ঢাকা ১০:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

ইরানি নারীদের অধিকার ও লড়াইয়ের পাঁচ চলচ্চিত্র

সত্তর দশকের শেষলগ্নে ইরানি বিপ্লবের পর দেশটিতে নারীদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর নারীদের জন্য হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। একই সঙ্গে বহুবিবাহ বৈধ ঘোষণা করা হয় এবং বিবাহবিচ্ছেদ ও সন্তানের অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার চরমভাবে সীমিত করা হয়। শুধু তা-ই নয়, মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স কমিয়ে আনা হয় এবং নারীদের চলাফেরা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আইনি কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয় স্বামীদের হাতে। অভিযোগ আছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের জোরপূর্বক এমন চুক্তিতে বাধ্য করা হয়। পাশাপাশি বিবাহিত পুরুষদের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর বৈধ একটি পথও তৈরি করেছে।

এই প্রতিকূল বাস্তবতার মাঝে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে হিজাববিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক হওয়া ২২ বছর বয়সি মাসা আমিনির পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু এক বড় ধরনের আন্দোলনের জন্ম দেয়। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানে মুখর এই আন্দোলন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে এই ক্ষোভের ইতিহাস অনেক পুরোনো। গত চার দশক ধরে ইরানের নারী চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের ক্যামেরার মাধ্যমে এই সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। প্রতিটি পর্যায়েই তারা নানা রকম সামাজিক বিধিনিষেধের মুখোমুখি হন। হাভা (ফাতেমেহ চেরাগ আখার) নামে নয় বছর বয়সি একটি মেয়ে তার পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে আর খেলতে পারে না। এই বিয়ের সময়সীমা কয়েক মিনিট থেকে শুরু করে কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে।

পরিচালক মারজি মেশকিনি ‘দ্য ডে আই বিকেম আ ওম্যান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ইরানি নারীদের জীবনের তিনটি ভিন্ন পর্যায়ের চিত্র তুলে ধরেছেন। চলচ্চিত্রটি তৈরির সময় জনসমক্ষে নারীদের সাইকেল চালানো নিয়ে ইরানে তীব্র বিতর্ক চলছিল। সিনেমার একটি দৃশ্যে দেখা যায়, তরুণী স্ত্রী আহু তার স্বামীর আপত্তি অগ্রাহ্য করে সাইকেল প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন এবং গোত্রের পুরুষেরা ঘোড়ায় চড়ে তাকে তাড়া করছে। এটি মূলত নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথের বাধা ও তাদের স্বাধীনতার প্রতীক। এছাড়া বৃদ্ধা হুরার নিজের জমানো টাকায় কেনা জিনিসপত্র নিয়ে সমুদ্রের দিকে ভেসে যাওয়া তার সমস্ত সামাজিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তির বার্তা দেয়। আধুনিক পৃথিবীর পিচঢালা পথে সাইকেল চালিয়ে নারীরা সামনে এগিয়ে চলেছেন, আর তাদের পেছনে বালুকাময় পথ ধরে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছেন পুরুষেরা। চলচ্চিত্রটির নির্মাণকালে জনসমক্ষে নারীদের সাইকেল চালানোর অনুমতি থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছিল। তৃতীয় নারী হুরা (আজিজেহ সেদিঘ) একজন বৃদ্ধা। স্ত্রী, মা ও অধীনস্ত নারী হিসেবে সারা জীবন যেসব গৃহস্থালি সামগ্রী থেকে বঞ্চিত ছিলেন, নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে সেসব কিনে ফেলেন। কেনা জিনিসপত্র প্রকাশ্যে সাজিয়ে রাখেন তিনি।

মানিজেহ হেকমত নির্মিত ‘উইমেনস প্রিজন’ চলচ্চিত্রের গল্প আবর্তিত হয়েছে ১৯৮৪, ১৯৯২ ও ২০০১ সালের প্রেক্ষাপটে। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের তিন দশকের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই ফিকশনাল ফিল্ম নির্মাণ করেন পরিচালক মানিজেহ হেকমত।

তেহরানের একটি কারাগারে বন্দি নারীদের জীবন ও তাদের সংগ্রামের বাস্তব চিত্র এতে ফুটে উঠেছে। আদেলের প্রেমিকা আফাঘ তার চেয়ে বয়সে বড় ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

