অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
ব্রিটিশ সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সমালোচক জর্জ অরওয়েল বেঁচে ছিলেন মাত্র ৪৭ বছর (১৯০৩-১৯৫০)-অনেক কম সময়। কিন্তু তার লেখনী বেঁচে থাকবে শত শত বছর। তার একটা কথা আমার ভীষণ ভালো লাগে,‘হয় সবাই একটা ভদ্রস্থ জীবনযাপন করবে, অথবা কেউ তা করতে পারবে না।’ যদিও পুঁজিবাদী সমাজের আমল নামার কোথাও এ ধরনের সরল জীবনযাপনের স্থান নেই, তারপরও ওই রকম একটি সমাজের আশা করতে দোষ কি? ভাবতেও তো ভালো লাগে। একই সমাজে একটি অংশ হল্লা-হল্লি করবে আর আরেকটি অংশ ম্রিয়মাণ থাকবে- তা কি কাম্য হতে পারে, না সুন্দর দেখায়?
আওয়ামী লীগের বর্তমান বয়স ৭০ ছুঁইছুঁই (১৯৪৯-২০১৮)। বঙ্গবন্ধু তো বটেই তারপরও মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো সময়োত্তীর্ণ রাজনীতিকদের জন্ম দিয়েছে এই আওয়ামী লীগ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আর ’৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ- আওয়ামী লীগ ছাড়া কল্পনাই করা যায় না! স্বাধীন বাংলাদেশের কথা যদি বলি তাহলে বলতে হবে ১৯৯২’র ২৬ মার্চ জামাতের তৎকালীন আমির গোলাম আযমের বিচারে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঢকায় ‘গণ-আদালত’ অনুষ্ঠিত হয়।
লাখো মানুষের জমায়েত হয়েছিল ওই আদালতকে ঘিরে এবং তা সফল হয়েছিল আওয়ামী লীগের সমর্থন থাকার কারণেই। বছর কয়েক আগের শাহবাগের যে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’, তার সফলতাও এসেছে আওয়ামী লীগের সমর্থনেই।
সুতরাং, আওয়ামী লীগকে এখনো আমি মনে করি সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী একটি বড় মঞ্চ, এর বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশে আমরা এখনো অন্য কোনো প্ল্যাটফরম তৈরি করতে পারিনি। এ রকম সত্যকে অস্বীকার করাটা বাস্তবতাকে অস্বীকার করারই নামান্তর।
বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মানসিকতার বিপরীতে তৈরি করেছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তানের মুসলিম লীগের নেতারা ছিলেন সামন্ত ভাবাপন্ন, আমজনতাকে প্রজা হিসেবে দেখত। পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল ঘোরার চেয়ে বিলেত-ইউরোপে ঘোরাঘুরি পছন্দ করত।
ভোটের সময় টাকা ছিটালেই হবে, মানুষকে এত তোয়াজ করার কী আছে! কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কৌশলটা ছিল বিপরীত। তিনি মনে করতেন মানুষের কাছে যেতে হবে, মানুষকে চিনতে-জানতে হবে, আমজনতাকে সঙ্গে নিয়েই রাজনীতির বলয় তৈরি করতে হবে, রাজনীতি হবে ‘প্রো-পিপল’। জীবনে তাই করেছিলেন এবং সফলও হয়েছিলেন।সারা পূর্ব পাকিস্তান চষে বেড়িয়ে ছিলেন। ভাত খাওয়া, গোসল করা – সব সাধারণ মানুষের সঙ্গে।
আওয়ামী লীগ বর্তমানে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আছে। ১৯৯৬ সালেও জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে এই দলটি।কিন্তু ২০০৮ সালে ক্ষমতায় যে আওয়ামী লীগ এল তার রূপটি যেন আগের মতো নয়।
