ে পারিবারিক পোশাক শিল্প ব্যবসা শুরু করা চিত্রনায়ক অনন্ত জলিল, যার কারখানায় এখন ১১ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন।
তিনি জানিয়েছেন তার কোম্পানি চালাতে প্রতি মাসে ১৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। ২০২১ সালে গিয়ে ১৪ থেকে ১৫ হাজার লোক প্রতিষ্ঠানে কাজ করবে এমনটাই আশা আনন্ত জলিলের। এই সব কারখানা দাঁড় করাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। এমনি এমনি হয়ে যায়নি সব। আর তাই করোনার দুর্যোগকালীন সময়ে গার্মেন্টস মালিকদের নিয়ে বিরুপ মন্তব্য না করার আহ্বান জানান অনন্ত।
দেশের তৈরি পোশাকখাতের অন্যতম ব্যবসায়ী অনন্ত জলিল এ খাত নিয়ে নিজের ১৩ মে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া ভিডিও বার্তায় বলেন, একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি তৈরি করতে কতটা পরিশ্রম, অর্থলগ্নি ও সম্পত্তি ব্যাংকে বন্ধক (মটগেজ) দিতে হয় তা একজন গার্মেন্টস উদ্যোক্তাই জানেন।
রানা প্লাজা ধসের পর গার্মেন্টস সেক্টরে একটা দুর্দিন এসেছিল মন্তব্য করে এজেআই গ্রুপের মালিক অনন্ত জলিল বলেন, আমাদের দেশে গার্মেন্টস সেক্টরের দুর্দিন শুরু হয় মূলত রানা প্লাজা ধসের পর থেকে। রানা প্লাজা মূলত শপিংসেন্টার ছিল, সেখানে কিছু কারখানাও ছিল। রানা প্লাজা ধসের পর ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। এ কারণে পুরো পৃথিবীতেই আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়। চরম ইমেজ সংকটে ভোগে বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে দেশে আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান বায়ারদের সংগঠন অ্যাকর্ড অ্যান্ড অ্যালায়েন্সের আবির্ভাব ঘটে। সংগঠন দুটি বিল্ডিং সেফটি, ফায়ার সেফটি ও ইলেকট্রিক সেফটি অডিট পরিচালনার করার ফলশ্রুতিতে ফ্যাক্টরিগুলো ব্যাপক সংস্কারের কাজে হাত দেয়। এ কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করতে গিয়ে মালিকদের কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়।
ক্রেতাজোটের নির্দেশনা মতো সংস্কার করতে গিয়ে অনেক গার্মেন্টস মালিক তার ব্যবসা টিকে রাখতে পারেনি মন্তব্য করে অনন্ত জলিল বলেন, অনেক মালিক সংস্কার করতে গিয়ে এবং অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সর বিতর্কিত কিছু সিদ্ধান্তের কারণে আজ সর্বস্বান্ত। এক সময়ের মালিক আজ জীবিকার তাগিদে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।
আমার একটি পাঁচতলা বিল্ডিং সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলি, দু’টি ৮ তলা বিল্ডিংয়ের একটি করে ফ্লোর ভেঙে ফেলি। এমনকি একটি দোতলা বিল্ডিংয়ের একটি ফ্লোর ভেঙে ফেলি, সব মিলিয়ে ৪২ হাজার বর্গফুট বিল্ডিং ভাঙা হয়। এতে ১৮ কোটি টাকা লাগে। এই সময় মনে হয়েছিল সমস্ত গার্মেন্টস ব্যবসা বন্ধ করে নিয়মিত কমার্শিয়াল সিনেমা (বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র) করি। কারণ এই দেড় বছর সময় প্রতিটা মিনিট কীভাবে কেটেছে তা সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না। সে মুহূর্তগুলো বলেও আপনাদের বোঝাতে পারবো না।
অ্যাকর্ড অ্যান্ড অ্যালায়েন্স আসার আগে অন্য একটি ব্র্যান্ড বায়ারের নির্দেশে সেফটিবোর্ড, ইলেকট্রিক, জকি পাম্পসহ অন্য খরচ বাবদ ৫ কোটি টাকা খরচ করি। কিন্তু অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্স আমাকে আবারও আগেরগুলো বাতিল করে নতুন করে ১০ কোটি টাকা খরচ করায়। এভাবেই বিপুল বিনিয়োগ করতে গিয়ে অনেকেই ব্যাংকঋণে জড়ান। এভাবে সংগ্রাম করতে করতে আজ মালিকরা নিঃস হয়ে পড়ছে। তারপরও আমরা (মালিকরা) অবিরাম চেষ্টা করছি এ সেক্টর বাঁচাতে।
মালিকরা শ্রমিকদের বেতন বাড়ালেও সে অনুযায়ী ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়ায়নি জানিয়ে অনন্ত জলিল বলেন, ২০১৩ সালে একবারে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো হয় ৭০ শতাংশ, ২০১৮ সালে বেতন বাড়ে ৫০ শতাংশের বেশি। তাছাড়া প্রতিটি শ্রমিকের প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বেতন বাড়ে। প্রতিটি বায়ার অর্ডার দেওয়ার আগে প্রতিটি শ্রমিকের নিয়মিত বেতন হচ্ছে কিনা, বেতন বাড়ানো হচ্ছে কিনা, শ্রম আইন ও বায়ারের কোড অব কন্ডাক্ট অনুযায়ী হচ্ছে কিনা যাচাই-বাছাই করেন। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি আমাদের গার্মেন্টস পণ্যের মূল্য কিন্তু কখনও বাড়েনি।
কোনো কিছু না বুঝে শুধু সমালোচনার জন্য তির্যক মন্তব্য না করার আহবান জানিয়ে অনন্ত জলিল বলেন, সম্প্রতি কিছু কিছু ব্যাক্তি গার্মেন্টস মালিকদের প্রতি তির্যক মন্তব্য করছে। ছোট বেলা শুনতা কিছু না বুঝে কোন বিষয় মন্তব্য করলে তাকে বলা হতো আদার ব্যপারি জাহাজের খবর নিতে এসেছো। আমার মনে হয় এ কথাটি তাদের ক্ষেত্রও প্রযেয্য। যাদের দেশের অর্থনীতিতে কোন অবদান নেই । তাদের মুখ আজ সমালোচনার ফুলঝুরি। সমালোচনার পরিবর্তে দেশের জন্য কিছু করুন। দয়া করে গার্মেন্ট মালিকদের মনোবল ভাঙবেন না।
এ সময় তিনি বলেন, গার্মেন্টস মালিকরা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করছেন। তাই এ সেক্টর নিয়ে অযথা গাল গপ্প করবেনা।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