রাজনৈতিক বিশ্বাস, নৈতিক বিধিনিষেধ ভাঙা বা মাদকাসক্তির মতো বিভিন্ন কারণে বন্দি হওয়া নারীদের জীবনকাহিনি এই চলচ্চিত্রের মূল বিষয়। তাদের অনেকেই নৈতিক বিধিনিষেধ ভঙ্গ, রাজনৈতিক বিশ্বাস কিংবা ভুল সময়ে ভুল জায়গায় উপস্থিত থাকার অপরাধে কারাবন্দি হয়েছেন। কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর থেকেই অপরাধ, রাজনৈতিক বিশ্বাস, যৌনপেশা, মাদকাসক্তি, সমকামিতা, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়কার বোমা হামলার মতো বিষয় এতে তুলে ধরা হয়েছে।

ছবিটি নির্মাণের সময় পরিচালককে ডিরেক্টস সার্টিফিকেট দেওয়া হয়নি, পরে স্বামীর অনুমতিপত্রের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করতে হয়। ২০০২ সালে ‘ফজর চলচ্চিত্র উৎসবে’ সিনেমাটি নিষিদ্ধ করা হলেও পরে এটি মুক্তি পায়, যদিও প্রদর্শনের প্রতিবাদে একটি সিনেমা হল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌনপেশায় ঠেলে দেওয়া ও মানবপাচারের সুযোগও তৈরি করেছে এটি। সবচেয়ে ক্ষুব্ধ ও সরাসরি বক্তব্যধর্মী সিনেমা এটি।

রাখশান বানি-এতেমাদ পরিচালিত ১৯৯২ সালের চলচ্চিত্র ‘নার্গেস’ শিয়া সম্প্রদায়ের অস্থায়ী বিবাহপ্রথাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হওয়া এই বিবাহকে অনেক সময় বৈধতার আড়ালে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সিনেমাটিতে আদেল নামে একজন ছিঁচকে চোর এবং দুই নারীর ত্রিকোণ প্রেমের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় আইনি কাঠামোর জটিলতা ও নারীদের ওপর তার প্রভাব ফুটে ওঠে। অন্যজনের নাম নার্গেস (আতাফেহ রাজাভি), এই তরুণীর প্রেমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন আদেল। অনেক ক্ষেত্রে এটি বৈধতার আবরণে অনানুষ্ঠানিক যৌনসম্পর্ক স্থাপনের একটি উপায় হিসেবেও দেখা হয়।

২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পুরান দেরাখশান্দের ‘হাশ! গার্লস ডোন্ট স্ক্রিম’ চলচ্চিত্রটি যেন ছিল একটি ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণী। বিয়ের রাতে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত শিরিন নামের এক তরুণীর আত্মরক্ষার লড়াই এতে উঠে আসে। নিজের শৈশবের যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতাই তার প্রধান বয়ান, কিন্তু আদালত তা গুরুত্ব দেয় না। অদ্ভুতভাবে, সিনেমার এই চিত্রায়ন ২০১৪ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া রেহানি জাব্বারির জীবন বাস্তবতার সাথে মিলে যায়, যিনি আত্মরক্ষার জন্য হামলাকারীকে প্রতিহত করেছিলেন। ২০১৪ সালের ২৫ অক্টোবর, ২৬ বছর বয়সি ইরানি নারী রেহানি জাব্বারির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

শিরিন নেশাত পরিচালিত ‘উইমেন উইদাউট মেন’ ১৯৫৩ সালের সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের পটভূমিতে নির্মিত। চারজন নারী তেহরানের বাইরের একটি বাগানকে তাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নেন, যা পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে তাদের স্বাতন্ত্র্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ করে দেয়। পরিচালক শিরিন নেশাত ১৯৭৯ সাল থেকে নিউ ইয়র্কে বসবাস করছেন এবং বর্তমানে ৬৯ বছর বয়সেও তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০০৯ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটি সিলভার লায়ন পুরস্কার অর্জন করে। প্রতিটি চলচ্চিত্রই ইরানি নারীদের শিকল ছেঁড়ার লড়াইয়ের এক একটি শক্তিশালী দলিল। কালজয়ী সিনেমাটি সমকালীন গল্পের আদলে নির্মিত হয়। কারণ ইসলামি আইন অনুযায়ী, তাকে এখন ‘নারী’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বিয়েকে স্বল্পস্থায়ী সম্পর্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখন আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, শিরিন কী একজন নির্মম হত্যাকারী, না কি সেই একমাত্র ব্যক্তি যে তার পূর্বপুরুষদের অসাধ্য কাজটি করার সাহস দেখিয়েছেন।

আপলোডকারীর তথ্য

শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ সম্পদ সংক্রান্ত ঘটনায়: অভিযোগে জড়িত ব্যক্তি