অবশ্য তার আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জয়লাভ করে যে অরাজকভাবে দেশ চালিয়েছে; টাকা-পয়সা লুটপাট করেছে; ২১ আগস্টে জঘন্যতম গ্রেনেড হামলা ঘটিয়েছে; ‘হাওয়া ভবন’ নামক প্রাসাদের সিংহাসনে তারেক জিয়া নামে অঘোষিত সম্রাটকে বসিয়েছে তারই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ তার মেজাজ-মূর্তি বদলেছে কিনা জানি না । তবে ‘প্রো-পিপল’ ভাবটা মলিন হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের কাছে এ দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ‘অ্যাবসলিউট ম্যাজোরিটি’ নিয়ে সরকার গঠন করে। আচরণে ‘কুচ পরওয়া নেহি’ ভাব এসে যায়। প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াত তো বটেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সুবিবেচনা সম্পন্ন্ মানুষদের মন্তব্য’র প্রতিও চরম অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেতে থাকে। অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষানুরাগী।
তাকে আক্রমণ করে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য দিয়েছে। টিআইবি এবং সুশীল সমাজকে তো রীতিমতো শত্রু মনে করে। সিপিডি প্রতিবছরই সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পরদিন সাংবাদিক সম্মেলন করে থাকে।
এবারেও বাজেটের ভালোমন্দ নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা হয়েছে। তার প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা বলে ফেললেন- ওরা (সিপিডি) মতলববাজ। কত বাজে মন্তব্য! অথচ এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের আজন্ম সম্পর্ক।
একজন রেহমান সোবহান বছর বছর জন্মান না, অপেক্ষা করতে হবে ৫০-১০০ বছর। তিনি শুধু অর্থনীতির পণ্ডিতই নন, মুক্তিযুদ্ধ এবং এ দেশের ভালোর জন্য যত ভাবনা সবটাই তাকে ভাবিত করে।
একটু আগপিছ ভেবে কথা বলা উচিত নয় কি? এই হালের কথা, আলোকচিত্রী শহীদুল আলমকে জেলে পুরে দেয়া হলো। তার অপরাধ? সড়ক আন্দোলনে তিনি নাকি ‘উসকানি’ দিয়েছেন। যেখানে প্রধানমন্ত্রী, আইজি, ডিআইজি সরাসরি সমর্থন দিয়েছেন সেখানে উসকানির কী মূল্য থাকতে পারে?
তাহলে কি আওয়ামী লীগ ভালো কিছুই করেনি? অবশ্যই করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, লোডশেডিং সহনীয় মাত্রায় রয়েছে। বিশ্বব্যাংককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়ে চলেছে; নারীর ক্ষমতায়ন রেড়েছে; মানব উন্নয়নসূচক সন্তোষজনক।১৯৯০ সাল থেকে ২০১৭- এই ২৭ বছরে বিশ্বের গড় মানব উন্নয়ন সূচক রেড়েছে ২১%, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ৩২% আর তা শুধুমাত্র বাংলাদেশের বেলায় বেড়েছে ৫৭%; মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে; মাথাপিছু আয় বেড়েছে। যদিও কেউ কেউ বলে থাকেন আয়বৈষম্য বেড়েছে এটা আমি বর্তমান সরকারকে খুব একটা দোষ দেব না।
কেননা ১৮ শতকের মধ্যভাগ থেকেই আয়বৈষম্য বাড়ার শুরু। তখনই এটাকে ‘ডভিল’ বলা হতো। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় আয়বৈষম্য দূর করা কাগজে-কলমে হতে পারে তবে বাস্তবে তা সম্ভব না।
তো ভালো কাজ তো হয়েছেই। কিন্তু সে বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছানোর মতো সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাতে নেই। প্রত্যাশিত-অপ্রত্যাশিত আর্থিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছেন যে জনগণকে বোঝানোর সময় কই? আমার সঙ্গে সবাই একমত হবেন যে, মৌলবাদকে রুখতে হলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কোনো বিকল্প নেই।