ইরানি নারীদের অধিকার ও লড়াইয়ের পাঁচ চলচ্চিত্র

আপডেট সময় ০৮:৩৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

সত্তর দশকের শেষলগ্নে ইরানি বিপ্লবের পর দেশটিতে নারীদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর নারীদের জন্য হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। একই সঙ্গে বহুবিবাহ বৈধ ঘোষণা করা হয় এবং বিবাহবিচ্ছেদ ও সন্তানের অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার চরমভাবে সীমিত করা হয়। শুধু তা-ই নয়, মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স কমিয়ে আনা হয় এবং নারীদের চলাফেরা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আইনি কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয় স্বামীদের হাতে। অভিযোগ আছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের জোরপূর্বক এমন চুক্তিতে বাধ্য করা হয়। পাশাপাশি বিবাহিত পুরুষদের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর বৈধ একটি পথও তৈরি করেছে।

এই প্রতিকূল বাস্তবতার মাঝে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে হিজাববিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক হওয়া ২২ বছর বয়সি মাসা আমিনির পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু এক বড় ধরনের আন্দোলনের জন্ম দেয়। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানে মুখর এই আন্দোলন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে এই ক্ষোভের ইতিহাস অনেক পুরোনো। গত চার দশক ধরে ইরানের নারী চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের ক্যামেরার মাধ্যমে এই সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। প্রতিটি পর্যায়েই তারা নানা রকম সামাজিক বিধিনিষেধের মুখোমুখি হন। হাভা (ফাতেমেহ চেরাগ আখার) নামে নয় বছর বয়সি একটি মেয়ে তার পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে আর খেলতে পারে না। এই বিয়ের সময়সীমা কয়েক মিনিট থেকে শুরু করে কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে।

পরিচালক মারজি মেশকিনি ‘দ্য ডে আই বিকেম আ ওম্যান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ইরানি নারীদের জীবনের তিনটি ভিন্ন পর্যায়ের চিত্র তুলে ধরেছেন। চলচ্চিত্রটি তৈরির সময় জনসমক্ষে নারীদের সাইকেল চালানো নিয়ে ইরানে তীব্র বিতর্ক চলছিল। সিনেমার একটি দৃশ্যে দেখা যায়, তরুণী স্ত্রী আহু তার স্বামীর আপত্তি অগ্রাহ্য করে সাইকেল প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন এবং গোত্রের পুরুষেরা ঘোড়ায় চড়ে তাকে তাড়া করছে। এটি মূলত নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথের বাধা ও তাদের স্বাধীনতার প্রতীক। এছাড়া বৃদ্ধা হুরার নিজের জমানো টাকায় কেনা জিনিসপত্র নিয়ে সমুদ্রের দিকে ভেসে যাওয়া তার সমস্ত সামাজিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তির বার্তা দেয়। আধুনিক পৃথিবীর পিচঢালা পথে সাইকেল চালিয়ে নারীরা সামনে এগিয়ে চলেছেন, আর তাদের পেছনে বালুকাময় পথ ধরে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছেন পুরুষেরা। চলচ্চিত্রটির নির্মাণকালে জনসমক্ষে নারীদের সাইকেল চালানোর অনুমতি থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছিল। তৃতীয় নারী হুরা (আজিজেহ সেদিঘ) একজন বৃদ্ধা। স্ত্রী, মা ও অধীনস্ত নারী হিসেবে সারা জীবন যেসব গৃহস্থালি সামগ্রী থেকে বঞ্চিত ছিলেন, নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে সেসব কিনে ফেলেন। কেনা জিনিসপত্র প্রকাশ্যে সাজিয়ে রাখেন তিনি।

মানিজেহ হেকমত নির্মিত ‘উইমেনস প্রিজন’ চলচ্চিত্রের গল্প আবর্তিত হয়েছে ১৯৮৪, ১৯৯২ ও ২০০১ সালের প্রেক্ষাপটে। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের তিন দশকের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই ফিকশনাল ফিল্ম নির্মাণ করেন পরিচালক মানিজেহ হেকমত।

তেহরানের একটি কারাগারে বন্দি নারীদের জীবন ও তাদের সংগ্রামের বাস্তব চিত্র এতে ফুটে উঠেছে। আদেলের প্রেমিকা আফাঘ তার চেয়ে বয়সে বড় ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

রাজনৈতিক বিশ্বাস, নৈতিক বিধিনিষেধ ভাঙা বা মাদকাসক্তির মতো বিভিন্ন কারণে বন্দি হওয়া নারীদের জীবনকাহিনি এই চলচ্চিত্রের মূল বিষয়। তাদের অনেকেই নৈতিক বিধিনিষেধ ভঙ্গ, রাজনৈতিক বিশ্বাস কিংবা ভুল সময়ে ভুল জায়গায় উপস্থিত থাকার অপরাধে কারাবন্দি হয়েছেন। কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর থেকেই অপরাধ, রাজনৈতিক বিশ্বাস, যৌনপেশা, মাদকাসক্তি, সমকামিতা, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়কার বোমা হামলার মতো বিষয় এতে তুলে ধরা হয়েছে।

ছবিটি নির্মাণের সময় পরিচালককে ডিরেক্টস সার্টিফিকেট দেওয়া হয়নি, পরে স্বামীর অনুমতিপত্রের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করতে হয়। ২০০২ সালে ‘ফজর চলচ্চিত্র উৎসবে’ সিনেমাটি নিষিদ্ধ করা হলেও পরে এটি মুক্তি পায়, যদিও প্রদর্শনের প্রতিবাদে একটি সিনেমা হল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌনপেশায় ঠেলে দেওয়া ও মানবপাচারের সুযোগও তৈরি করেছে এটি। সবচেয়ে ক্ষুব্ধ ও সরাসরি বক্তব্যধর্মী সিনেমা এটি।

রাখশান বানি-এতেমাদ পরিচালিত ১৯৯২ সালের চলচ্চিত্র ‘নার্গেস’ শিয়া সম্প্রদায়ের অস্থায়ী বিবাহপ্রথাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হওয়া এই বিবাহকে অনেক সময় বৈধতার আড়ালে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সিনেমাটিতে আদেল নামে একজন ছিঁচকে চোর এবং দুই নারীর ত্রিকোণ প্রেমের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় আইনি কাঠামোর জটিলতা ও নারীদের ওপর তার প্রভাব ফুটে ওঠে। অন্যজনের নাম নার্গেস (আতাফেহ রাজাভি), এই তরুণীর প্রেমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন আদেল। অনেক ক্ষেত্রে এটি বৈধতার আবরণে অনানুষ্ঠানিক যৌনসম্পর্ক স্থাপনের একটি উপায় হিসেবেও দেখা হয়।

২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পুরান দেরাখশান্দের ‘হাশ! গার্লস ডোন্ট স্ক্রিম’ চলচ্চিত্রটি যেন ছিল একটি ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণী। বিয়ের রাতে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত শিরিন নামের এক তরুণীর আত্মরক্ষার লড়াই এতে উঠে আসে। নিজের শৈশবের যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতাই তার প্রধান বয়ান, কিন্তু আদালত তা গুরুত্ব দেয় না। অদ্ভুতভাবে, সিনেমার এই চিত্রায়ন ২০১৪ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া রেহানি জাব্বারির জীবন বাস্তবতার সাথে মিলে যায়, যিনি আত্মরক্ষার জন্য হামলাকারীকে প্রতিহত করেছিলেন। ২০১৪ সালের ২৫ অক্টোবর, ২৬ বছর বয়সি ইরানি নারী রেহানি জাব্বারির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

শিরিন নেশাত পরিচালিত ‘উইমেন উইদাউট মেন’ ১৯৫৩ সালের সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের পটভূমিতে নির্মিত। চারজন নারী তেহরানের বাইরের একটি বাগানকে তাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নেন, যা পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে তাদের স্বাতন্ত্র্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ করে দেয়। পরিচালক শিরিন নেশাত ১৯৭৯ সাল থেকে নিউ ইয়র্কে বসবাস করছেন এবং বর্তমানে ৬৯ বছর বয়সেও তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০০৯ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটি সিলভার লায়ন পুরস্কার অর্জন করে। প্রতিটি চলচ্চিত্রই ইরানি নারীদের শিকল ছেঁড়ার লড়াইয়ের এক একটি শক্তিশালী দলিল। কালজয়ী সিনেমাটি সমকালীন গল্পের আদলে নির্মিত হয়। কারণ ইসলামি আইন অনুযায়ী, তাকে এখন ‘নারী’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বিয়েকে স্বল্পস্থায়ী সম্পর্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখন আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, শিরিন কী একজন নির্মম হত্যাকারী, না কি সেই একমাত্র ব্যক্তি যে তার পূর্বপুরুষদের অসাধ্য কাজটি করার সাহস দেখিয়েছেন।