গত ১০ বছরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কোনো ছিটেফোঁটা আমার নজরে আসেনি। অথচ আশির দশকের শুরুতে আমি যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখন ছাত্রলীগ, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন- প্রতিটি সংগঠনের ‘কালচারাল উইং’ ছিল। সারা বছর অনুষ্ঠান হতো।
দেশের গান, মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য চিত্র কত কী- আমরা উজ্জীবিত হতাম। সে সবের তো কোনো বালাই নেই। আমি নিশ্চিত প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র একই। যে কারণে সাধারণ মানুষের ওপর আস্থা অনেকখানি কমে গেছে। কিন্তু তা হলে তো হবে না । গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতেই হবে।
অমর্ত্য সেন যথার্থই বলেছেন,‘ যে স্বাধীন দেশে নিয়মিত নির্বাচন হয়, যেখানে বিরোধী দল প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে সমর্থ, যেখানে সেন্সরশিপ ছাড়া সংবাদপত্রে রিপোর্ট ছাপা হতে পারে এবং সরকারি নীতির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, সেখানে দুর্ভিক্ষ ঘটে না।’
বিএনপি-জামায়াতকে আমি পছন্দ করি না কিন্তু জনগণ চাইলে আমার কী করার আছে? আজকে যে বলা হয়, আওয়ামী লীগ হেরে গেলে লাখ লাখ লোক খুন হয়ে যাবে-এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।
পাকিস্তানি বর্বর শাসকগোষ্ঠী যার কাছে পরাভূত হয়েছে তাকে কে নিশ্চিহ্ন করবে? বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরসূরিদের মুখে অমন কথা বেমানান। ১৯৬২ সালে বঙ্গবন্ধু দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে বলেছিলেন,‘এই দেশ আমার, এই মাটি আমার, এই নদী আমার; এই দেশের সত্যিকার মুক্তির জন্য, এই মাটির আজাদীর জন্য, এই বাতাসকে নির্মল করার জন্য, এই নদীতে জোয়ার আনার জন্য আওয়ামী লীগ সংগ্রাম করে যাবে।
শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেয়া সম্ভব, কিন্তু এই ফাঁসির রক্তের প্রতি ফোঁটা হইতে লাখ লাখ মুজিব জন্মগ্রহণ করে সংগ্রাম জোরদার করবে।’(১০ এপ্রিল, দৈনিক ইত্তেফাক)। কোথায় সেই হিম্মত!
একটি নির্বাচনের জয়পরাজয় দিয়ে সারা জীবনের রাজনীতির অঙ্ক মেলানো নির্বুদ্ধিতা। আমাদের দেখতে হবে নির্বাচনে জনগণ কতটা নিরাপদে, নির্বিঘ্নে এবং নিশ্চিন্তে তাদের মতের প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছে।
কোনো দল না ‘গণতন্ত্র’ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে সুরক্ষা দিতে হবে। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের একটি নিবেদন দিয়েই শেষ করব, ‘বর্তমানে ক্ষমতাসীন থাকা দলটির রাজনৈতিক ঐতিহ্যের প্রতি আজীবন সহানুভূতিশীল একজন হিসেবে আমার শুধু দুঃখ হয় এই দেখে যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া পথপ্রদর্শনমূলক রাজনৈতিক আদর্শ থেকে আমরা বিচ্যুত হয়ে গেছি। এই বৃদ্ধ বয়সে আমার রাজনৈতিক অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারব না।
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে আমি শুধু এ আশাই করতে পারি, তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীদের হাতে ভুলত্রুটি সংশোধন করার সময় এখনো আছে। পেশিশক্তি দিয়ে জনগণের আন্দোলন দমন না করে তাদের কাতারে এসে দাঁড়িয়ে তাদের ভালোবাসা ও সমর্থন জয়ের সময় এখনো আছে।’(প্রথম আলো, ০৯/০৯/২০১৮)। সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।
মুঈদ রহমান: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























